গরীবমানুষদের চিকিৎসা করতে করতে বিয়ে করা হল না ডাক্তারবাবুর। তার অন্যান্যডাক্তার বন্ধুরা বাড়ি গাড়ি করে ফেললেও ডাক্তার লাহিড়ী নিজের সমস্ত আনন্দ খুঁজেপেলেন গরিব মানুষগুলোর মুখের হাসিতে। তপন বাবু সিদ্ধান্তনিলেন, সরকারের দেওয়া লক্ষাধিক টাকার মাইনেটাও আর নেবেন না, কারণ একাথাকার জন্য ওর অত টাকা দরকার পড়ে না। ২০০৩ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণকরার পর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যতটুকু অর্থের প্রয়োজন সেটুকু বাদ রেখে পেনশনেরবেশিরভাগ অংশটা ডক্টর লাহিড়ি দান করে দেন।
মানুষ মানুষের জন্যে ————- মোশারফ হোসেন
- Update Time : ০১:৪১:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
- / ৯০ Time View

কথায় বলে একজনের অপরাধে দশ জনের ভোগান্তি। ডাক্তারদের চরিত্র বা আচরণ
নিয়ে নেতিবাচক ধারণার পেছনে অতিরিক্ত কাজের চাপ, অপর্যাপ্ত সময়, এবং রোগীর
আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগের ঘাটতি প্রধান কারণ । অনেক ক্ষেত্রে, ক্যারিয়ার ও
ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং কর্মক্ষেত্রে অসহযোগিতামূলক
পরিবেশের কারণে চিকিৎসকরা মানসিক চাপে থাকেন, যা রোগীর সাথে তাদের আচরণে
নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু নরসিংদী জেলা হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে
এক নারী রোগীর সঙ্গে যৌন হয়রানি ও কুরুচিপূর্ণ আচরণের অভিযোগ ঘিরে জনমনে
তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা ও নিন্দার ঝড়। অভিযোগের বিষয়ে
অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. আসাদুজ্জামান সুমনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার
চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তুলনা না দিয়ে পারা গেল না।
তাহলে মনোযোগ সহকারে একটু লক্ষ্য করুন – ভারতের উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী
যোগী আদিত্যনাথকে এই বাঙালি ডাক্তারবাবু মুখের ওপর বলে দিয়েছিলেন, "অসুখটা
যখন আপনার হয়েছে, তখন আপনি আমার কাছে আসুন। আমি আপনার কাছে গেলে যে
সময়টা খরচ হবে, সে সময়ে পাশের গরীব মানুষগুলো চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাবে।
হ্যাঁ, কলকাতায় জন্মানো এই বাঙালি ডাক্তারবাবুই আজ উত্তরপ্রদেশের মানুষজনের
কাছে সৃষ্টিকর্তার দূত। বিদেশের সমস্ত নাম করা হাসপাতালের লক্ষ লক্ষ টাকার
চাকরির অফার ফিরিয়ে দিয়ে, এই বাঙালি ডাক্তারবাবু বিনামূল্যে চিকিৎসা করেন
উত্তরপ্রদেশের গরীব অসহায় মানুষদের। পদ্মশ্রী পুরস্কার পাওয়া এই ডাক্তারবাবুর
নাম তপন কুমার লাহিড়ী। বিরাশি বছর বয়সে পৌঁছেও প্রতিদিন সকালে উঠে কাঁধে একটা
ব্যাগ আর হাতে কালো ছাতা নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে যান ডাক্তার লাহিড়ী। গরীব
মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করবেন বলে। কিন্তু কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে
পাশ করার একজন এম,বি,বিএস, আচমকা উত্তরপ্রদেশে গিয়ে ডাক্তারি শুরু করল কেন
? কেনই বা নিজের সারা জীবনে অধিকাংশ সঞ্চয় দান করে দিলেন ডাক্তার তপন কুমার
লাহিড়ী? ১৯৪৬ সালে ৩রা জানুয়ারি শহর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তপন বাবু।
টাকার অভাবে গরিব মানুষদের চিকিৎসা না পাওয়ার চিত্রটা ছোট থেকেই ভাবিয়ে
তুলেছিল তপন বাবুকে। তাই বড়ো হয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এম,বি,বিএস
ডিগ্রি লাভ করেই তপন বাবু উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন সুদূর ইংল্যান্ডে। সেখানে
কার্ডিয়াক সার্জারিতে এফ,আর,সিএস, আর তারপর উনিশো বাহাত্তর সালে থোরাসিক
সার্জারিতে এম,সি,এইচ ডিগ্রি লাভ করেই সোজা দেশে ফেরেন ডাক্তার তপন কুমার
লাহিড়ী। বিদেশের অনেক টাকার চাকরি ছেড়ে মাত্র আড়াইশো টাকার বিনিময়ে
বেনারসের ইনস্টিটিউট ওফ মেডিকেল সায়েন্স কলেজে যোগ দেন তপন বাবু। আর
অন্যদিকে গরীব মানুষদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করা শুরু হল সেই সময় থেকেই। গরীব
মানুষদের চিকিৎসা করতে করতে বিয়ে করা হল না ডাক্তারবাবুর। তার অন্যান্য
ডাক্তার বন্ধুরা বাড়ি গাড়ি করে ফেললেও ডাক্তার লাহিড়ী নিজের সমস্ত আনন্দ খুঁজে
পেলেন গরিব মানুষগুলোর মুখের হাসিতে। এরপর আচমকা একদিন তপন বাবু সিদ্ধান্ত
নিলেন, সরকারের দেওয়া লক্ষাধিক টাকার মাইনেটাও আর নেবেন না, কারণ একা
থাকার জন্য ওর অত টাকা দরকার পড়ে না। ২০০৩ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ
করার পর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যতটুকু অর্থের প্রয়োজন সেটুকু বাদ রেখে পেনশনের
বেশিরভাগ অংশটা ডক্টর লাহিড়ি দান করে দেন। এর বিনিময়ে শুধু একটাই অনুরোধ
করলেন তিনি, জীবনের শেষ দিন অবধি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা কোয়ার্টার রুমে থাকার
ব্যবস্থা করার অনুরোধ। ডক্টর লাহিড়ি যেদিন অবসর নিলেন, তার সাতদিনের মধ্যে
বিদেশে পাঁচ-পাঁচখানা হাসপাতাল লক্ষাধিক টাকার প্যাকেজ অফার করলেন তাকে,
কিন্তু তাদের প্রত্যেককে ডক্টর তপন কুমার লাহিড়ি বললেন, চাকরি জীবনে টাকার
পিছনে না ছুটে গরিব মানুষের সেবা করে গেছি, এখন বয়স হয়েছে, টাকার পিছনে ছোটার
মতো পায়ের জোর নেই। তাই ধীরপায়ে হেঁটে গরিব মানুষদের চিকিৎসা করাটাই আমার
কাছে সহজ হবে। আপনাদের ধন্যবাদ আমাকে এই অফারটা করার জন্য। হ্যাঁ, ঠিক
এতটাই সোজাসাপ্টা কথা বলেন ডক্টর তপন কুমার লাহিড়ি।, তবে বেনারসের লোকেরা
অবশ্য ডক্টর লাহিড়িকে "ধন্যন্তরী" বলে ডাকে। কারণ ডক্টর লাহিড়ি কম পয়সায়
এমন ওষুধ দেন, যা কিনা শয্যাশায়ী মানুষদেরও সবলদের মতো সুস্থ করে তোলে। আর
সেই কারণেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ যখন অসুস্থ হয়েছিলেন,
তিনিই ডক্টর লাহিড়িকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন চিকিৎসা পাওয়ার আশায়। কিন্তু তার
উত্তরে ডক্টর লাহিড়ি কি বলেছিলেন, সেটা তো শুরুতে বলা হয়েছে । যোগী আদিত্যনাথ
অবশ্য তার কথায় খুশিই হয়েছিলেন। কারন তারা মানবপ্রেমী ও শিক্ষিত। চিকিৎসার
ক্ষেত্রে এই বিরাট অবদানের জন্য "পদ্মশ্রী" পুরস্কার পেয়েছেন ডক্টর তপন কুমার
লাহিড়ি। "পদ্মশ্রী" সম্মান পাওয়ার পর ডক্টর লাহিড়ি বলেছিলেন,–"এই সম্মানের
জন্য সরকারকে অসংখ্য ধন্যবাদ, ঈশ্বরের আশীর্বাদ যদি সঙ্গে থাকে, তাহলে আমার
শেষ নিঃশ্বাস অবধি রোগীদের সেবা করে যেতে চাই । তবে শুধু রোগীদের সেবা করাই নয়,
ডক্টর লাহিড়ি নিজের হাতে এমন অনেক ডাক্তারকে তৈরি করেছেন, যারা তার আদর্শে
উদ্বুদ্ধ হয়ে মানবসেবা করে চলেছেন। তাই হয়তো অবসর নেওয়ার কুড়ি বছর বাদেও
প্রত্যেক বছর ডক্টর লাহিড়ির জন্মদিনটাকে ধুমধাম করে পালন করে হাসপাতাল
কর্তৃপক্ষ। হ্যাঁ, প্রতিবছর ৩রা জানুয়ারি তারিখে বেনারসের গঙ্গায় গরিব মানুষেরা
শয়ে শয়ে প্রদীপ নদীতে ভাসান,– ডক্টর তপন কুমার লাহিড়ির মঙ্গল কামনায়। কারণ
তারা জানেন, যতদিন এই বাঙালি ডাক্তার সাহেব আছেন, ততদিন গরিব মানুষদের
চিকিৎসা নিয়ে কোন চিন্তা নেই। এই অন্ধকার সময়ে আপনার মতো মানুষেরাই
আমাদের কাছে আলোর ঠিকানা স্যার। যারা সাধারণের ভিড়ে থেকেও অসাধারণ কিছু
কাজ করে দেখায়। প্রণাম জানায় অসাধারণ মানব দরদী এই ডাক্তার বাবুকে। এরকম
একজন ঈশ্বর তুল্য মানুষকে যদি কৃতজ্ঞতা না জানাই তাহলে নিজেকে অকৃতজ্ঞ মনে
হবে ৷ তাই মানুষ মানুষের জন্যে।

























