https://www.facebook.com/obaidul1991
ধর্ষকের পরিচয় সে ধর্ষক হিসেবে বিচার করতে হবে ——— মোশারফ হোসেন
- Update Time : ০৩:২৮:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
- / ৫৫ Time View

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে
বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, এবং আইনের
প্রয়োগে দুর্বলতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে । ২০২৪ সালে আইন ও
সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ৪০০-এর বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে । ধর্ষণ
বেড়ে যাওয়ার পেছনের প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতা ও আইনের ধীরগতি – ধর্ষণের
মামলায় বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
নিশ্চিত না হওয়ায় দিন দিন ধর্ষণপ্রবণতা বেড়েই চলছে। চারদিকে ভাইরাসের মতো
ছড়িয়ে পড়ছে ধর্ষণের মহামারি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই সবার আগে
ধর্ষণের খবর চোখের সামনে ভেসে উঠে। বর্তমানে ধর্ষণ আমাদের জাতীয় জীবনে
একটি মারাত্মক ব্যাধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ
কেন্দ্রের (আসক) সর্বশেষ (৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে
সারা দেশে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে মোট ৪০১ জন নারী। এর মধ্যে
ধর্ষণ ? পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৪ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা
করেছেন ৭ জন। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন ১০৯ জন। এর মধ্যে ধর্ষণের চেষ্টার
পর হত্যা করা হয় ১ জনকে। আসক-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে
২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৪ হাজার ৭৮৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ২০২০
সালে এ পরিসংখ্যান ছিল ১ হাজার ৬২৭ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে,
ধর্ষণের পরিমাণ দিন দিন তুমুল বেগে বেড়েই চলছে। বাংলাদেশে গড়ে প্রতি ৯ ঘণ্টায়
একটি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত চার বছরে বাংলাদেশে প্রতিদিন অন্তত দুজন নারী ধর্ষণের
শিকার হয়েছেন। কয়েকমাস আগে ব্যস্ততম নগরী ঢাকার ব্যস্ততম ফুটপাতে
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষিত হন, কয়েক সপ্তাহ আগে কুমিল্লার বাসে এক
গার্মেন্টস কর্মীকে গণধর্ষণ করা হয়। তখন এ দেশের অনেকেই যুক্তি দাঁড় করিয়ে
বলেছিলেন- মেয়েটি একা ছিল, মেয়েটির পোশাক, কেন সে একা বের হলো- এইসব
কুযুক্তিপূর্ণ তকমা লাগিয়ে ধর্ষণের জন্য মেয়েটিকেই দোষী বানিয়েছিল। তবে আজ
মেয়েটি তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত কাছের মানুষ স্বামীর সঙ্গে বেরিয়েও স্বাধীন দেশের
বেশ জনবহুল একটি এলাকায় নিরাপদ থাকতে পারল না। পারলেন না ধর্ষকদের লোলুপ
হাত থেকে বাঁচতে। বিশ বছর বয়সি মেয়েটি স্বামীর সঙ্গে থাকা অবস্থাতেও গণধর্ষণের
শিকার হলেন। এতক্ষণ যে ঘটনাটির বর্ণনা করা হলো, সেটি ইতোমধ্যে আপনারা বুঝে
গেছেন। কয়েকমাস আগে সিলেটে স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়ে গণধর্ষণের শিকার হন
এক তরুণী। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নিজগৃহে মধ্যযুগীয় কায়দায় এক গৃহবধূকে ধর্ষণ
ও বিবস্ত্র করে মর্মান্তিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং সেটার ভিডিও সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পরে ঘটনাটি আলোচনায় আসে। জানা যায়

ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতাসীনরা জড়িত। এখন প্রশ্ন হলো ধর্ষকগোষ্ঠী এত সাহস
ও শক্তি কোথা থেকে পায় ! এদের পৃষ্ঠপোষক কারা? কোন শক্তিবলে তারা ঘরের
ভেতর ঢুকে একজন নারীকে ধর্ষণ ও অমানবিক নির্যাতন করার সাহস পায় এবং সেটার
ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাড়ে! নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০
(সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী, আমাদের দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড বা
যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’। এমন কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও রীতিমতো একের পর
এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলছে। দিন দিন ধর্ষণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম
কারণ হলো, আইনের সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়া। এছাড়াও অন্যতম প্রধান কারণটি
হলো রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার প্রভাব। অপরাধীরা তাদের রাজনৈতিক পরিচয়কে
অস্ত্র ও শাস্তি ঠেকানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পায়। তারা জানে পুলিশ,
আইন, বিচার তথা প্রশাসন সবকিছুই তাদের অপরাধের আশ্রয়স্থল। তারা জানে যে,
এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে। তাই তারা অনায়াসে
নির্ভয়ে নানা রকম অপরাধে যুক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়,
ধর্ষণের ঘটনাগুলোতে ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে জড়িত কিংবা ব্যক্তিবর্গ কিংবা
ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা জড়িত থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানে কঠোর আইন রয়েছে,
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে। দেখা যায়, আইনের
ফাঁকফোঁকর দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। তাই আইনের সঠিক প্রয়োগ ও
বাস্তবায়নে রাষ্ট্রযন্ত্রকে তৎপর হতে হবে। আইন প্রয়োগে সব আইনি জটিলতা
পরিহার করতে হবে। সাম্প্রতিককালে দেশজুড়ে ধর্ষণের ঘটনায় আমাদের নারীসমাজ
একটা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমান আমাদের
গনতান্ত্রিক সরকারকে ধর্ষণের লাগাম টেনে ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে
হবে। সর্বোপরি ধর্ষণ প্রতিরোধে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
ধর্ষকের বিশেষ কোনো পরিচয় নেই। ধর্ষক যেই হোক বা যেকোনো রাজনৈতিক দল-
মতের হোক না কেন, ধর্ষকের পরিচয় সে ধর্ষক। ধর্ষকের শরীর থেকে প্রথমে
রাজনীতির পোশাকটি খুলে ফেলতে হবে। তারপর তার অপরাধের জন্য দীর্ঘসূত্রতা
পরিহার করে অল্প সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে যাতে
পরবর্তী কেউ শিক্ষা নিতে পারে এবং অপরাধ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে।





















