https://www.facebook.com/obaidul1991
স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং বাঙালি মুসলিমের স্বপ্ন পূরণের সামর্থ্য
- Update Time : ০৩:২১:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
- / ৩৬ Time View

ফিরোজ মাহবুব কামাল
স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণের সামর্থ্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের থাকেনা
অতি সহজ হলো স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা। পথের পঙ্গু ভিখারীও সে স্বপ্ন দেখতে পারে। কারণ স্বপ্ন দেখায় কোন খরচ নাই, কোন পরিশ্রমও নাই। কিন্তু মানব জীবনে সবচেয়ে ব্যয়বহুল হলো স্বাধীনতা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচা। কারণ সেরূপ বাঁচায় বিপুল অর্থ, শ্রম, মেধা ও রক্তের ব্যয় আছে। দাস রূপে বাঁচায় সে খরচ নাই, কারণ দাসকে বাঁচিয়ে রাখার দায় দাস -মালিক নিজেই বহন করে। কারণ অনাহারে দাস মারা গেলে সেবা দেয়ার কেউ থাকে। কিন্তু স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচার খরচটি এতোই বিশাল যে, ক্ষুদ্র দেশগুলির সে সমার্থ্য থাকে না। তাই সে দেশগুলিকে আগ্রাসী দেশের সামনে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়ার জনগণের ন্যায় নিদারুন অপমান, হত্যা, ধ্বংস ও গোলামী নিয়ে বাঁচতে হয়। বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে অধিক। কিন্তু ঐ দেশ দুটির তুলনায় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচার সামর্থ্য বাংলাদেশের অতি নগন্য। কারণ ভারত ও পাকিস্তানের রয়েছে পারমানবিক অস্ত্র ও বিশাল সেনাবাহিনী। ভৌগলিক আয়োতনে দেশ দুটি বাংলাদেশের চেয়ে কয়েকগুণ বড়। তাছাড়া দেশ দুটির কাছে গুরুত্ব পেয়েছে শক্তি, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচা, স্রেফ রুজি-রোজগার ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি নয়।
স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ই্জ্জত নিয়ে বাঁচার রোডম্যাপটি অতি সরল। সেজন্য জরুরি হলো বৃহৎ ভূগোল, বিশাল লোকবল, সামরিক বল ও শক্তিশালী অর্থনীতি। গুরুত্বটি জনগণের একতার ও ভৌগলিক অখণ্ডতার। স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে তাই ভৌগলিক ও রাজনৈতিক বিভক্তি থেকে বাঁচতে হয়। মহান রব চান, তাঁর ঈমানদার বান্দাগন বাঁচুক স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে। তাই তিনি রাজনৈতিক একতা ও ভৌগলিক অখণ্ডতাকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন। এটিই হলো ইসলামের মূল নীতি। এ মূল নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে কাফির হতে হয়। দেশের ভৌগলিক আয়োতন ছোট হলে এবং সামিরক বাহিনী ক্ষুদ্র হলে স্বাধীনতা বাঁচে না। সিকিমের স্বাধীনতা তাই বাঁচেনি। স্বাধীনতা বাঁচাতে হলে শুধু অংক, বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিদ্যা ও সাহিত্যের পাঠ নিলে চলে না, ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ পাঠ থেকে অবশ্যই শিক্ষা নিতে হয়। ১৯৪৭’য়ে পূর্ব বাংলার বুকে এতো স্কুল কলেজ ছিল না। ফলে এতো ডিগ্রিধারী বুদ্ধিজীবীও ছিল না। কিন্তু ১৯৭১’য়ের তুলনায় ১৯৪৭’য়ে বাঙালি মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও জনগণ উত্তম প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। কারণ, তারা শিক্ষা নিয়েছিলেন ইতিহাস থেকে। তাই তারা পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন বাংলাদেশ না বানিয়ে পাকিস্তানভূক্ত করেছিলেন। তাদের সে সিদ্ধান্তে সেদিন বাঙালি মুসলিমের স্বাধীনতা বেঁচেছিল। সে সাথে তারা বিশাল সওয়াব কামিয়েছিলেন মুসলিমদের মাঝে বিভক্তির বদলে একতা গড়ে। এভাবে পালন করেছিলেন মহান রব’য়ের হুকুম।
ইসলামের কেন্দ্রভূমি আরব ভূখণ্ড বিশাল উসমানিয়া খেলাফতের মাঝে অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেই বহুশত বছর যাবত ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী হায়েনাদের আগ্রাসন থেকে নিরাপত্তা পেয়েছিল। ঔপনিবেশিক ইউরোপীয়গণ তাদের সাম্রাজ্য বাড়াতে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বাংলা, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে আসলেও দীর্ঘকাল যাবত অতি কাছের কোন আরব ভূমিকে দখলে নিতে পারিনি। সে সুযোগ আসে উসমানিয়া খেলাফত ভেঙে যাওয়াতে বা দুর্বল হওয়াতে। তখন আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশর, ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়ার ন্যায় আরব ভূমি সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয়দের দ্বারা অধিকৃত হয়। মিশর ব্রিটিশের হাতে অধিকৃত হয় ১৯১৪ সালে। কারণ, ১৮৪১ সালে মিশরের প্রাদেশিক শাসক মহম্মদ আলী পাশার আমলে উসমানিয়া খেলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং সামর্থ্য হারিয়েছিল মিশরের স্বাধীনতা বাঁচাতে। তেমনি বাংলা ব্রিটিশের পদানত হয়েছে মোগল সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্নতার পর। কারণ প্রাদেশিক শাসক সুবেদার আলীবর্দি খান সুবে বাংলাকে মোগল সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে। তখন বিহার ও উড়িষ্যা বাংলা প্রদেশের অংশ ছিল। তখন বাংলা ছিল মোগল সাম্রজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সুবা বা প্রদেশ। মোগল সম্রাট তার রাজস্ব আয়ের সব চেয়ে বড় অংশটি পেতেন সুবে বাংলা থেকে। সুবে বাংলা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় মোগল সাম্রাজ্য দারুন ভাবে দুর্বল হয়েছে এবং সক্ষমতা হারায় শক্তিশালী সামরিক বাহিনীয় গড়ে তুলতে। ফলে সাম্রাজ্য ভেঙে পরে। বিচ্ছন্ন হওয়াতে দুর্বল হয়েছে বাংলাও এবং নবাব সিরাজুদ্দৌলার সেনাবাহিনী পরাজিত হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ব্রিটিশ সৈন্যের হাতে। মোগল সাম্রাজ্যের অংশ রূপে থাকলে কি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী হামলা করার সাহস পেত? বিভক্তি ও বিচ্ছন্নতা এভাবে বিপদ ডেকে আনে। এজন্যই বিভক্তি ইসলামে হারাম। এ হারাম পথটি মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত শাস্তি ডেকে আনে -যার ঘোষণা এসেছে পবিত্র কুর’আনে।
পাকিস্তান কেন নির্মিত হলো এবং কেন ভেঙে গেলো?
মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা বাঁচানোর স্বার্থেই খেলাফত বাঁচানোর গুরুত্ব ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমগণ গভীর ভারে বুঝেছিলেন। তাই তাঁরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের হামলা থেকে খেলাফত বাঁচাতে ভারত জুড়ে তুমুল গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সেটিই ছিল ভারতের বুকে প্রথম গণআন্দোলন। ইতিহাসে সেটি খেলাফত আন্দোলন রূপে পরিচিত। খেলাফত আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার গভীর বেদনা নিয়ে ভারতীয় মুসলিমগণ স্বপ্ন দেখেছিল দক্ষিণ এশিয়ার বুকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র নির্মাণের। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠির বাস এই দক্ষিণ এশিয়াতেই। ফলে তাদের সে ভাবনা যুক্তিযুক্ত ছিল। তারা উদ্যোগ নেন খেলাফতের বিকল্প রূপে মুসলিম সভ্যতা ও ভূ-রাজনৈতিক আকাঙ্খার পরিচয়বাহী একর্টি civilisational state নির্মাণের। সেটিই ছিল ১৯৪৭’য়ে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান। মুসলিমদের কাছে civilisational state’য়ের অর্থ হলো, সে রাষ্ট্রের এজেন্ডা শুধু বিশেষ কোন ভাষা, বর্ণ ও ভূগোলের মুসলিমদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও স্বার্থের সুরক্ষা দেয়া নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও স্বার্থের সুরক্ষা নিয়ে সচেষ্ট হওয়া। পাকিস্তানের মিশন হবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহর এজেন্ডার সাথে একাত্মতা। সে সময় মুসলিম লীগের স্লোগান ছিল: “পাকিস্তান কা মতলব কিয়া? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। আর মিশন যেখানে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, তখন সে মিশনের ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক কোন সীমানা থাকে না।
স্মরণীয় বিষয় হলো, পাকিস্তান আন্দোলনের প্রথম সারির বাঙালি মুসলিম নেতাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, সততা এবং বাংলার মুসলিমদের নিয়ে তাদের কল্যাণ চিন্তা শেখ মুজিব, তাজুদ্দীন, জিয়াউর রহমান ও সিরাজুল আলম খানদের চেয়ে বহুগুণ অধিক ছিল। খাজা নাজিমুদ্দীন লেখাপড়া করেছেন ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লেখাপড়া করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে; তার পিতা ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি। মৌলভী তমিজুদ্দীন খান লেখাপড়া করেছেন কলকাতার প্রসিডেন্সি কলেজে। নূরল আমীন লেখাপড়া করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরূপ শিক্ষাগত যোগ্যতা একাত্তরের কোন শীর্ষ নেতারই ছিল না। তাছাড়া পাকিস্তানপন্থী এসব নেতাদের কেউই মুজিবের ন্যায় গণতন্ত্রের শত্রু ছিলেন না। তাদের কেউ মুজিবের ন্যায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট কোন চাকর ছিলেন না এবং ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীদের সাথে নিয়ে তারা কখনোই কোন ষড়যন্ত্র করেননি -যেমনটি করেছে শেখ মুজিব। ১৯৪৭’য়ে স্বাধীনতার পাওয়ার পরই ভারত পরিকল্পনা নেয় পাকিস্তান ভাঙায় এবং দেশটিকে অধীনত করায়। ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতাগণ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা যেমন চায়নি, তেমনি দেশটি বেঁচে থাকুক -সেটিও চায়নি। মুজিব ভারতীয় সে প্রজেক্টের অংশীদার হয়।
শেখ মুজিবের ছিল যে কোন উপায়ে গদিতে বসার অদম্য লিপ্সা। পাকিস্তান আন্দোলন কালে মুজিব মুসলিম লীগের কর্মী হলেও তার মগজে মুসলিম উম্মাহর civilisational state’য়ের ভিশন ও মিশন স্থান পায়নি। মুজিব কলকাতায় শিক্ষাকালে কাজ করেছে ছাত্র রাজনীতির লাঠিয়াল রূপে। তার রাজনীতি পরিচালিত হতো স্বার্থলিপ্সা থেকে -যা পরবর্তী কালে তার শাসনামলে সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পায়। স্বার্থলিপ্সাই মুজিবকে ষাটের দশকে ভারতীয় এজেন্ডার সাথে একাকার করে ফেলে। ক্ষমতার লিপ্সা পূরণে মুজিব গণতন্ত্রকে কবরে পাঠায় এবং একদলীয় বাকশালের প্রতিষ্ঠা দেয়। মুজিব শুরু থেকেই জানতেন, ভারতের পাকিস্তান ভাঙার এজেন্ডা। ফলে তিনি জানতেন, ভারতের কাছে তার নিজের বাজার দর। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা মুজিবকে লুফে নেয়; এবং ভারতের এজেন্ডাপূরণে মুজিব ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW’য়ের ষড়যন্ত্রের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। ইতিহাসে সেটিই আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে পরিচিত।
কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য এবং বিশিষ্ট লেখক বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, তাজুদ্দীন ছিলেন কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য। পাকিস্তান আমলে কম্যুনিস্টদের নানা দলে ঢুকানো হয়েছিল পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্প বিজয়ী করার লক্ষ্যে। সে পরিকল্পনার অংশ রূপেই তাজুদ্দীনকে ঢুকানো হয়েছিল আওয়ামী লীগে। তাই যারা বলে, একাত্তরের যুদ্ধের কারণ, ১৯৭০য়ের নির্বাচনের পর মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা – তারা সঠিক বলে না। এরূপ একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্রের নীল নকশার মাঝে। সে যুদ্ধই চুড়ান্ত রূপ পায় ১৯৭১’য়ে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ১৯৭০’য়ের নির্বাচনের পর শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হলে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বেঁচে যেত, মুজিব তাই পরিকল্পনা করে এবং ষড়যন্ত্র করে সেটি হতে দেয়নি।
পাকিস্তান থেকে ফেরার পর ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের জনসভায় শেখ মুজিব বলেন, পাকিস্তান ভাঙার প্রকল্পটির শুরু ১৯৪৭ সালে দেশটির জন্ম থেকেই। অত্র বইয়ের লেখক তাঁর সে উক্তি সেদিন নিজ কানে শুনেছেন। সেটি ছিল চরম বিস্ময়ের বিষয়। কারণ, ১৯৭০ নির্বাচনে মুজিব ভোট নিয়েছিলেন অখণ্ড পাকিস্তানের ৬ দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র নির্মাণের লক্ষ্যে। তিনি যে পাকিস্তান ভাঙাতে চান -সে কথাটি পাকিস্তান ভাঙার আগে একবারও বলেননি। বরং নির্বাচনি জনসভাগুলিতে “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগান দিতেন। এটি ছিল বাঙালি মুসলিমদের সাথে মুজিবের মিথ্যাচারীতা ও প্রতারণার রাজনীতি। মুজিবের মনের গোপন কথাটি জানালে জনগণ কি তাকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী করতো? পরিতাপের বিষয় হলো, ১৯৪৬ সালে জনগণের রায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তা






















