০৭:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
https://www.facebook.com/obaidul1991
প্রতিবছর বন্যার কাছে পরাজিত বাংলাদেশ: ত্রাণ নয়, এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় মহাপরিকল্পনা (দ্বিতীয় পর্ব)
সাকিব মুহাম্মদ
- Update Time : ০৬:০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
- / ১৩৮ Time View

বাংলাদেশে বন্যা কোনো নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতি বছর একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি, একই দুর্ভোগ এবং একই ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতির পুনরাবৃত্তি আমাদের ভাবিয়ে তোলে। বন্যা শেষ হলে আলোচনা থেমে যায়, কিছু ত্রাণ বিতরণ হয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা তৈরি হয়, তারপর আবার পরবর্তী বর্ষার অপেক্ষা। এই চক্র থেকে বাংলাদেশকে বেরিয়ে আসতেই হবে। কারণ এটি কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৩০টিরও বেশি নদ-নদী রয়েছে এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশের একটি বড় অংশ প্রতিবছর কোনো না কোনো মাত্রায় বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি আরও বাড়াবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন যে পরিকল্পনা নেওয়া হবে, সেটি শুধু আজকের জন্য নয়—আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের বাংলাদেশের জন্য।
রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা আজ জাতীয় লজ্জায় পরিণত হয়েছে। একটি রাজধানী শহর, যেখানে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টির পরই প্রধান সড়ক, হাসপাতালের সামনে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার এবং আবাসিক এলাকা পানির নিচে চলে যায়—এটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একসময় ঢাকার চারপাশে অসংখ্য খাল ছিল, যা প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কাজ করত। আজ সেই খালগুলোর বড় অংশ দখল, ভরাট বা সংকুচিত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে জলাধার ধ্বংস, অপরিকল্পিত আবাসন নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সমন্বয়হীন নগর ব্যবস্থাপনা এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে একটি সমন্বিত “আরবান ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট মাস্টারপ্ল্যান” বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক বন্যা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের কারণে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। প্রাকৃতিক পানি চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অল্প সময়ের ভারী বর্ষণও ভয়াবহ বন্যার রূপ নিচ্ছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে বন্যা ব্যবস্থাপনার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
শিক্ষা খাতের ক্ষতি নিয়েও এখন নতুনভাবে ভাবতে হবে। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে একাধিকবার স্থগিত করতে হয়েছে। শুধু পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প পরীক্ষা পরিকল্পনা, ডিজিটাল শিক্ষা অবকাঠামো, নিরাপদ পরীক্ষাকেন্দ্র এবং দুর্যোগকালীন একাডেমিক সহায়তা নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। একটি প্রজন্ম যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কৃষি খাতের জন্যও সময় এসেছে নতুন নীতি গ্রহণের। শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, কৃষককে ঝুঁকিমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। বন্যা-সহনশীল ধান ও অন্যান্য ফসলের জাত সম্প্রসারণ, কৃষি বীমা, সহজ শর্তে পুনর্বাসন ঋণ, ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। একইভাবে গবাদিপশু ও পোলট্রি খামারের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, প্রাণিসম্পদ বীমা এবং জরুরি খাদ্য মজুত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বন্যা মোকাবিলায় সফল হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে। নেদারল্যান্ডস সমুদ্র ও নদীর সঙ্গে সহাবস্থান করে আধুনিক বাঁধ, জলাধার ও স্মার্ট পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিজেদের নিরাপদ করেছে। জাপান বিশাল ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বাংলাদেশও নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নদী, খাল, জলাভূমি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।
এখন প্রয়োজন একটি ২৫ বছরের জাতীয় বন্যা ও জলাবদ্ধতা মহাপরিকল্পনা। এই পরিকল্পনায় নদী খনন, খাল পুনরুদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ, স্মার্ট ড্রেনেজ, আধুনিক পাম্পিং স্টেশন, আন্তঃনদী সংযোগ উন্নয়ন, আগাম বন্যা সতর্কীকরণ প্রযুক্তি, জলবায়ু অভিযোজন এবং স্থানীয় সরকারকে আরও সক্ষম করার মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি বন্যাপ্রবণ জেলায় স্থায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে তোলা উচিত, যাতে সংকটের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত তৎপরতা সম্ভব হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বন্যা মোকাবিলা যেন রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় না হয়। সরকার, বিরোধী দল, বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী এবং স্থানীয় জনগণকে নিয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। কারণ নদী কোনো রাজনৈতিক দল দেখে না, বন্যার পানি কোনো মতাদর্শ মানে না; দুর্ভোগ সবার জন্য সমান।
আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন ত্রাণের রাজনীতি নয়, পরিকল্পনার রাজনীতি; সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়, স্থায়ী সমাধান; কাগুজে প্রকল্প নয়, বাস্তবায়িত অবকাঠামো। আমরা যদি এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলে আগামী প্রজন্ম একটি নিরাপদ, পরিকল্পিত এবং জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ পাবে। আর যদি ব্যর্থ হই, তাহলে প্রতি বর্ষায় একই সংবাদ, একই কান্না, একই ক্ষয়ক্ষতি এবং একই অসহায়ত্বের পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি তার ওপর। সময় এসেছে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার। কারণ একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথমেই আমাদের মানুষকে নিরাপদ রাখতে হবে—প্রতি বর্ষায়, প্রতি বছর।
লেখক: সাকিব মুহাম্মদ
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক সরকার
Tag :





















