১০:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬
https://www.facebook.com/obaidul1991

ভারত-বাংলাদেশের স্বার্থেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেয়া প্রয়োজন

মতামত
  • Update Time : ০২:৩৪:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
  • / ২৯ Time View

।। এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া।। ১৬ মে, ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ফারাক্কা বাঁধের ফলে নদীর নাব্যতা ধ্বংস করে নেওয়ার আশঙ্কায় ও পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে সারাদেশের লাখ লাখ মানুষ রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান থেকে মরণবাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চে অংশ নেন ও লংমার্চ শেষে কানসাট হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সেদিন থেকেই ১৬ মে ফারাক্কা লংমার্চ দিবস হিসাবে নামে পরিচিতি লাভ করে বাংলাদেশসহ আর্ন্তজাতিক বিশ্বে। বাংলাদেশসহ এতদঅঞ্চলের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জনদুর্ভোগের জন্য মওলানা ভাসানী ওইদিন লং মার্চ করে ভারত সরকারের কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এই লংমার্চের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন বাংলার মাটি ও মানুষের মহান নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তাই এ দিনটি আজো শোষণ, বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং দাবি আদায়ের পক্ষে বঞ্চিতদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

যে ফারাক্কা বাংলাদেশকে পানি বঞ্চিত করার জন্য ভারত তৈরী করেছিল সেই ফারাক্কাই আজ খোদ ভারতের জন্যও অভিশাপে রুপান্তরিত হয়েছে। খোদ ভারতেই এখন ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে আলোচনা চলছে। বিষয়টা অবাক করার মতো হলেও শতভাগ সত্য। বিহারের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ২০১৬ সালের গত ২৩ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফারাক্কা বাঁধ স্থায়ীভাবে ভেঙে দেয়ার দাবি এবং তখনই ফারাক্কা বাঁধের সব গেইট খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন । তিনি বিহারের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ফারাক্কা বাঁধকে দায়ী করেন। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার তখনই ফারাক্কা বাঁধের অধিকাংশ গেইট খুলে দিয়েছিল। মোট ১০৪টি গেইটের মধ্যে ৯৫টি গেইটই খুলে দিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। নীতিশ কুমারের ফারাক্কা বাঁধ স্থায়ীভাবে ভেঙে দেয়া এবং ফারাক্কা বাঁধের সব গেইট খুলে দেয়ার দাবি মুহূর্তেই গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। সেই সংবাদ বাংলাদেশের জনগণের মুখে মুখে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। বিহার প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ফারাক্কা বাঁধের ব্যাপারে সম্প্রতি যে সত্য উচ্চারণ করেছেন, ৫০ বছর আগে তার হুঁশিয়ারি করেছিলেন এক বাঙালি নদী-প্রকৌশলী। সেই ১৯৬২ সালেই পশ্চিমবাংলায় সেচ ও জলপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্য ফারাক্কার তিনটি অভিশাপের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি লিখেছিলেন, ‘ফারাক্কা ব্যারাজের বিরুদ্ধে আমার হুঁশিয়ারি না মানার পরিণতিতে জনগণ দুর্ভোগের শিকার হবে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, এই বাঁধ নদীর পলি-ভরাট হওয়া আরও বাড়াবে, ভাটির দেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পানিপ্রবাহ কমাবে এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ আর বিহারের বেশ কটি জেলায় বন্যার প্রকোপ বাড়াবে।’ তাঁর সেই হুঁশিয়ারিই যে ফলে গেছে, তা আজ ৫০ বছর পর সর্বজনবিদিত। সে সময় ফারাক্কার বিরোধিতার জন্য ভারতীয় গণমাধ্যম তাঁকে পাকিস্তানের চর বলে অভিহিত এবং পরিণামে সরকারি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন এই নদীবিশেষজ্ঞ। আমৃত্যু তিনি তাঁর বক্তব্যে অটল থেকেছেন এবং নিজের ভবিষ্যদ্বাণী নিজেই ঘটে যেতে দেখেছেন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ দীর্ঘদিন থেকে ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণকে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর বললেও, অপর অংশ এই অভিযোগকে কখনই গুরুত্ব দেয়নি। বরং ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতাকে ভারত বিরোধিতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেয়ার দাবি জানায় তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারো বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবীর প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশকে পানিশূন্য করতে ভারত কর্তৃক একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কুটকৌশলের অংশ হিসাবেই বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কি.মি. দূরে ভারতের মনোহরপুরে নির্মিত হয় ফারাক্কা বাঁধ। ১৯৬১ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। বাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ করে ১৯৭০ সালে। তখন পরীক্ষামূলক ভাবে ভারত কিছু কিছু পানি ছাড়ে তারা। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির মাধ্যমে ফারাক্কার বাঁধ চালু হয়। ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ১৯৭৬ থেকে একতরফাভাবে পানি তার নিজ দেশের অভ্যন্তরে ফিডার ক্যানেল দিয়ে প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে। ফলে ১৯৭৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত চাহিদানুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিতই হচ্ছে বাংলাদেশ। অথচ ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে, শীতকালের শুষ্ক মৌসুমেও পদ্মা নদী থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানি পেত বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকার ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি ইস্যু নিয়ে ৩০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে। মোটাদাগে এ যুক্তি বাংলাদেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়! কিন্তু তিন মাসের মধ্যেই সে চুক্তি ভারত অকার্যকর করে দেয়। ১৯৯৭ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক পানি পায়, যা ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর সর্বনিন্ম প্রবাহ ছিল। অথচ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পানি পাওয়ার কথা ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক। ১৯৭৭ সালের পানি চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, কিন্তু এ চুক্তিতে তা না থাকায় ভারত বাংলাদেশকে তার ন্যায্য হিস্যা দিতে বাধ্য ছিল না।

ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা, মহানন্দাসহ দেশের বড় বড় সব নদী নাব্যতা হারিয়ে ফেলে হয়ে পড়েছে পানিশূন্য বালির চরাঞ্চল। ফারাক্কা ব্যারাজের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মাসহ অন্য তিন নদী মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা শুকিয়ে যাচ্ছে। পানি না থাকায় পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। পানি বিশ্লেষকগণ বলেছেন, উজানে একাধিক বাঁধ দিয়ে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় ফারাক্কা পয়েন্টেই পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চল মরুভ‚মি হয়ে যেতে পারে। যার নজির ইতোমধ্যে দেখা শুরু হয়ে গেছে।

কলকাতা বন্দর ছিল, ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে বড় বন্দর। হুগলি নদী থেকে বয়ে আসা বিপুল পরিমাণ পলি বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। নাব্যতা বজায় রাখতে গঙ্গা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করে বিকল্প খাল দিয়ে গঙ্গার পানিকে হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা শুরু হয়। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর হতেই উজান এবং ভাটিতে অবস্থিত অঞ্চলে পরিবেশ গত বিপর্যয় শুরু হয়। এই বাঁধের উজানে বিস্তীর্ণ এলাকায় পলি জমার কারণে প্রতি বছর বন্যা হয় আর ভাটির অঞ্চলে পানির অভাবে খরা দেখা দেয়। পশ্চিম বঙ্গের মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় ব্যাপক নদীভাঙ্গন হয় এবং বিশাল জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিহার প্রদেশে প্রতি বছরই ব্যাপক বন্যা হয়। বছরের পর বছর ধরেই এ অবস্থা চলে আসছে। আর ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পানির অভাবে পরিবেশ গত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। শুস্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি নিয়ন্ত্রণ করার কারণে পদ্মা নদীর বুকে চর আর চর জেগে ওঠে। অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেবার কারণে সেই পানিতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা হয়।

আজ প্রমানিত হয়েছে যে, ফারাক্কা বাঁধ ভারত এবং বাংলাদেশ কারো জন্যই লাভজনক নয়। ফারাক্কা বাঁধের কারণে এতদাঞ্চল এতদিন কেবলমাত্র ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। এই বাঁধের কারণে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি ভারতও ক্ষতি থেকে মুক্তি পায় নাই। আর দীর্ঘদিন যাবত যারা ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করেছিল আজ তাদের দাবিই সত্য হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতাকে যারা ভারত বিরোধিতা বলে অভিহিত করেছিল, তাদের সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আজ ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করার জন্য আর শুধুমাত্র বাংলাদেশের জনগণের প্রয়োজন নেই। আর ফারাক্কা বাঁধের পক্ষে কথা বলার মতো কোন যুক্তিই এর স্বপক্ষের লোকদের জানা আছে বলে মনে হয় না। সুতরাং এখন উচিত ভারত বাংলাদেশের যৌথ কল্যাণের স্বার্থে ফারাক্কা বাঁধকে স্থায়ীভাবে ভেঙে ফেলা। এটাই বাস্তবতা এবং এতেই উভয় দেশের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

ইতিমধ্যে ভারতেও ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে জনমত ক্রমান্বয়ে জোরালো হচ্ছে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ছাড়াও মেধা পাটকরের মতো অ্যাক্টিভিস্ট ও অনেক বিশেষজ্ঞও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেছেন, ভারতেও ফারাক্কা এখন সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি ঘটাচ্ছে, কাজেই এটি অবিলম্বে ‘ডিকমিশন’ করা দরকার। তাছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞই মানেন কলকাতা বন্দরকেও সেভাবে বাঁচাতে পারেনি ফারাক্কা– যে কারণে উপকূলের কাছে তৈরি করতে হয়েছিল আর একটি স্যাটেলাইট বন্দর হলদিয়া। ফারাক্কার জন্যই পদ্মার দু’কূলে মানুষের জীবন-জীবিকা আজ বিপন্ন বলে যেমন বাংলাদেশের অভিযোগ– তেমনি ভারতেও কিন্তু ফারাক্কার সমালোচনা কম নয়। আজ ৫০ বছর পরে এসে ফারাক্কার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারত ঠিক কী ভাবছে? ফারাক্কার প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে ভারতেও অনেক বিশেষজ্ঞ সন্দিহান ছিলেন। তবে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানোর যুক্তিটা এতটাই প্রবল ছিল যে সেই সব আপত্তি বিশেষ ধোপে টেঁকেনি। ফারাক্কার উজানে ঝাড়খন্ড-বিহারের সীমান্ত এলাকায়ও আমজনতার এই বাঁধকে নিয়ে বিস্তর অভিযোগ- বর্ষাতে যেমন, তেমনি শুকনা মৌসুমেও!

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায় ফারাক্কা অঞ্চলে বাঁধের প্রভাব নিয়ে ফিল্ড স্টাডি ও গবেষণা করেছেন– এ ব্যাপারে তারও মিশ্র অভিজ্ঞতা। এ বিষয়ে তিনি বিবিসিকে বলছেন, ‌’ফারাক্কায় নদীর বুকেও চর পড়েছে, মাঝনদীতে বক দাঁড়িয়ে আছে এটাও যেমন দেখেছি – তেমনি গঙ্গার বিধ্বংসী ভাঙনে পারের মানুষের জীবন ছারখার হয়ে যেতেও দেখেছি।’ সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘এই নদীর যে প্যাটার্নের চেঞ্জটা, ইটসেল্ফ নদীটার মধ্যে, তার দুই পারে সবটারই ওপরে একটা ইমপ্যাক্ট ফেলেছে ফারাক্কা ব্যারাজ। ডেফিনিটলি। তার পজিটিভগুলো আমরা পেয়েছি, নেগেটিভগুলোও আমরা দেখতে পাচ্ছি।’ ফারাক্কাতে তার শেষ ফিল্ড স্টাডিতে স্থানীয় গ্রামবাসীরা ফারাক্কা বাঁধকে তুলনা করেছিলেন একটা সাপের মাথা চেপে ধরার সঙ্গে! ফারাক্কার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আবার জানাচ্ছেন, নদীর ভাঙন ঠেকাতে না-পারলে ফারাক্কা অচিরেই তাদের জন্য চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে!

ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পাঁচ দশক পর আজ যখন ভারতেরই একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ফারাক্কা বাঁধকে অকল্যাণকর আখ্যায়িত করে এর গেইটসমূহ খুলে দেয়ার দাবি জানায় এবং সেই দাবির সাথে একমত হয়ে ভারত সরকার যখন সাথে সাথেই ফারাক্কা বাঁধের গেইটসমূহ খুলে দেয়, তখন স্রষ্টার সৃষ্ট গঙ্গা নদীতে মানুষের সৃষ্ট বাঁধ যে ক্ষতিকর তা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়। সুতরাং স্রষ্টার সৃষ্ট এই পৃথিবীর নদ-নদীসমূহকে স্বাভাবিক ভাবে প্রবাহিত হতে দিতে হবে। আর ভারত বাংলাদেশের কল্যাণের স্বাথেই ফারাক্কা বাঁধকে চিরতরে ভেঙে দিতে হবে এবং অন্য নদীর ওপর নতুন কোন বাঁধ নির্মাণ হতে বিরত থাকতে হবে। কারণ নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ সাগরে মিলনের মধ্যেই কল্যাণ, অন্য কোথাও নয়। আর সে জন্য মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর মতো একজন সিংহপুরুষের আজ বড়ই প্রয়োজন। অশীতিপর এ মানুষটি ভগ্নশরীর নিয়ে জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে জাতিকে এক কাতারে সমবেত করতে ডাক দিয়েছিলেন। তার সে ডাকে লাখ লাখ মানুষ সাড়া দিয়ে আগ্রাসী শক্তির ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

( লেখক : রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক )

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

thedailysarkar

দৈনিক সরকার পত্রিকা ১৯৯১ সাল হতে ঢাকা হতে প্রকাশিত হচ্ছে।

https://www.facebook.com/obaidul1991

ভারত-বাংলাদেশের স্বার্থেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেয়া প্রয়োজন

Update Time : ০২:৩৪:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

।। এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া।। ১৬ মে, ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ফারাক্কা বাঁধের ফলে নদীর নাব্যতা ধ্বংস করে নেওয়ার আশঙ্কায় ও পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে সারাদেশের লাখ লাখ মানুষ রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান থেকে মরণবাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চে অংশ নেন ও লংমার্চ শেষে কানসাট হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সেদিন থেকেই ১৬ মে ফারাক্কা লংমার্চ দিবস হিসাবে নামে পরিচিতি লাভ করে বাংলাদেশসহ আর্ন্তজাতিক বিশ্বে। বাংলাদেশসহ এতদঅঞ্চলের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জনদুর্ভোগের জন্য মওলানা ভাসানী ওইদিন লং মার্চ করে ভারত সরকারের কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এই লংমার্চের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন বাংলার মাটি ও মানুষের মহান নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তাই এ দিনটি আজো শোষণ, বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং দাবি আদায়ের পক্ষে বঞ্চিতদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

যে ফারাক্কা বাংলাদেশকে পানি বঞ্চিত করার জন্য ভারত তৈরী করেছিল সেই ফারাক্কাই আজ খোদ ভারতের জন্যও অভিশাপে রুপান্তরিত হয়েছে। খোদ ভারতেই এখন ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে আলোচনা চলছে। বিষয়টা অবাক করার মতো হলেও শতভাগ সত্য। বিহারের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ২০১৬ সালের গত ২৩ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফারাক্কা বাঁধ স্থায়ীভাবে ভেঙে দেয়ার দাবি এবং তখনই ফারাক্কা বাঁধের সব গেইট খুলে দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন । তিনি বিহারের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ফারাক্কা বাঁধকে দায়ী করেন। বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার তখনই ফারাক্কা বাঁধের অধিকাংশ গেইট খুলে দিয়েছিল। মোট ১০৪টি গেইটের মধ্যে ৯৫টি গেইটই খুলে দিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। নীতিশ কুমারের ফারাক্কা বাঁধ স্থায়ীভাবে ভেঙে দেয়া এবং ফারাক্কা বাঁধের সব গেইট খুলে দেয়ার দাবি মুহূর্তেই গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। সেই সংবাদ বাংলাদেশের জনগণের মুখে মুখে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। বিহার প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ফারাক্কা বাঁধের ব্যাপারে সম্প্রতি যে সত্য উচ্চারণ করেছেন, ৫০ বছর আগে তার হুঁশিয়ারি করেছিলেন এক বাঙালি নদী-প্রকৌশলী। সেই ১৯৬২ সালেই পশ্চিমবাংলায় সেচ ও জলপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্য ফারাক্কার তিনটি অভিশাপের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি লিখেছিলেন, ‘ফারাক্কা ব্যারাজের বিরুদ্ধে আমার হুঁশিয়ারি না মানার পরিণতিতে জনগণ দুর্ভোগের শিকার হবে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, এই বাঁধ নদীর পলি-ভরাট হওয়া আরও বাড়াবে, ভাটির দেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পানিপ্রবাহ কমাবে এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ আর বিহারের বেশ কটি জেলায় বন্যার প্রকোপ বাড়াবে।’ তাঁর সেই হুঁশিয়ারিই যে ফলে গেছে, তা আজ ৫০ বছর পর সর্বজনবিদিত। সে সময় ফারাক্কার বিরোধিতার জন্য ভারতীয় গণমাধ্যম তাঁকে পাকিস্তানের চর বলে অভিহিত এবং পরিণামে সরকারি চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন এই নদীবিশেষজ্ঞ। আমৃত্যু তিনি তাঁর বক্তব্যে অটল থেকেছেন এবং নিজের ভবিষ্যদ্বাণী নিজেই ঘটে যেতে দেখেছেন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ দীর্ঘদিন থেকে ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণকে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর বললেও, অপর অংশ এই অভিযোগকে কখনই গুরুত্ব দেয়নি। বরং ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতাকে ভারত বিরোধিতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দেয়ার দাবি জানায় তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারো বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবীর প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশকে পানিশূন্য করতে ভারত কর্তৃক একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কুটকৌশলের অংশ হিসাবেই বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কি.মি. দূরে ভারতের মনোহরপুরে নির্মিত হয় ফারাক্কা বাঁধ। ১৯৬১ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। বাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ করে ১৯৭০ সালে। তখন পরীক্ষামূলক ভাবে ভারত কিছু কিছু পানি ছাড়ে তারা। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির মাধ্যমে ফারাক্কার বাঁধ চালু হয়। ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ১৯৭৬ থেকে একতরফাভাবে পানি তার নিজ দেশের অভ্যন্তরে ফিডার ক্যানেল দিয়ে প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে। ফলে ১৯৭৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত চাহিদানুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিতই হচ্ছে বাংলাদেশ। অথচ ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে, শীতকালের শুষ্ক মৌসুমেও পদ্মা নদী থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানি পেত বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকার ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি ইস্যু নিয়ে ৩০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে। মোটাদাগে এ যুক্তি বাংলাদেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়! কিন্তু তিন মাসের মধ্যেই সে চুক্তি ভারত অকার্যকর করে দেয়। ১৯৯৭ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক পানি পায়, যা ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর সর্বনিন্ম প্রবাহ ছিল। অথচ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পানি পাওয়ার কথা ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক। ১৯৭৭ সালের পানি চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, কিন্তু এ চুক্তিতে তা না থাকায় ভারত বাংলাদেশকে তার ন্যায্য হিস্যা দিতে বাধ্য ছিল না।

ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা, মহানন্দাসহ দেশের বড় বড় সব নদী নাব্যতা হারিয়ে ফেলে হয়ে পড়েছে পানিশূন্য বালির চরাঞ্চল। ফারাক্কা ব্যারাজের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মাসহ অন্য তিন নদী মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা শুকিয়ে যাচ্ছে। পানি না থাকায় পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। পানি বিশ্লেষকগণ বলেছেন, উজানে একাধিক বাঁধ দিয়ে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় ফারাক্কা পয়েন্টেই পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চল মরুভ‚মি হয়ে যেতে পারে। যার নজির ইতোমধ্যে দেখা শুরু হয়ে গেছে।

কলকাতা বন্দর ছিল, ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে বড় বন্দর। হুগলি নদী থেকে বয়ে আসা বিপুল পরিমাণ পলি বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। নাব্যতা বজায় রাখতে গঙ্গা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করে বিকল্প খাল দিয়ে গঙ্গার পানিকে হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা শুরু হয়। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর হতেই উজান এবং ভাটিতে অবস্থিত অঞ্চলে পরিবেশ গত বিপর্যয় শুরু হয়। এই বাঁধের উজানে বিস্তীর্ণ এলাকায় পলি জমার কারণে প্রতি বছর বন্যা হয় আর ভাটির অঞ্চলে পানির অভাবে খরা দেখা দেয়। পশ্চিম বঙ্গের মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় ব্যাপক নদীভাঙ্গন হয় এবং বিশাল জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিহার প্রদেশে প্রতি বছরই ব্যাপক বন্যা হয়। বছরের পর বছর ধরেই এ অবস্থা চলে আসছে। আর ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পানির অভাবে পরিবেশ গত বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। শুস্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি নিয়ন্ত্রণ করার কারণে পদ্মা নদীর বুকে চর আর চর জেগে ওঠে। অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দেবার কারণে সেই পানিতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা হয়।

আজ প্রমানিত হয়েছে যে, ফারাক্কা বাঁধ ভারত এবং বাংলাদেশ কারো জন্যই লাভজনক নয়। ফারাক্কা বাঁধের কারণে এতদাঞ্চল এতদিন কেবলমাত্র ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। এই বাঁধের কারণে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি ভারতও ক্ষতি থেকে মুক্তি পায় নাই। আর দীর্ঘদিন যাবত যারা ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করেছিল আজ তাদের দাবিই সত্য হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতাকে যারা ভারত বিরোধিতা বলে অভিহিত করেছিল, তাদের সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আজ ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করার জন্য আর শুধুমাত্র বাংলাদেশের জনগণের প্রয়োজন নেই। আর ফারাক্কা বাঁধের পক্ষে কথা বলার মতো কোন যুক্তিই এর স্বপক্ষের লোকদের জানা আছে বলে মনে হয় না। সুতরাং এখন উচিত ভারত বাংলাদেশের যৌথ কল্যাণের স্বার্থে ফারাক্কা বাঁধকে স্থায়ীভাবে ভেঙে ফেলা। এটাই বাস্তবতা এবং এতেই উভয় দেশের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

ইতিমধ্যে ভারতেও ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে জনমত ক্রমান্বয়ে জোরালো হচ্ছে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ছাড়াও মেধা পাটকরের মতো অ্যাক্টিভিস্ট ও অনেক বিশেষজ্ঞও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেছেন, ভারতেও ফারাক্কা এখন সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি ঘটাচ্ছে, কাজেই এটি অবিলম্বে ‘ডিকমিশন’ করা দরকার। তাছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞই মানেন কলকাতা বন্দরকেও সেভাবে বাঁচাতে পারেনি ফারাক্কা– যে কারণে উপকূলের কাছে তৈরি করতে হয়েছিল আর একটি স্যাটেলাইট বন্দর হলদিয়া। ফারাক্কার জন্যই পদ্মার দু’কূলে মানুষের জীবন-জীবিকা আজ বিপন্ন বলে যেমন বাংলাদেশের অভিযোগ– তেমনি ভারতেও কিন্তু ফারাক্কার সমালোচনা কম নয়। আজ ৫০ বছর পরে এসে ফারাক্কার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারত ঠিক কী ভাবছে? ফারাক্কার প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে ভারতেও অনেক বিশেষজ্ঞ সন্দিহান ছিলেন। তবে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানোর যুক্তিটা এতটাই প্রবল ছিল যে সেই সব আপত্তি বিশেষ ধোপে টেঁকেনি। ফারাক্কার উজানে ঝাড়খন্ড-বিহারের সীমান্ত এলাকায়ও আমজনতার এই বাঁধকে নিয়ে বিস্তর অভিযোগ- বর্ষাতে যেমন, তেমনি শুকনা মৌসুমেও!

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায় ফারাক্কা অঞ্চলে বাঁধের প্রভাব নিয়ে ফিল্ড স্টাডি ও গবেষণা করেছেন– এ ব্যাপারে তারও মিশ্র অভিজ্ঞতা। এ বিষয়ে তিনি বিবিসিকে বলছেন, ‌’ফারাক্কায় নদীর বুকেও চর পড়েছে, মাঝনদীতে বক দাঁড়িয়ে আছে এটাও যেমন দেখেছি – তেমনি গঙ্গার বিধ্বংসী ভাঙনে পারের মানুষের জীবন ছারখার হয়ে যেতেও দেখেছি।’ সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘এই নদীর যে প্যাটার্নের চেঞ্জটা, ইটসেল্ফ নদীটার মধ্যে, তার দুই পারে সবটারই ওপরে একটা ইমপ্যাক্ট ফেলেছে ফারাক্কা ব্যারাজ। ডেফিনিটলি। তার পজিটিভগুলো আমরা পেয়েছি, নেগেটিভগুলোও আমরা দেখতে পাচ্ছি।’ ফারাক্কাতে তার শেষ ফিল্ড স্টাডিতে স্থানীয় গ্রামবাসীরা ফারাক্কা বাঁধকে তুলনা করেছিলেন একটা সাপের মাথা চেপে ধরার সঙ্গে! ফারাক্কার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আবার জানাচ্ছেন, নদীর ভাঙন ঠেকাতে না-পারলে ফারাক্কা অচিরেই তাদের জন্য চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে!

ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পাঁচ দশক পর আজ যখন ভারতেরই একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ফারাক্কা বাঁধকে অকল্যাণকর আখ্যায়িত করে এর গেইটসমূহ খুলে দেয়ার দাবি জানায় এবং সেই দাবির সাথে একমত হয়ে ভারত সরকার যখন সাথে সাথেই ফারাক্কা বাঁধের গেইটসমূহ খুলে দেয়, তখন স্রষ্টার সৃষ্ট গঙ্গা নদীতে মানুষের সৃষ্ট বাঁধ যে ক্ষতিকর তা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়। সুতরাং স্রষ্টার সৃষ্ট এই পৃথিবীর নদ-নদীসমূহকে স্বাভাবিক ভাবে প্রবাহিত হতে দিতে হবে। আর ভারত বাংলাদেশের কল্যাণের স্বাথেই ফারাক্কা বাঁধকে চিরতরে ভেঙে দিতে হবে এবং অন্য নদীর ওপর নতুন কোন বাঁধ নির্মাণ হতে বিরত থাকতে হবে। কারণ নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ সাগরে মিলনের মধ্যেই কল্যাণ, অন্য কোথাও নয়। আর সে জন্য মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর মতো একজন সিংহপুরুষের আজ বড়ই প্রয়োজন। অশীতিপর এ মানুষটি ভগ্নশরীর নিয়ে জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে জাতিকে এক কাতারে সমবেত করতে ডাক দিয়েছিলেন। তার সে ডাকে লাখ লাখ মানুষ সাড়া দিয়ে আগ্রাসী শক্তির ভিতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

( লেখক : রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক )