০৪:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
https://sonalishopbd.com/
ভোলার মনপুরার মানুষের জীবন-যাপন প্রণালী পৃথিবীর সকল যুদ্ধের আদি বিজয়ী যোদ্ধাদের মত
ভোলা প্রতিনিধি
- Update Time : ০৩:৪৪:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৯ Time View

মোঃ আবুল কাশেম, জেলা প্রতিনিধি : ভোলা জেলার মূল ভূ-খন্ড হতে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপপূঞ্জাঞ্চলীয় উপজেলার মন জুড়ানো নাম মনপুরা উপজেলা। কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে এই উপজেলা। এই উপজেলা সদরে চাকরির জন্য নিয়োগকৃত ও আদিষ্ট সরকারী কর্মকর্তারা প্রকৃতির বৈরীতার সাথে লড়াই করতে হয় বলে অনেকে মনপুরার পোস্টিং পেয়েও মনপুরা উপজেলা প্রশাসনে হাজির থাকেন না। শুধু চাকরী বাঁচানোর চাতুরীর আশ্রয় নিতে পারলেই কাগজে-পত্রে সেখানে নিয়মিত হাজির আছেন বলে- খোদ রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারাও সার্টিফিকেট প্রদান করে থাকেন। তবে মনপুরায় যিনি নিয়মিত হাজির থাকেন তিনি কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও বিজয়ী যোদ্ধা। যেই কয়জন সরকারী চাকরীজীবী মনপুরায় নিয়মিত সত্যিকারের হাজির থেকে চাকরীর নিয়মিত মেয়াদ সম্পন্ন করেছেন তাঁকে শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী যোদ্ধা বললে ছোট করা হয়। বলতে চাইলে বলতে হবে যে, ফ্রান্স জার্মানির লড়াইয়ে, ইরানের আর্য-মুসলীম লড়াইয়ে কম্বোডিয়ায় ইন্ডিয়ান-কম্বোডিয়ান লড়াইয়ে এমনকি মহিলা অফিসারের ক্ষেত্রে বলতে হবে যে, পার্বতি ও পার্বতির বেআইনী ভূয়া স্বামী বিষ্ঞুর মধ্যকার ঐতিহাসিক বিষ্ঞু-পার্বতি লড়াইয়েও পার্বতির মত বিজয়ী যোদ্ধা। একজন চাকরীজীবীই যদি তার সাড়ে তিন বছরের মেয়াদোত্তীর্ণতার কারনে বৈরী প্রকৃতির সাথে এত এত লড়াইয়ের বিজয়ী যোদ্ধা হয়ে থাকে তবে মনপুরার স্থায়ী বাসিন্দারা যে কত শত প্রকৃতির প্রতিকূলতার লড়াইয়ে বিজয়ী তা বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যায় না। মনপুরার হাজির হাট, রামনেওয়াজ, জনতা বাজার কিংবা চরগোয়ালিয়া গেলেই দেখা যায় ত্রিশ হতে চল্লিশ মিনিটের একটি মোটরসাইকেল ভ্রমনের মাধ্যমেই জানা যায় চরফকিরা বাজারের চালচিত্র। যেই ক’জনকে বাজারে দেখা গেল তাদের দেহের ভাষা থেকে জানা যায় তারা কেউই এই যুগের মানুষ নয়, সকলেই জীবন যোদ্ধা। তবে এই ধরনের জীবন যুদ্ধে কোন দেশের সেনাবাহিনী রিক্রুট করে ঐ তাদেরকে চরফকিরা এলাকায় জীবন যুদ্ধে নামিয়ে দিয়েছে তার কোন হদিস নেই। এক জনকে দেখা হল- সে যেন কার তাগাদায় বাঁশের তৈরি তিন খানা খাঁচা নিয়ে বাজারে যাচ্ছে। আরেকজনকে দেখা গেল- সে যেন সেনাধিনায়কের তাগাদায় তরকারি নিয়ে বাড়ি ফিরছে। আরেক জনকে দেখা গেল- সে যেন বিধাতার ভরসায় কয়েক টালি দধি নিয়ে বিক্রির জন্য বসে আছে। আরেক জনকে দেখা গেল বাজারের দোকানের ঘরে ঘরে গিয়ে সোলার বিদ্যুৎ এর দামের টাকার জন্য জৈজৈ করছে। কিছু লোকজনকে দেখা গেল চায়ের দোকানে বসে পাতালপুরীর মাইথোলজিক্যাল কথাবার্তা বলতে। এমন এমন কথা বলতেছে– ইহ জগতে যেই সকল কথাবার্তার কোন ঠাঁই নাই, ভিত্তি নাই। বাজারে কিছু লোক উত্তর মাথায় বসে এমন এমন গল্প করতেছে তা যেন কল্পপুরীর পৌরানিকতাকেও পিছনে ফেলেছে। এই সকল অদ্ভুত অদ্ভুত কথাবার্তা দিয়ে বাজারে উপস্থিত হওয়ার কারনেই আসলে- ঐ বাজারটি এখনো- বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উত্তরা, ধানমন্ডি, মিরপুর, কালশী, গুলশান এলাকায় লন্ঠন জ্বালিয়ে সন্ধ্যা শুরু করার সময়ের আদলেরই রয়ে গেছে। যা ঐ রকমই থাকবে আরো চার ডজন যুগেরও বেশি। প্রতি হাটবারে ই বাজারে আনুমানিক হাজার পাঁচেক লোক আসা-যাওয়া করে। হাটের দিন ছাড়া প্রতিদিনই বাজারে হাজার দুই কি দেড় হাজার লোক আসা-যাওয়া করে। বাজারে দিনের বাজারে আসাযাওয়া করা লোক জনের মধ্যকার আনুমানিক নব্বই শতাংশ লোক কিছু না কিছু সদাই বাজার থেকে ক্রয় করে। আর হাটের সময়ে বাজারে আসা-যাওয়া করা লোকদের আনুমানিক চল্লিশ শতাংশ লোক কিছু না কিছু বিক্রি করে। আনুমানিক আশি শতাংশ লোক কিছু না কিছু ক্রয় করে বাড়ি ফেরে। আনুমানিক দশ শতাংশ লোক হাটের সময় বাজারে আড্ডা দেয়। আনুমানিক দশ শতাংশ লোক বিনা দরকারে বাজারে আসা-যাওয়া করে। তবে ঐ বাজার কেন্দ্রীক জনগোষ্ঠীরা এক সময় লাঙ্গলের সাহায্যে হালচাষ করত। বিলের মাঝে দলবেঁধে চাষ কাজের শ্রমিকেরা খাবারের সময়ের খাবার খেতে হতো। পালকিতে করে নতুন পুত্র বধুর শ্বশুর বাড়ির প্রথম গমন ঘটাত। সূর্য ডোবার সাথে সাথে অনেক দূরে দূরে অবস্থিত বিলের মাঝের বাড়ির ঘরে ঘরে কেরোসিন তৈল ভেজানো সলতে পুড়ে আলোকিত করার কপি জলে উঠত। চাঁদোয়া রাতে আকাশে মেঘ না থাকলে এক চাঁদের আলোতে পুরো মনপুরার শীতের কুয়াশামাখা রাত্র দেখা যেত। শীতের কুয়াশামাখা রাতে হাঁটার সময় নিজের কাছে নিজেকে ছাড়া আর কিছুই দেখা যেত না। সেই শীতের মনপুরা এখন আর নাই। চাঁদোয়া মনপুরা এখন আর নাই। ঘন বসতি আর সোলার প্যানেলের আলো এখন মনপুরার ঘরে ঘরে। পালকিতে করে বউ আসা-যাওয়া করা দূরের কথা- বউয়েরা পারেনা যেন কামারের দোকানের ধারালো পন্য হাতে করে নিয়ে এসে শ্বাশুড়িকে তাক্ করে বলে ওঠে আপনার ছেলে আমাকে বিয়ে করার কথা বলে তিন মাস হয়েছে আমাদের বাড়িতে যায় না। তাই আমি তালাক পাওয়ার ভয়ে নিজেই ছুটে এসেছি। অর্থাৎ, বিয়ের আগেই বউ। পালকি-টালকির কোন দরকার নাই। দুই পক্ষের আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কিছু বিয়ে শাদী হয়ে থাকলেও সেইগুলোর বউ পাকা রাস্তার কারনে বোরাক, মাইক্রো, টেম্পু, ব্যাটারী চালিত রিকশা কিংবা স্বামীর মোটর সাইকেলের পিছনে বসে ড্রাইভার স্বামীর কোমড় ধরেই আসা-যাওয়া চলতে দেখা গেছে। তবে মনপুরায় মানুষের জীবন-যাপন প্রণালী হলো প্রকৃতির বৈরীতার সাথে লড়াই নির্ভর যা পৃথিবীর সকল যুদ্ধের প্রতিকূলতাকে পরাজয় মানানো বিজয়ীর মত। তবে– যে মনপুরার জীবন যুদ্ধ জানেনা, তার কপালে আছে সাগর শুকিয়ে যাওয়ার মত জীবন থেমে যাওয়ার কাহিনী। ছবিতে- মনপুরার আদি জীবন প্রণালী, বর্তমান হাট-বাজারের অলস বেচাকেনা, অজ্ঞ লোকের জীবন থেমে যাওয়ার মত বালুচরে শুকিয়ে যাওয়া জাহাজ।
Tag :

























