https://www.facebook.com/obaidul1991
প্রসঙ্গ-অধিকার ও চাহিদা —– মেশারফ হোসেন
- Update Time : ০২:০৯:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৩০ Time View

অন্ন,বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও জানমালের নিরাপত্তা জনগনের মৌলিক অধিকার |
বাংলাদেশের সংবিধানে এগুলোকে সরাসরি 'মৌলিক অধিকার' না বলে 'রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি' বা
মৌলিক চাহিদা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্ন,বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও জানমালের
নিরাপত্তা জনগনের মৌলিক অধিকার যদি হয়ে থাকে তাহলে আইন মন্ত্রী না বলার কারন কি?
আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পেছনের মূল কারণ হলো বাংলাদেশ সংবিধানের আইনি ও কাঠামোগত
ব্যাখ্যা। সাধারণ অর্থে আমরা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকার
হিসেবে জানলেও, বাংলাদেশের সংবিধানে এগুলোকে সরাসরি 'মৌলিক অধিকার' না বলে 'রাষ্ট্র
পরিচালনার মূলনীতি' বা মৌলিক চাহিদা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইনি এবং সাধারণ দৃষ্টিকোণ
থেকে অধিকার এবং চাহিদা র মধ্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ও মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। চাহিদা গুলো
মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তা, আর অধিকার হলো সেই প্রয়োজনীয়তা পূরণের আইনি নিশ্চয়তা।
আমার বেঁচে থাকার জন্য একটি বাসস্থান বা ঘরের প্রয়োজন। এটি আমার চাহিদা।
Sonali Shop – online shop in Bangladesh
সরকার যদি আমাকে ঘর দিতে না পারে, আমি সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারব না। আমার নিজের একটি ঘর
বা জায়গা আছে, আর রাষ্ট্র বা প্রভাবশালী কেউ বেআইনিভাবে এসে আমাকে সেখান থেকে উচ্ছেদ
করে দিল। তখন আমার 'সম্পত্তির অধিকার' বা 'আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার' ক্ষুণ্ন হলো। এই
অধিকার রক্ষায় আমি সরাসরি আদালতে গিয়ে মামলা করতে পারব। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে
বেঁচে থাকার জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষা অবশ্যই মানুষের মৌলিক অধিকার। তবে একজন
আইনজীবীর বা আইনমন্ত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে সংবিধানের কঠোর আইনি সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে
এগুলোকে সরাসরি 'মৌলিক অধিকার' বলার সুযোগ নেই, কারণ এগুলোর পেছনে সরাসরি আদালতের
আইনি বাধ্যবাধকতা বা বলবৎযোগ্যতা কাজ করে না। আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম
বাড়ার পেছনে বাজার সিন্ডিকেট, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি প্রধান
কারণ হিসেবে কাজ করছে। এটি একটি বহুস্তরীয় সমস্যা, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন
করে তুলেছে। আমাদেরদেশ কি সেন্ডিকেটের জন্য নাকি মানুষের জন্য? দেশ অবশ্যই এদেশের সাধারণ
মানুষের জন্য, কোনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের জন্য নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের
সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ, কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট নয়। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ
মানুষের এই অধিকার ও প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে যখন গুটিকয়েক অসাধু ব্যবসায়ী জিম্মি করে
ফেলে, তখন মনে এই প্রশ্ন আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক। আমাদের দেশের মূল ভিত্তি
হলো জনগণের কল্যাণ। সংবিধানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা
পূরণের অঙ্গীকার রয়েছে। কিন্তু যখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চাল, ডাল বা তেলের দাম
বাড়ানো হয়, তখন মানুষের সেই মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। সিন্ডিকেট মূলত আইনের ফাঁকফোকর
এবং তদারকির অভাবকে কাজে লাগিয়ে গরীব মানুষের পকেট কাটে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে বড় বড়
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের
হতাশা তৈরি হয়। বড় ব্যবসায়ীদের হাতে বিশাল পুঁজি ও ক্ষমতা থাকায় তারা পুরো সরবরাহ চেইন
নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে অনেক সময় প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে হুট করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে

দ্বিধায় ভোগে, পাছে তারা পণ্য সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। যেহেতু আমরা একটি গণতান্ত্রিক
প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছি, তাই রাষ্ট্রকে মানুষের করে তোলার দায়িত্ব সরকার এবং জনগণ উভয়েরই|
দেশের মানুষ ভালো থাকলে তবেই রাষ্ট্র স্থিতিশীল থাকে। তাই সরকারকে কোনো রাজনৈতিক বা
ব্যবসায়িক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি দেখাতে হবে। যখন
সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ করে, কিংবা অযৌক্তিক
মূল্যের পণ্য বর্জন করে-তখন সিন্ডিকেট পিছু হটতে বাধ্য হয়। জনগণের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের
চেয়ে বড় কোনো শক্তি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নেই। বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে
মূল্যবৃদ্ধি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যা একাধিক অর্থনৈতিক, পরিবহন, বাজারব্যবস্থা ও নীতিগত
কারণে সৃষ্ট। সিন্ডিকেট কোনো দৃশ্যমান অপরাধ নয়; এটি ব্যবসায়ীদের একটি গোপন ও অলিখিত
সমঝোতা । বড় বড় ব্যবসায়ীরা কোনো লিখিত চুক্তি ছাড়াই শুধু মোবাইল ফোন বা মৌখিক বার্তার
মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে দেয় বা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এরপর আদালতে অপরাধ
প্রমাণ করতে হলে সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণের প্রয়োজন হয়। এই শক্তিশালী গোপনীয়তার কারণে
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন বা তদন্তকারী সংস্থাগুলো অনেক সময় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে
অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে না সিন্ডিকেটের শিকড় শুধু বড় করপোরেটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ
নয়, এটি স্থানীয় রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্তরেও বিস্তৃত। পণ্য যখন কৃষকের মাঠ থেকে ট্রাকে
করে শহরের বড় বড় আড়তে আসে, তখন পথে পথে ঘাটে ঘাটে বিভিন্ন অসাধু চক্র ও স্থানীয়
প্রভাবশালীরা অবৈধ টোল বা চাঁদা আদায় করে। এরপর আমাদের বিচার ব্যবস্থায় লাখ লাখ মামলার
জট রয়েছে। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, যার কারণে
তাৎক্ষণিক কোনো দৃষ্টান্তমূলক বিচার দৃশ্যমান হয় না।
এসব থেকে আমরা পরিত্রান কিভাবে পাব? সিন্ডিকেটের এই শক্তিশালী জাল এবং কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি থেকে দীর্ঘমেয়াদে পরিত্রাণ পেতে হলে
সরকার, প্রশাসন এবং দেশের সাধারণ মানুষ এই তিন পক্ষকেই সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
কোনো একটি পক্ষের একক চেষ্টায় এই সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়, সাধারণ
মানুষের পকেট যখন খালি হয়, তখন সরকারের এই জটিল অজুহাতগুলো কোনো কাজে আসে না এবং
একে ব্যর্থতাই মনে হয়। তবে এটি এমন এক ব্যর্থতা যা শুধু "ইচ্ছার অভাব" নয়, বরং পুরোনো
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আইনি সীমাবদ্ধতা এবং মুক্তবাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের একটি
সম্মিলিত ফল। এই বৃত্ত থেকে বের হতে না পারলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য সব সময়ই
একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। আশা করি যথাযথ কতৃপক্ষ বিষয়টি ভেবে দেখবেন।
























