০৬:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬

পাকিস্তানের ব্যর্থতা ও বাঙালি মুসলিমের ব্যর্থতা এবং বিপর্যয়ের মুখে মুসলিম উম্মাহ

মতামত
  • Update Time : ০৫:৪২:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৩৮ Time View

 

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

                                                                

পাকিস্তান কেন ব্যর্থ  হলো?

পাকিস্তান ব্যর্থ হয়েছে আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠা পেতে। এটি মুসলিম উম্মাহর এক বিশাল ও বেদনাদায়ক ব্যর্থতা। কোন রাষ্ট্র ব্যর্থ হওয়ার অর্থ সে দেশের জনগণের ব্যর্থতা। রাষ্ট্র ভূমি দেয় মাত্র; সে ভূমির উপর নির্মিত রাষ্ট্র বেড়ে উঠতে সফল হয় বা ব্যর্থ হয়ে যায় জনগণের কারণে।  পাকিস্তানের ব্যর্থতার কারণ অনেক। তবে মূল কারণটি হলো, দেশটির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, আলেম সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সাধারণ জনগণের বিশুদ্ধ ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠায় চরম ব্যর্থতা। তারা যদি নিজেরা ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠতে সফল হতো তবে পাকিস্তানও সফল হতো। কারণ রাষ্ট্র সফল হয় জনগণের গুণে। তাই পাকিস্তানের ব্যর্থতার জন্য পাকিস্তানের ভূমি ও জলবায়ু দায়ী নয়, দায়ী হলো দেশটির জনগণ। আর বেশী দায়ী হলো পুর্ব পাকিস্তানীরা -কারণ তারাই ছিল দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। তারা পাকিস্তান থেকে বহু কিছুই দাবী করেছে; কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে পাকিস্তানকে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশটির নাগরিকগণ -বিশেষ করে রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক  এবং সামরিক ও বেসামরিক নেতাগণ| বাঁচেনি নবীজী (সা:)’য়ের ইসলামকে ধারণ করে -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়া বিচার, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, শুরা ভিত্তিক শাসন, প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ববোধ, অন্যায়ের নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ।  অর্থাৎ তারা নিজেরা ব্যর্থ হয়েছে পূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে। আর যারা নিজেরা ব্যর্থ হয় পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হতে, তারা ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করবে কিরূপে?

সে সাথে জনগণ চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছে নিজেদের এবং সে সাথে দেশের শত্রুদের চিনতে। ফলে তারা নিজ ভোটে নির্বাচিত করেছে মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্রের খুনি এক ক্ষমতান্বেষী ফ্যাসিস্টকে। এভাবে তারা বিজয়ী করেছে নিজেদের শত্রুকে। নবীজী (সা:)’য়ের যুগে এমন কি অতি সাধরণ মুসলিমদের মাঝেও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ, সে রাষ্ট্রের সুরক্ষা, আদালতে শরিয়ার প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনে ইসলামের সমাজ কল্যাণমূলক নীতির প্রয়োগে আপোষহীন অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু সেরূপ আগ্রহ ও অঙ্গীকার পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিক দূরে থাক, বড় বড় আলেম ও আল্লামাদের মাঝেও ছিলনা। সেরূপ অঙ্গীকার না থাকায় তারা রাজনীতির ময়দানে নামেননি। তাদের কাছে রাজনীতির ন্যায় ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত তথা জিহাদ গুরুত্ব পায়নি। ফলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান তাদের চোখের সামনেই ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৭১’য়ে ইসলামের হিন্দুত্ববাদী শত্রুগণ যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নাশকতার কর্মে লিপ্ত -তখনও তারা নীরব ও নিষ্ক্রিয় থেকেছে।

বাঙালি মুসলিম কিরূপে পাকিস্তানের শত্রু হলো?

ঝড়ে ঘর ভেঙে গেলে পরিবারের নারী, শিশু ও বৃদ্ধরাসহ সবাই নিরাপত্তা হারায়। আর মুসলিম রাষ্ট্র ভেঙে গেলে নিরাপত্তা হারায় মুসলিম উম্মাহ। তাই সভ্য মানুষ মাত্রই শুধু তার নিজের ঘর খানি শুধু মজবুত করে না, নিজের দেশটিকেও শক্তিশালী করে।  এবং নিজ দেশের পাহারাদারীতে অংশ নেয়।  ইসলামে এটি ফরজ। তাই যে কোন সভ্য দেশে দেশদ্রোহী হওয়া বা দেশ ভাঙার অপরাধে জড়িত হওয়াটি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার অপরাধ।  মুসলিম উম্মাহ আজ প্রতিরক্ষাহীন, নিরাপত্তাহীন, স্বাধীনতাহীন ও ইজ্জতহীন তো শক্তিশালী রাষ্ট্র না থাকার কারণে। শক্তিশালী বৃহৎ রাষ্ট্রের বিকল্প কখনোই দুর্বল ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নয়।

তাই ইসলামে ইবাদত শুধু মজবুত গৃহ নির্মাণ নয়, বরং সর্বোচ্চ ইবাদত হলো শক্তিশালী রাষ্ট্র নির্মাণ। নবীজী (সা:)’য়ের মহান সাহাবাগণ নিজেদের অর্থ, শ্রম ও রক্তের সবচেয়ে বড় কুরবানী পেশ করেছেন এ রাজনৈতিক ইবাদতে। কিন্তু বাঙালি মুসলিমদের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ এ ইবাদতটি গুরুত্ব পায়নি। বরং গুরুত্ব পেয়ে দেশ ভাঙা। এবং সেটি ভারতীয় কাফিরদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে। এমন কি সে ফরজ কাজটি গুরুত্ব পায়নি বাঙালি আলেমদের কাছেও। নবীজী (সা)’র আমলে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বপালনের ইবাদতটি মসজিদে নববীর মেঝেতে বসে হয়েছে। মসজিদই ছিল তখন প্রশাসনিক কেন্দ্র। এছাড়া আর কোন দফতরই ছিল না। বিদেশী দূতগণ সেখানে এসে নবীজী (সা:)’য়ের সাথে দেখা করতেন। অথচ আলেমগণ রাজনীতির এ পবিত্র ইবাদতকে দুনিয়াদারী বলে মসজিদে তার চর্চাকে নিষিদ্ধ করেছে। দেশ ভারতের ন্যায় পৌত্তলিক কাফির শক্তির হামলার শিকার হলেও তারা প্রতিরোধে খাড়া হয়নি।

পাকিস্তানের জন্ম থেকেই দেশটির ঘরের শত্রুদের সংখ্যাটি ছিল বিশাল। সরকারের গভীরে (deep state) ছিল ব্রিটিশদের হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উগ্র সেক্যুলার আমলা বাহিনী, সেনাবাহিনী ও আদালতের বিচারক বাহিনী। ইসলামের প্রতি এবং পাকিস্তানের প্রতি এসব সেক্যুলারিস্টদের কোন দরদ ছিলনা। মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জতের সুরক্ষা নিয়ে তাদের কোন আগ্রহ ছিলনা। তারা পরিচালিত হতো নিছক নিজ স্বার্থ হাছিলের নেশায়। ব্রিটিশ আমলে তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছিল ব্রিটিশের অনুগত চাকর বাকর হওয়ার তাড়না নিয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশের এ চাকরগণই পাকিস্তানের মালিক হয়ে যায়।  স্বার্থান্বেষী এ আমলাগণ রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে লুটপাটের হাতিয়ার রূপে। পাকিস্তানকে সুরক্ষিত করা তাদের এজেন্ডা ছিল না। সে সময় পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে ছিল না ইসলামী চেতনা-সমৃদ্ধ যোগ্য নেতৃত্ব।  ছিল না চেতনায় পুষ্টি জোগানোর মত জ্ঞান-সমৃদ্ধ ইসলামী সাহিত্য। আল্লামা ইকবালের পর দেশটিতে আর কোন দ্বিতীয় ইকবাল জন্মায়নি। এ বিচারে বাংলা ভাষার দৈন্যতা ছিল আরো প্রকট। এ ভাষায় কোন কালেই কোন ইকবাল জন্ম নেয়নি। বরং বাংলা ভাষায় আধিপত্য ছিল বাঙালি পৌত্তলিকদের। বাংলা ভাষায় শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ বইয়ের লেখকই হলো হিন্দুত্ববাদী, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট বা নাস্তিক।  ফলে বাংলা সাহিত্য কাজ করেছে পাকিস্তান বিরোধী নাশকতায় শয়তানের হাতিয়ার রূপে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, কম্যুনিজমের ন্যায় হারাম মতবাদগুলির পক্ষে সবচেয়ে প্রবল জোয়ারটি শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানে। সে জোয়ার থামানোর মত বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধা উর্দু ভাষায় পশ্চিম পাকিস্তানের থাকলেও বাংলা ভাষায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। তখন সোভিয়েত রাশিয়া ও চীন থেকে আসা শুরু করে মার্কসীয় সাহিত্যের প্রবল স্রোত। সে স্রোতে ভেসে যায় ঝরে পড়া পাতার ন্যায় ইসলামী জ্ঞানশূণ্য বাঙালি মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীগণ। ভেসে যাওয়া সেসব রাজনৈতিক নেতাকর্মীগণ পাকিস্তানপন্থী বা ইসলামপন্থী হওয়ার বদলে ভারতপন্থী, রুশপন্থী, চীনপন্থী বা বামপন্থী যোদ্ধায় পরিণত হয়। তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা হয় পাকিস্তানের বিনাশ। তাদের সে লক্ষ্য পূরণে সাহায্যকারী রূপে আবির্ভূত হয় ভারত। ভারত সে ভূমিকা পালনের জন্য ১৯৪৭ সাল থেকেই প্রস্তুত ছিল। একাত্তরের যুদ্ধে ভারত সুযোগ পায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর সামরিক অধিকৃতি স্থাপনের। এভাবেই ভারত ও ভারতপন্থীরা বানচাল করে দেয় দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া বিশাল নিয়ামত এবং অর্পিত আমানত ভাবেই বিনষ্ট হয়ে যায়।

 

দেশ ভাঙার কবিরা গুনাহও যখন নন্দিত হয়

 

মহান আল্লাহতায়ালা ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং সে রাষ্ট্রের সুরক্ষা দেয়া, ভূগোলে বৃদ্ধি আনা, রাষ্ট্রের রাজনীতি ও প্রশাসনে পরিশুদ্ধি আনাকে জিহাদের মর্যাদা দিয়েছেন। সে জিহাদকে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া খলিফাগণ -তাদের নানারূপ চারিত্রিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও চালু রেখেছিলেন।  রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংঘটিত জিহাদের কারণেই ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে। মুসলিমগণ এভাবে কোটি কোটি মানুষকে মুক্তি দিয়েছিল জাহান্নামের পথ থেকে। এরূপ বিপুল সংখ্যক মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো কাজ আর কোন কালেই হয়নি। রাষ্ট্র এভাবেই পৃথিবী পৃষ্ঠের সবচেয়ে কল্যাণকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তাই কোন সভ্য, বিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক জনগণ কখনোই কোন মুসলিম রাষ্ট্রকে ভাঙে না, বরং সামর্থ্য থাকলে নিজ দেশের ভূগোলে আরো বৃদ্ধি আনে। কারণ ভূগোল বাড়লে দেশবাসীর শক্তি, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং ইজ্জত বাড়ে। অপর দিকে ভূগোল ভাঙ্গলে পরাধীনতা ও অপমান বাড়ে। এজন্যই ইসলামে দেশভাঙা ও মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি হারাম। দেশ ভাঙার যুদ্ধে নিহত হলে জাহান্নামে যেতে হয়। সে বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে সুরা নিচের আয়াতে:

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ

অর্থ: “আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।”-(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৩।

হারাম হলো অকারণে এমন কি একটি গাছের ডাল ভাঙাও । এমন কি যুদ্ধ কালেও। কারণ এতে ক্ষতি হয় মহান আল্লাহতায়ালার এক নিরপরাধ সৃষ্টির। ফলে মুসলিমদের গৌরব যুগে অসংখ্য যুদ্ধে হয়েছে স্রেফ দেশের ভূগোল বাড়াতে, ভাঙতে নয়। ভুগোল বাড়ানোর সে ধারাবাহিকতায় মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ফলে বিশ্বময় বেড়েছে তাদের প্রভাব, সুনাম ও সুকীর্তি।

অপর দিকে মুসলিমগণ তাদের নিজ দেশের ভূগোলকে ক্ষুদ্রতর করার ধারাবাহিকতায় আজ শক্তিহীন, স্বাধীনতাহীন ও ইজ্জতহীন। তারা ইসলাম থেকে এতটাই দূরে সরেছে যে দেশ ভাঙার কবিরা গুনাহও তাদের কাছে উৎসবের বিষয় গণ্য হয়। বাঙালি মুসলিমের জীবনে সেরূপ একটি উৎসব দেখা গেছে ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙার মধ্য দিয়ে। একাত্তরে বাঙালি মুসলিমগণ যুদ্ধ করেছে দেশ ভাঙতে এবং নিজ দেশের অভ্যন্তরে হিন্দুত্ববাদী শত্রুদের অধিকৃতি বাড়াতে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কখনোই সংখ্যালঘিষ্ঠদের থেকে আলাদা হয়না, বরং দেশের সংহতি বাঁচাতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংখ্যালঘিষ্ঠদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু সেক্যুলারিস্ট বাঙালি মুসলিমদের দ্বারা ঘটেছে উল্টোটি। তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে সংখ্যালঘু অবাঙালিদের থেকে। যে বিভক্তিকে মহান আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন, সে বিভক্তি নিয়ে তারা প্রতি বছর ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরে উৎসব করে। মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করা শয়তানের এজেন্ডা। তাই যারা বিভক্তি নিয়ে উৎসব করে তারা আনন্দ বাড়ায় শয়তানের এবং শয়তানের পৌত্তলিক এজেন্টদের। এভাবে প্রতিশ্রুত আযাব ডেকে আনে মহান রব’য়ের। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য আযাবের সে প্রতিশ্রুতি শোনানো হয়েছে সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে।

শয়তান যখন আযাবের হাতিয়ার হয়

বাঙালি মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে আরেকটি ক্ষেত্রে। সেটি হলো, রাজনীতির অঙ্গণ থেকে দুর্বৃত্তদের না সরিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করেছে। তারই প্রমাণ, মুজিবের ন্যায় ফ্যাসিস্ট, গণতন্ত্রের খুনি, দুর্ভিক্ষের স্থপতি, দুর্বৃত্তদের পালনকর্তা এবং ভারতপ্রেমীকে তারা বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে।  এটি রাজনীতি নয়, বরং বড় মাপের অপরাধ। অপরাধ মাত্রই তো শাস্তিকে অনিবার্য করে। তাছাড়া অপরাধ করাই শুধু পাপ নয়, মহা পাপ হলো অপরাধীকে ঘৃণা না করে সম্মানিত করা। বাঙালি মুসলিমদের দ্বারা সে পাপও কি কম হয়েছে? বাংলাদেশী শুধু দুর্বত্তিতে তথা অপরাধ কর্মে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়নি, রেকর্ড গড়েছে অপরাধীর প্রতি সম্মান দেখিয়েও। সে পাপ বাংলাদেশীরা জাতীয় ভাবে করেছে মুজিবের ন্যায় নৃশংস অপরাধীকে জাতির পিতা, নেতা ও বঙ্গবন্ধুর আসনে বসিয়ে! বিশ্বে কোন সভ্য ও নীতিবান মানুষ কখনো  সে কাজটি করেনি। একাজটিও বাংলাদেশীদের। যারা সেরূপ করে তাদের উপর জালেম শাসকদের আযাবের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়। কারণ, এমন অপরাধীদের আযাব দেয়াই মহান রব’য়ের সূন্নত। বস্তুত মুজিব ও হাসিনা পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশীদের আযাব দেয়ার হাতিয়ারে। মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও তাঁর বিধান থেকে যারা দূরে সরে, তাদের ঘাড়ের উপর এভাবে শয়তানকে চাপিয়ে শাস্তি দেয়াই মহান রব’য়ের বিধান। যেমন বলা হয়েছে:

 

وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَـٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ

অর্থ: “যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দেই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী।” –(সুরা জুখরুফ, আয়াত ৩৬)।

আল্লাহতায়ালার স্মরণ নিয়ে বাঁচার অর্থ তাঁর বিধানের প্রতি আনুগত্য নিয়ে বাঁচা। সে কখনো মুসলিম দেশ ভাঙার হারাম যুদ্ধে নামে না। বরং জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে নামে সে মুসলিম ভূমির অখণ্ডতা বাঁচাতে। মুসলিম দেশ ভাঙার যুদ্ধে নামার অর্থ ঘাড়ের উপর শয়তান নামিয়ে আনা -যার প্রতিশ্রুতি এসেছে উপরের আয়াতে। তাই শয়তান দেখা গেছে মুজিব, জিয়া ও তাদের অনুসারীদের ঘাড়ে। তারা তাই পৌত্তলিক শিবিরে উঠেছে এবং কাফিরদের অর্থ, আস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে মুসলিম দেশ পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধে নেমেছে।  এবং মুজিব কন্যা হাসিনা নেমেছে দেশের পথে ঘাটে মূর্তি বসানোর কাজে।  মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি ও মুসলিম দেশ ভাঙা হলো বেঈমানীর শো-কেস; অপরদিকে একতা এবং মুসলিম রাষ্ট্রের অখণ্ডতা হলো ঈমানের শো-কেস। জনগণের ঈমান দেখা যায় একতার মাঝে। সেটি ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে একতার গড়ার মাঝে। ২২ টুকরোয় বিভক্ত আরব তাদের বিভক্তি নিয়ে উৎসব করে। এবং বিপুল অর্থ, শ্রম ও মেধা ব্যয় করে সে বিভক্তির দেয়াল বাঁচাতে। তাদের এ বিভক্তির মাঝে প্রকাশ পায় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ -যে হুকুম এসেছে সুরা আল ইমরানের উপরিউক্ত ১০৩ নম্বর আয়াতে। সে আয়াতে হুকুমটি ঐক্যের। এভাবে তারা বৃদ্ধি এনেছে নিজেদের পাপের অংকে। ফলে শাস্তি স্বরূপ প্রায় ৪০ কোটির বেশী আরব মুসলিম লাগাতর মার খাচ্ছে ও অপমানিত হচ্ছে বিশ্বের নানা দেশ থেকে জমা হওয়া ৭০ লাখ ইসরাইলীর হাতে। মহান আল্লাহতায়ালা বিভক্তির প্রতিশ্রুত আযাব এভাবেই দিয়ে থাকেন –সে আযাবের প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছেন সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির কারণেই গণহত্যার শিকার কাশ্মীর, ভারত, আরাকান, জিংজিয়াং’য়ের মুসলিমসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিম।

 

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thedailysarkar@gmail.com

About Author Information

পাকিস্তানের ব্যর্থতা ও বাঙালি মুসলিমের ব্যর্থতা এবং বিপর্যয়ের মুখে মুসলিম উম্মাহ

Update Time : ০৫:৪২:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

 

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

                                                                

পাকিস্তান কেন ব্যর্থ  হলো?

পাকিস্তান ব্যর্থ হয়েছে আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠা পেতে। এটি মুসলিম উম্মাহর এক বিশাল ও বেদনাদায়ক ব্যর্থতা। কোন রাষ্ট্র ব্যর্থ হওয়ার অর্থ সে দেশের জনগণের ব্যর্থতা। রাষ্ট্র ভূমি দেয় মাত্র; সে ভূমির উপর নির্মিত রাষ্ট্র বেড়ে উঠতে সফল হয় বা ব্যর্থ হয়ে যায় জনগণের কারণে।  পাকিস্তানের ব্যর্থতার কারণ অনেক। তবে মূল কারণটি হলো, দেশটির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, আলেম সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সাধারণ জনগণের বিশুদ্ধ ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠায় চরম ব্যর্থতা। তারা যদি নিজেরা ইসলাম নিয়ে বেড়ে উঠতে সফল হতো তবে পাকিস্তানও সফল হতো। কারণ রাষ্ট্র সফল হয় জনগণের গুণে। তাই পাকিস্তানের ব্যর্থতার জন্য পাকিস্তানের ভূমি ও জলবায়ু দায়ী নয়, দায়ী হলো দেশটির জনগণ। আর বেশী দায়ী হলো পুর্ব পাকিস্তানীরা -কারণ তারাই ছিল দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। তারা পাকিস্তান থেকে বহু কিছুই দাবী করেছে; কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে পাকিস্তানকে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশটির নাগরিকগণ -বিশেষ করে রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক  এবং সামরিক ও বেসামরিক নেতাগণ| বাঁচেনি নবীজী (সা:)’য়ের ইসলামকে ধারণ করে -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়া বিচার, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, শুরা ভিত্তিক শাসন, প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ববোধ, অন্যায়ের নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ।  অর্থাৎ তারা নিজেরা ব্যর্থ হয়েছে পূর্ণ মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে। আর যারা নিজেরা ব্যর্থ হয় পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হতে, তারা ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করবে কিরূপে?

সে সাথে জনগণ চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছে নিজেদের এবং সে সাথে দেশের শত্রুদের চিনতে। ফলে তারা নিজ ভোটে নির্বাচিত করেছে মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্রের খুনি এক ক্ষমতান্বেষী ফ্যাসিস্টকে। এভাবে তারা বিজয়ী করেছে নিজেদের শত্রুকে। নবীজী (সা:)’য়ের যুগে এমন কি অতি সাধরণ মুসলিমদের মাঝেও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ, সে রাষ্ট্রের সুরক্ষা, আদালতে শরিয়ার প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনে ইসলামের সমাজ কল্যাণমূলক নীতির প্রয়োগে আপোষহীন অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু সেরূপ আগ্রহ ও অঙ্গীকার পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিক দূরে থাক, বড় বড় আলেম ও আল্লামাদের মাঝেও ছিলনা। সেরূপ অঙ্গীকার না থাকায় তারা রাজনীতির ময়দানে নামেননি। তাদের কাছে রাজনীতির ন্যায় ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত তথা জিহাদ গুরুত্ব পায়নি। ফলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান তাদের চোখের সামনেই ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৭১’য়ে ইসলামের হিন্দুত্ববাদী শত্রুগণ যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নাশকতার কর্মে লিপ্ত -তখনও তারা নীরব ও নিষ্ক্রিয় থেকেছে।

বাঙালি মুসলিম কিরূপে পাকিস্তানের শত্রু হলো?

ঝড়ে ঘর ভেঙে গেলে পরিবারের নারী, শিশু ও বৃদ্ধরাসহ সবাই নিরাপত্তা হারায়। আর মুসলিম রাষ্ট্র ভেঙে গেলে নিরাপত্তা হারায় মুসলিম উম্মাহ। তাই সভ্য মানুষ মাত্রই শুধু তার নিজের ঘর খানি শুধু মজবুত করে না, নিজের দেশটিকেও শক্তিশালী করে।  এবং নিজ দেশের পাহারাদারীতে অংশ নেয়।  ইসলামে এটি ফরজ। তাই যে কোন সভ্য দেশে দেশদ্রোহী হওয়া বা দেশ ভাঙার অপরাধে জড়িত হওয়াটি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার অপরাধ।  মুসলিম উম্মাহ আজ প্রতিরক্ষাহীন, নিরাপত্তাহীন, স্বাধীনতাহীন ও ইজ্জতহীন তো শক্তিশালী রাষ্ট্র না থাকার কারণে। শক্তিশালী বৃহৎ রাষ্ট্রের বিকল্প কখনোই দুর্বল ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নয়।

তাই ইসলামে ইবাদত শুধু মজবুত গৃহ নির্মাণ নয়, বরং সর্বোচ্চ ইবাদত হলো শক্তিশালী রাষ্ট্র নির্মাণ। নবীজী (সা:)’য়ের মহান সাহাবাগণ নিজেদের অর্থ, শ্রম ও রক্তের সবচেয়ে বড় কুরবানী পেশ করেছেন এ রাজনৈতিক ইবাদতে। কিন্তু বাঙালি মুসলিমদের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ এ ইবাদতটি গুরুত্ব পায়নি। বরং গুরুত্ব পেয়ে দেশ ভাঙা। এবং সেটি ভারতীয় কাফিরদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে। এমন কি সে ফরজ কাজটি গুরুত্ব পায়নি বাঙালি আলেমদের কাছেও। নবীজী (সা)’র আমলে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বপালনের ইবাদতটি মসজিদে নববীর মেঝেতে বসে হয়েছে। মসজিদই ছিল তখন প্রশাসনিক কেন্দ্র। এছাড়া আর কোন দফতরই ছিল না। বিদেশী দূতগণ সেখানে এসে নবীজী (সা:)’য়ের সাথে দেখা করতেন। অথচ আলেমগণ রাজনীতির এ পবিত্র ইবাদতকে দুনিয়াদারী বলে মসজিদে তার চর্চাকে নিষিদ্ধ করেছে। দেশ ভারতের ন্যায় পৌত্তলিক কাফির শক্তির হামলার শিকার হলেও তারা প্রতিরোধে খাড়া হয়নি।

পাকিস্তানের জন্ম থেকেই দেশটির ঘরের শত্রুদের সংখ্যাটি ছিল বিশাল। সরকারের গভীরে (deep state) ছিল ব্রিটিশদের হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উগ্র সেক্যুলার আমলা বাহিনী, সেনাবাহিনী ও আদালতের বিচারক বাহিনী। ইসলামের প্রতি এবং পাকিস্তানের প্রতি এসব সেক্যুলারিস্টদের কোন দরদ ছিলনা। মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জতের সুরক্ষা নিয়ে তাদের কোন আগ্রহ ছিলনা। তারা পরিচালিত হতো নিছক নিজ স্বার্থ হাছিলের নেশায়। ব্রিটিশ আমলে তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছিল ব্রিটিশের অনুগত চাকর বাকর হওয়ার তাড়না নিয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশের এ চাকরগণই পাকিস্তানের মালিক হয়ে যায়।  স্বার্থান্বেষী এ আমলাগণ রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে লুটপাটের হাতিয়ার রূপে। পাকিস্তানকে সুরক্ষিত করা তাদের এজেন্ডা ছিল না। সে সময় পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে ছিল না ইসলামী চেতনা-সমৃদ্ধ যোগ্য নেতৃত্ব।  ছিল না চেতনায় পুষ্টি জোগানোর মত জ্ঞান-সমৃদ্ধ ইসলামী সাহিত্য। আল্লামা ইকবালের পর দেশটিতে আর কোন দ্বিতীয় ইকবাল জন্মায়নি। এ বিচারে বাংলা ভাষার দৈন্যতা ছিল আরো প্রকট। এ ভাষায় কোন কালেই কোন ইকবাল জন্ম নেয়নি। বরং বাংলা ভাষায় আধিপত্য ছিল বাঙালি পৌত্তলিকদের। বাংলা ভাষায় শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ বইয়ের লেখকই হলো হিন্দুত্ববাদী, সেক্যুলারিস্ট, কম্যুনিস্ট বা নাস্তিক।  ফলে বাংলা সাহিত্য কাজ করেছে পাকিস্তান বিরোধী নাশকতায় শয়তানের হাতিয়ার রূপে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গণে জাতীয়তাবাদ, সেক্যুলারিজম, কম্যুনিজমের ন্যায় হারাম মতবাদগুলির পক্ষে সবচেয়ে প্রবল জোয়ারটি শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানে। সে জোয়ার থামানোর মত বুদ্ধিবৃত্তিক যোদ্ধা উর্দু ভাষায় পশ্চিম পাকিস্তানের থাকলেও বাংলা ভাষায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। তখন সোভিয়েত রাশিয়া ও চীন থেকে আসা শুরু করে মার্কসীয় সাহিত্যের প্রবল স্রোত। সে স্রোতে ভেসে যায় ঝরে পড়া পাতার ন্যায় ইসলামী জ্ঞানশূণ্য বাঙালি মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীগণ। ভেসে যাওয়া সেসব রাজনৈতিক নেতাকর্মীগণ পাকিস্তানপন্থী বা ইসলামপন্থী হওয়ার বদলে ভারতপন্থী, রুশপন্থী, চীনপন্থী বা বামপন্থী যোদ্ধায় পরিণত হয়। তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা হয় পাকিস্তানের বিনাশ। তাদের সে লক্ষ্য পূরণে সাহায্যকারী রূপে আবির্ভূত হয় ভারত। ভারত সে ভূমিকা পালনের জন্য ১৯৪৭ সাল থেকেই প্রস্তুত ছিল। একাত্তরের যুদ্ধে ভারত সুযোগ পায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর সামরিক অধিকৃতি স্থাপনের। এভাবেই ভারত ও ভারতপন্থীরা বানচাল করে দেয় দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন। মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া বিশাল নিয়ামত এবং অর্পিত আমানত ভাবেই বিনষ্ট হয়ে যায়।

 

দেশ ভাঙার কবিরা গুনাহও যখন নন্দিত হয়

 

মহান আল্লাহতায়ালা ইসলামী রাষ্ট্র গড়া এবং সে রাষ্ট্রের সুরক্ষা দেয়া, ভূগোলে বৃদ্ধি আনা, রাষ্ট্রের রাজনীতি ও প্রশাসনে পরিশুদ্ধি আনাকে জিহাদের মর্যাদা দিয়েছেন। সে জিহাদকে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানিয়া খলিফাগণ -তাদের নানারূপ চারিত্রিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও চালু রেখেছিলেন।  রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংঘটিত জিহাদের কারণেই ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিশাল ভূ-ভাগ জুড়ে। মুসলিমগণ এভাবে কোটি কোটি মানুষকে মুক্তি দিয়েছিল জাহান্নামের পথ থেকে। এরূপ বিপুল সংখ্যক মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো কাজ আর কোন কালেই হয়নি। রাষ্ট্র এভাবেই পৃথিবী পৃষ্ঠের সবচেয়ে কল্যাণকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তাই কোন সভ্য, বিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক জনগণ কখনোই কোন মুসলিম রাষ্ট্রকে ভাঙে না, বরং সামর্থ্য থাকলে নিজ দেশের ভূগোলে আরো বৃদ্ধি আনে। কারণ ভূগোল বাড়লে দেশবাসীর শক্তি, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং ইজ্জত বাড়ে। অপর দিকে ভূগোল ভাঙ্গলে পরাধীনতা ও অপমান বাড়ে। এজন্যই ইসলামে দেশভাঙা ও মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি হারাম। দেশ ভাঙার যুদ্ধে নিহত হলে জাহান্নামে যেতে হয়। সে বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে সুরা নিচের আয়াতে:

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ

অর্থ: “আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।”-(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১০৩।

হারাম হলো অকারণে এমন কি একটি গাছের ডাল ভাঙাও । এমন কি যুদ্ধ কালেও। কারণ এতে ক্ষতি হয় মহান আল্লাহতায়ালার এক নিরপরাধ সৃষ্টির। ফলে মুসলিমদের গৌরব যুগে অসংখ্য যুদ্ধে হয়েছে স্রেফ দেশের ভূগোল বাড়াতে, ভাঙতে নয়। ভুগোল বাড়ানোর সে ধারাবাহিকতায় মুসলিমগণ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ফলে বিশ্বময় বেড়েছে তাদের প্রভাব, সুনাম ও সুকীর্তি।

অপর দিকে মুসলিমগণ তাদের নিজ দেশের ভূগোলকে ক্ষুদ্রতর করার ধারাবাহিকতায় আজ শক্তিহীন, স্বাধীনতাহীন ও ইজ্জতহীন। তারা ইসলাম থেকে এতটাই দূরে সরেছে যে দেশ ভাঙার কবিরা গুনাহও তাদের কাছে উৎসবের বিষয় গণ্য হয়। বাঙালি মুসলিমের জীবনে সেরূপ একটি উৎসব দেখা গেছে ১৯৭১’য়ে পাকিস্তান ভাঙার মধ্য দিয়ে। একাত্তরে বাঙালি মুসলিমগণ যুদ্ধ করেছে দেশ ভাঙতে এবং নিজ দেশের অভ্যন্তরে হিন্দুত্ববাদী শত্রুদের অধিকৃতি বাড়াতে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কখনোই সংখ্যালঘিষ্ঠদের থেকে আলাদা হয়না, বরং দেশের সংহতি বাঁচাতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংখ্যালঘিষ্ঠদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু সেক্যুলারিস্ট বাঙালি মুসলিমদের দ্বারা ঘটেছে উল্টোটি। তারা বিচ্ছিন্ন হয়েছে সংখ্যালঘু অবাঙালিদের থেকে। যে বিভক্তিকে মহান আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন, সে বিভক্তি নিয়ে তারা প্রতি বছর ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরে উৎসব করে। মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করা শয়তানের এজেন্ডা। তাই যারা বিভক্তি নিয়ে উৎসব করে তারা আনন্দ বাড়ায় শয়তানের এবং শয়তানের পৌত্তলিক এজেন্টদের। এভাবে প্রতিশ্রুত আযাব ডেকে আনে মহান রব’য়ের। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য আযাবের সে প্রতিশ্রুতি শোনানো হয়েছে সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে।

শয়তান যখন আযাবের হাতিয়ার হয়

বাঙালি মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে আরেকটি ক্ষেত্রে। সেটি হলো, রাজনীতির অঙ্গণ থেকে দুর্বৃত্তদের না সরিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করেছে। তারই প্রমাণ, মুজিবের ন্যায় ফ্যাসিস্ট, গণতন্ত্রের খুনি, দুর্ভিক্ষের স্থপতি, দুর্বৃত্তদের পালনকর্তা এবং ভারতপ্রেমীকে তারা বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে।  এটি রাজনীতি নয়, বরং বড় মাপের অপরাধ। অপরাধ মাত্রই তো শাস্তিকে অনিবার্য করে। তাছাড়া অপরাধ করাই শুধু পাপ নয়, মহা পাপ হলো অপরাধীকে ঘৃণা না করে সম্মানিত করা। বাঙালি মুসলিমদের দ্বারা সে পাপও কি কম হয়েছে? বাংলাদেশী শুধু দুর্বত্তিতে তথা অপরাধ কর্মে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়নি, রেকর্ড গড়েছে অপরাধীর প্রতি সম্মান দেখিয়েও। সে পাপ বাংলাদেশীরা জাতীয় ভাবে করেছে মুজিবের ন্যায় নৃশংস অপরাধীকে জাতির পিতা, নেতা ও বঙ্গবন্ধুর আসনে বসিয়ে! বিশ্বে কোন সভ্য ও নীতিবান মানুষ কখনো  সে কাজটি করেনি। একাজটিও বাংলাদেশীদের। যারা সেরূপ করে তাদের উপর জালেম শাসকদের আযাবের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়। কারণ, এমন অপরাধীদের আযাব দেয়াই মহান রব’য়ের সূন্নত। বস্তুত মুজিব ও হাসিনা পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশীদের আযাব দেয়ার হাতিয়ারে। মহান আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও তাঁর বিধান থেকে যারা দূরে সরে, তাদের ঘাড়ের উপর এভাবে শয়তানকে চাপিয়ে শাস্তি দেয়াই মহান রব’য়ের বিধান। যেমন বলা হয়েছে:

 

وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَـٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ

অর্থ: “যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দেই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী।” –(সুরা জুখরুফ, আয়াত ৩৬)।

আল্লাহতায়ালার স্মরণ নিয়ে বাঁচার অর্থ তাঁর বিধানের প্রতি আনুগত্য নিয়ে বাঁচা। সে কখনো মুসলিম দেশ ভাঙার হারাম যুদ্ধে নামে না। বরং জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে নামে সে মুসলিম ভূমির অখণ্ডতা বাঁচাতে। মুসলিম দেশ ভাঙার যুদ্ধে নামার অর্থ ঘাড়ের উপর শয়তান নামিয়ে আনা -যার প্রতিশ্রুতি এসেছে উপরের আয়াতে। তাই শয়তান দেখা গেছে মুজিব, জিয়া ও তাদের অনুসারীদের ঘাড়ে। তারা তাই পৌত্তলিক শিবিরে উঠেছে এবং কাফিরদের অর্থ, আস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে মুসলিম দেশ পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধে নেমেছে।  এবং মুজিব কন্যা হাসিনা নেমেছে দেশের পথে ঘাটে মূর্তি বসানোর কাজে।  মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি ও মুসলিম দেশ ভাঙা হলো বেঈমানীর শো-কেস; অপরদিকে একতা এবং মুসলিম রাষ্ট্রের অখণ্ডতা হলো ঈমানের শো-কেস। জনগণের ঈমান দেখা যায় একতার মাঝে। সেটি ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে একতার গড়ার মাঝে। ২২ টুকরোয় বিভক্ত আরব তাদের বিভক্তি নিয়ে উৎসব করে। এবং বিপুল অর্থ, শ্রম ও মেধা ব্যয় করে সে বিভক্তির দেয়াল বাঁচাতে। তাদের এ বিভক্তির মাঝে প্রকাশ পায় মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ -যে হুকুম এসেছে সুরা আল ইমরানের উপরিউক্ত ১০৩ নম্বর আয়াতে। সে আয়াতে হুকুমটি ঐক্যের। এভাবে তারা বৃদ্ধি এনেছে নিজেদের পাপের অংকে। ফলে শাস্তি স্বরূপ প্রায় ৪০ কোটির বেশী আরব মুসলিম লাগাতর মার খাচ্ছে ও অপমানিত হচ্ছে বিশ্বের নানা দেশ থেকে জমা হওয়া ৭০ লাখ ইসরাইলীর হাতে। মহান আল্লাহতায়ালা বিভক্তির প্রতিশ্রুত আযাব এভাবেই দিয়ে থাকেন –সে আযাবের প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছেন সুরা আল ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে। মুসলিম উম্মাহর বিভক্তির কারণেই গণহত্যার শিকার কাশ্মীর, ভারত, আরাকান, জিংজিয়াং’য়ের মুসলিমসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিম।