০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬
বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ইরান যুদ্ধ : জালানি তেল সংকটে বাংলাদেশ

মতামত
  • Update Time : ০২:১০:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬
  • / ২৫৫ Time View

।। এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া।।
“ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ” এমটাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট। য়া বাংলাদেশের জন্য উদেত্বগ ও উৎকন্ঠার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। বর্তমান অবস্থায় ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এখন আর শুধুমাত্র সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি শক্তির পুনর্বিন্যাসের এক তীব্র লড়াইয়ে রূপ নিতে যাচ্ছে বলেই বিশ্লেষকরা ধারনা করছেন। এই যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে তেল, গ্যাস, সরবরাহপথ এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান বিশ্বে তেল আর কেবল একটি পণ্য নয়, এটি পরিণত হয়েছে এক শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে।

বিশ্বের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ মোট ব্যবস্থার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। এই গুরুত্বপূর্ণ পথটিতে চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে সরাসরি ধাক্কা দিচ্ছে। এর ফলে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, আর এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী আরও গভীর ও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান সংকটকে শুরুর দিকে আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন এই উত্তেজনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর।

ইতোমধ্যে মাস শেষ হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ। এর প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘায়িত এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে, আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এই সংকটের প্রভাব থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশও। দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশ তীব্র তেল সংকটের মুখে পড়তে পারে। যা বাংলাদেশকে গভীর সঙ্কটের খাঁদের কিনারায় নিয়ে দাড় করাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের জন্যও ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ হচ্ছে, দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক এই গুরুত্বপূর্ণ রুটের ওপর নির্ভরশীল, যা মুম্বাই থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়। বাকি অংশ চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথে পরিচালিত হয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আন্ডারসি কেবল ডিজিটাল যোগাযোগের প্রধান ভিত্তি। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক এসব সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যদিও ইরান সরাসরি এসব কেবল অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দেয়নি, তবে যুদ্ধ প্রভাবিত অঞ্চলে যে কোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এই সাবমেরিন কেবল। ফলে ভারতের ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের বড় অংশই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে, সমুদ্রতলের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা এখন বৈশ্বিক নতুন হুমকি হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স এন্ড ফিনান্সিয়াল এনালাইসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে,  “আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হতে পারে।” ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের সীমিত জ্বালানি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ফিলিং স্টেশন সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ায় বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি খুবই সঙ্কটাপন্ন। সেখানে অল্প পরিমাণ জ্বালানি প্লাস্টিকের বোতলে বেশি দামে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতেও যানবাহনের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের জেরে ভয়ংকর চাপে পড়েছে বৈশ্বিক তেলের বাজার। অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। তেল সংকটের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় ও অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ। জ্বালানির ব্যবহার কমাতে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। অন্যদিকে সঙ্কটময় এই মুহুর্তে বিকল্প অবস্থান থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাংলাদেশের জন্য অত্যান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। অথচ, রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতে অনুমতি চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের দেওয়া চিঠির এখনো কোন জবাব দেয়নি ওয়াশিংটন।

৩০ মার্চ সচিবালয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র জানান, “রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য ইন্ডিয়াকে একটা স্যাংশন ওয়েভার দিয়েছিল (যুক্তরাষ্ট্র), ঈদের আগের দিন আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সরকারের মিটিংয়ে। মিটিংয়ে ওনাদের বোঝাতে চেষ্টা করা হয়েছে যে, রাশিয়া থেকে যেন আমাদের অন্তত দুই মাসের অথবা ছয় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আনার অনুমতি দেয়, স্যাংশন ওয়েভার দেয়।” রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ডিজেলসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনতে বাংলাদেশের বিশেষ ছাড়ের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে এমন আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত সেই আশ্বাস পূরনে কার্যকর কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর পাম্পগুলো বেশ কয়েকদিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারছে না। এমন অবস্থায় ডিপো থেকে যতটুকু জ্বালানি আসছে তা নিতে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য গাড়ির চালকরা আগেভাগেই ভিড় করছেন পাম্পে। ছুটি বা কর্মদিবস- কোনো দিনই সেখানে ফাঁকা থাকছে না।

মধ্যপ্রাচ্য বাদেও পেট্রোনাস মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। সামান্য কিছু ডিজেল ও অন্যান্য ফার্নেস অয়েল চীন ও ভারত থেকেও আমদানি করা হয়। আর ওমান, সৌদি আরব এবং বিশেষভাবে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। সম্প্রতি কিছু পরিমাণ এলএনজি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের এফএসআরইউ বা যেসব ফ্লোটিং টার্মিনাল আছে সেগুলো মার্কিন প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে আমরা জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কিন্তু শ্রীলংকা নয়। বাংলাদেশ বিকাশমান অর্থনীতি দেশ। বাংলাদেশের ট্রেড ভলিউম শ্রীলংকার তুলনায় অনেক বেশি। জনসংখ্যার আধিক্য ও মবিলিটির কারণে অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধিও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি নিরাপত্তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। এখন বাংলাদেশ কিছুটা হলেও জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অন্তত এ সুবিধা বিবেচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এজন্য বিকল্প বাজারগুলোকে বিবেচনায় আনতে হবে। জ্বালানি, অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে সমন্বিত ভূমিকা রাখতে হবে। এ তিন মন্ত্রণালয় জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করে সিঙ্গাপুর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি ভারতের মতো বাংলাদেশকেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা অব্যাহত রেখে দাবি আদায় করতে হবে।

যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে গোলাগুলি, ক্ষেপণাস্ত্র বা কূটনৈতিক উত্তেজনার সংবাদ নয়। যুদ্ধের অর্থ আরও অনেক বিস্তৃত। এটি বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এবং অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাতও সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এই জায়গাতেই বাংলাদেশের ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। বাংলাদেশ একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে দেশের ডিজেল, অকটেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পরিবহনের খরচ বাড়ে, কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং শিল্প খাতেও উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে বাধ্য। বাংলাদেশের জন্যও এই সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা এবং নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান—এই বিষয়গুলো এখন আর কেবল নীতিগত বিকল্প নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্য শর্ত।

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ হয়তো দ্রুত শেষও হতে পারে। কিন্তু অনিশ্চয়তাই আজকের বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। আর সেই অনিশ্চয়তার সময়ে যারা আগে প্রস্তুতি নেয়, তারাই তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই সরবরাহ শৃঙ্খলা ভেঙে না পড়ে। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন শোধনাগার স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাও সময়ের দাবিতে পরিনত হয়েছে। অন্যদিকে এই সঙ্কট মোকাবেলায়, পেট্রল পাম্প মালিকদের দায়িত্বও কম নয়। সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে জ্বালানি বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ জনগণ হয়রানির শিকার না হন। একই সঙ্গে সরকারের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা এবং ভোক্তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রাখা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।

জ্বালানি তেল সংকট কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সময় এসেছে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণের, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার এবং একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার। অন্যথায়, সাময়িক এই সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের ডেকে আনতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে শুধুমাত্র একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতে হবে। অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধ: জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বহিঃনোঙ্গর ও নদীপথে অভিযান জোরদার করতে হবে।

সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোতে এসি ব্যবহার কমানো এবং দিনের আলো ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতৈ হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অপচয় রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন বা শেয়ারিং ব্যবস্থায় যাতায়াত করা। ডিজেল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য বা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কৃষি ও শিল্প খাতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে হবে, যাতে পণ্যের মূল্য যাতে বৃদ্ধি না পায়। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কর্তৃক অন্তত ৩-৬ মাসের জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সময়ে আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল না কিনে বা “প্যানিক বাইং” (Panic buying) না করে, সচেতনভাবে জ্বালানি ব্যবহার করলে এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

[লেখক : রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনীতিক বিশ্লেষক]

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thedailysarkar@gmail.com

About Author Information

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ইরান যুদ্ধ : জালানি তেল সংকটে বাংলাদেশ

Update Time : ০২:১০:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬

।। এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া।।
“ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ” এমটাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট। য়া বাংলাদেশের জন্য উদেত্বগ ও উৎকন্ঠার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। বর্তমান অবস্থায় ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এখন আর শুধুমাত্র সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি শক্তির পুনর্বিন্যাসের এক তীব্র লড়াইয়ে রূপ নিতে যাচ্ছে বলেই বিশ্লেষকরা ধারনা করছেন। এই যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে তেল, গ্যাস, সরবরাহপথ এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান বিশ্বে তেল আর কেবল একটি পণ্য নয়, এটি পরিণত হয়েছে এক শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে।

বিশ্বের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ মোট ব্যবস্থার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। এই গুরুত্বপূর্ণ পথটিতে চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে সরাসরি ধাক্কা দিচ্ছে। এর ফলে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, আর এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী আরও গভীর ও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান সংকটকে শুরুর দিকে আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন এই উত্তেজনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর।

ইতোমধ্যে মাস শেষ হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ। এর প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘায়িত এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে, আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এই সংকটের প্রভাব থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশও। দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশ তীব্র তেল সংকটের মুখে পড়তে পারে। যা বাংলাদেশকে গভীর সঙ্কটের খাঁদের কিনারায় নিয়ে দাড় করাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের জন্যও ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ হচ্ছে, দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক এই গুরুত্বপূর্ণ রুটের ওপর নির্ভরশীল, যা মুম্বাই থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল হয়ে ইউরোপে পৌঁছায়। বাকি অংশ চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথে পরিচালিত হয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আন্ডারসি কেবল ডিজিটাল যোগাযোগের প্রধান ভিত্তি। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক এসব সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যদিও ইরান সরাসরি এসব কেবল অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দেয়নি, তবে যুদ্ধ প্রভাবিত অঞ্চলে যে কোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এই সাবমেরিন কেবল। ফলে ভারতের ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের বড় অংশই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে, সমুদ্রতলের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা এখন বৈশ্বিক নতুন হুমকি হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স এন্ড ফিনান্সিয়াল এনালাইসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে,  “আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হতে পারে।” ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের সীমিত জ্বালানি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ফিলিং স্টেশন সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ায় বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি খুবই সঙ্কটাপন্ন। সেখানে অল্প পরিমাণ জ্বালানি প্লাস্টিকের বোতলে বেশি দামে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতেও যানবাহনের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের জেরে ভয়ংকর চাপে পড়েছে বৈশ্বিক তেলের বাজার। অপরিশোধিত তেলের দাম এরই মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। তেল সংকটের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় ও অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ। জ্বালানির ব্যবহার কমাতে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহনে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমিয়ে সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। অন্যদিকে সঙ্কটময় এই মুহুর্তে বিকল্প অবস্থান থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাংলাদেশের জন্য অত্যান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। অথচ, রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতে অনুমতি চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের দেওয়া চিঠির এখনো কোন জবাব দেয়নি ওয়াশিংটন।

৩০ মার্চ সচিবালয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র জানান, “রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য ইন্ডিয়াকে একটা স্যাংশন ওয়েভার দিয়েছিল (যুক্তরাষ্ট্র), ঈদের আগের দিন আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সরকারের মিটিংয়ে। মিটিংয়ে ওনাদের বোঝাতে চেষ্টা করা হয়েছে যে, রাশিয়া থেকে যেন আমাদের অন্তত দুই মাসের অথবা ছয় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আনার অনুমতি দেয়, স্যাংশন ওয়েভার দেয়।” রাশিয়া থেকে পরিশোধিত ডিজেলসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনতে বাংলাদেশের বিশেষ ছাড়ের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে এমন আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত সেই আশ্বাস পূরনে কার্যকর কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর পাম্পগুলো বেশ কয়েকদিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে পারছে না। এমন অবস্থায় ডিপো থেকে যতটুকু জ্বালানি আসছে তা নিতে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য গাড়ির চালকরা আগেভাগেই ভিড় করছেন পাম্পে। ছুটি বা কর্মদিবস- কোনো দিনই সেখানে ফাঁকা থাকছে না।

মধ্যপ্রাচ্য বাদেও পেট্রোনাস মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। সামান্য কিছু ডিজেল ও অন্যান্য ফার্নেস অয়েল চীন ও ভারত থেকেও আমদানি করা হয়। আর ওমান, সৌদি আরব এবং বিশেষভাবে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। সম্প্রতি কিছু পরিমাণ এলএনজি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের এফএসআরইউ বা যেসব ফ্লোটিং টার্মিনাল আছে সেগুলো মার্কিন প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে আমরা জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ কিন্তু শ্রীলংকা নয়। বাংলাদেশ বিকাশমান অর্থনীতি দেশ। বাংলাদেশের ট্রেড ভলিউম শ্রীলংকার তুলনায় অনেক বেশি। জনসংখ্যার আধিক্য ও মবিলিটির কারণে অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধিও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই জ্বালানি নিরাপত্তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। এখন বাংলাদেশ কিছুটা হলেও জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অন্তত এ সুবিধা বিবেচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এজন্য বিকল্প বাজারগুলোকে বিবেচনায় আনতে হবে। জ্বালানি, অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে সমন্বিত ভূমিকা রাখতে হবে। এ তিন মন্ত্রণালয় জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করে সিঙ্গাপুর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি ভারতের মতো বাংলাদেশকেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা অব্যাহত রেখে দাবি আদায় করতে হবে।

যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে গোলাগুলি, ক্ষেপণাস্ত্র বা কূটনৈতিক উত্তেজনার সংবাদ নয়। যুদ্ধের অর্থ আরও অনেক বিস্তৃত। এটি বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এবং অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাতও সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এই জায়গাতেই বাংলাদেশের ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। বাংলাদেশ একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে দেশের ডিজেল, অকটেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পরিবহনের খরচ বাড়ে, কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং শিল্প খাতেও উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে বাধ্য। বাংলাদেশের জন্যও এই সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা এবং নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান—এই বিষয়গুলো এখন আর কেবল নীতিগত বিকল্প নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্য শর্ত।

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ হয়তো দ্রুত শেষও হতে পারে। কিন্তু অনিশ্চয়তাই আজকের বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। আর সেই অনিশ্চয়তার সময়ে যারা আগে প্রস্তুতি নেয়, তারাই তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই সরবরাহ শৃঙ্খলা ভেঙে না পড়ে। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন শোধনাগার স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাও সময়ের দাবিতে পরিনত হয়েছে। অন্যদিকে এই সঙ্কট মোকাবেলায়, পেট্রল পাম্প মালিকদের দায়িত্বও কম নয়। সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে জ্বালানি বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ জনগণ হয়রানির শিকার না হন। একই সঙ্গে সরকারের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা এবং ভোক্তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রাখা তাদের নৈতিক দায়িত্ব।

জ্বালানি তেল সংকট কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সময় এসেছে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণের, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার এবং একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার। অন্যথায়, সাময়িক এই সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের ডেকে আনতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে শুধুমাত্র একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতে হবে। অবৈধ মজুতদারি প্রতিরোধ: জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বহিঃনোঙ্গর ও নদীপথে অভিযান জোরদার করতে হবে।

সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোতে এসি ব্যবহার কমানো এবং দিনের আলো ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতৈ হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অপচয় রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন বা শেয়ারিং ব্যবস্থায় যাতায়াত করা। ডিজেল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য বা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কৃষি ও শিল্প খাতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে হবে, যাতে পণ্যের মূল্য যাতে বৃদ্ধি না পায়। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কর্তৃক অন্তত ৩-৬ মাসের জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে। এই সময়ে আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল না কিনে বা “প্যানিক বাইং” (Panic buying) না করে, সচেতনভাবে জ্বালানি ব্যবহার করলে এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

[লেখক : রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনীতিক বিশ্লেষক]