https://www.facebook.com/obaidul1991
প্রসঙ্গ – ধর্ষন ——– মোশারফ হোসেন
- Update Time : ০৪:০২:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
- / ৪৯ Time View

শুরুতেই জেনে নেয়া প্রয়োজন, ধর্ষন শব্দটি দ্বারা আসলে কী বোঝায় এবং ধর্ষনের
সংজ্ঞা কী। ধর্ষণ হচ্ছে, শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্য যেকোনভাবে চাপ প্রদান,
ব্ল্যাকমেইল কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে কারোর সাথে শারীরিক
সম্পর্ক স্থাপন করা। অনুমতি প্রদানে অক্ষম কোনো অজ্ঞান, বিকলাঙ্গ, মানসিক
প্রতিবন্ধী কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি । এরকম কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যেকোন
ভাবেই হোক, যৌনমিলনে লিপ্ত হওয়াও ধর্ষণের আওতাভুক্ত। অর্থাৎ, একজন
প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে সম্মতি না দিলে, তার সাথে যেকোন ধরণের
যৌনমিলনই ধর্ষনের আওতাভুক্ত। আবার, একজনের উপর অন্যজনের চাপিয়ে দেওয়া
অনিচ্ছাকৃত যৌন আচরণকে যৌন নির্যাতন বা উৎপীড়ন বলা হয়। যখন প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষভাবে যৌনকাজে জোর করা হয় যখন এক পক্ষের কোন সম্মতি থাকে না, তখন
তাকে যৌন লাঞ্ছনা বলা হয়। যৌন লাঞ্ছনার মধ্যে অযাচিত স্পর্শ, ক্ষমতার দ্বারা
যৌন কাজে সম্মত হওয়ার জন্য চাপ প্রদান ইত্যাদিও অন্তর্ভূক্ত। এ ধরণের ঘটনায়
অপরাধীকে যৌন নির্যাতক বা উৎপীড়ক বলে অভিহিত করা হয়। আবার, যদি কোন
প্রাপ্তবয়ষ্ক লোক বা তরুণ কোন শিশুকে যৌন কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্যে অনুপ্রেরণা
দেয় তাকেও যৌন নির্যাতন বলা হবে। শিশু বা নাবালকের সাথে অনুপ্রেরণা দিয়ে যৌন
কাজে লিপ্ত হলে তাকে শিশু যৌন নির্যাতন বা বিশেষ আইনের আওতায় ধর্ষন বলা হয়।
সাধারণভাবে অনেকেই মনে করেন ধর্ষণের বিষয়টি যৌনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু
সমাজবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন ধর্ষণের সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক নেই। ধর্ষণ
আসলে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটা ভালো করে বোঝা যাবে যুদ্ধের
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে। দুনিয়ার সকল যুদ্ধেই ধর্ষণকে একটা হাতিয়ার হিসেবে
ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী
যে দুই লক্ষ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করেছে, যৌন নিপীড়ন করেছে এর মূল কারণ কিন্তু
রাজনৈতিক। কেবল যৌন আকাক্সক্ষা নিবারণের জন্য তারা এটা করেনি। বাঙালি
জাতিকে অপমান করার জন্য, হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য, বাঙালির মনোবল ভেঙে
দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি হানাদারেরা আমাদের শহর-বন্দর-গ্রামে লুটতরাজ,
অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি এই যৌন সহিংসতা চালিয়েছে। ফলে যুদ্ধের সময়ে চালানো
ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতাকে একটা ‘যুদ্ধকৌশল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে
থাকে। এ কারণেই ভোটের পর ভিন্ন ধর্মের সংখ্যালঘু কিংবা রাজনৈতিক
ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপরও ধর্ষণের অস্ত্র প্রয়োগ করতে দেখা যায়। সম্প্রতি
যেমনটা দেখা গিয়েছিল বহুল আলোচিত নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ঘটনাতেও। বাংলাদেশে
ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা, তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে দেশে
বর্তমানে ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’ বিরাজ করছে। ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’ বলতে এমন এক
সংস্কৃতিকে বোঝানো হয়, যেখানে সমাজের প্রত্যেক নারী, শিশু কিংবা কিশোরী বালিকা
ধর্ষণের মতো পরিস্থিতির শিকার হতে পারে। শুধু পুলিশ পরিসংখ্যান অনুযায়ী
বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৪০০টি। এ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে
ধর্ষণের হার ৩.৮০ অর্থাৎ প্রতি ১ লাখ নারী-নারীর মধ্যে প্রায় ৪ জন নারী-শিশুকেই
ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে, যা স্মরণকালের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। আমরা দেখতে
পাই ১৯৯১, ২০০১, ২০১১ ও ২০১৮ সালে প্রতি লাখে ধর্ষণের হার যথাক্রমে ০.৩৯
জন, ২.৩৭ জন, ২.৩৮ জন ও ২.৪৫ জন। শুধু পরিসংখ্যান বিবেচনায় ২০১৮ সালের
তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণের এ হার বাড়ার পরিমাণ প্রায় প্রতি লাখে ১.৩৫ জন বা
এক-তৃতীয়াংশ (বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ওয়েবসাইট, ২০১৯)। যদিও নারী ও
শিশুর প্রতি সার্বিক সহিংসতা বা নির্যাতনের প্রকাশিত ঘটনার মাত্রা আরও অনেক
বেশি। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে যথাক্রমে প্রতি লাখে এ হার ৮.১৮ জন ও ৭.২১ জন। আর
২০১৯ সালের প্রথম ৬ মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১০ হাজার ১৫৯টি
এবং হার বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করলে প্রায় এটা আগের প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে,
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণের
সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে মোট নারী ও শিশু ধর্ষণের সংখ্যা ছিল
৭৩২টি, সেখানে ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪১৩টি (আসক, ২০২০)।
প্রকৃত ঘটনা এর চেয়েও আরও অনেক বেশি। পরিসংখ্যান বিবেচনায় বাংলাদেশে যে
ধর্ষণের সংস্কৃতি বিরাজমান, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ এসব পরিসংখ্যান
দেয় না। কয়েক বছর আগে খুলনায় ৬৫ বছরের এক নারীকে ধর্ষণ করে সেই ছবি
সিঙ্গাপুরে ওই নারীর ছেলেকে পাঠানো হয়েছে। যৌনতার কারণে ওই বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করা
হয়নি। ধর্ষণ করে ছেলেকে ছবি পাঠানো হয়েছে তার মাকে অপমান করার জন্য, হেয়
করার জন্য, প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকে। কাজেই ধর্ষণ স্পষ্টভাবেই পুরুষতান্ত্রিক
ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত, পুরুষতন্ত্রের পেশিশক্তি, পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যের সঙ্গে
যুক্ত। আজকাল অনেককে বলতে শোনা যায় আসলে ধর্ষণ আগের চেয়ে খুব বেশি হয়তো
বাড়ছে না, কিন্তু ধর্ষণের খবর গণমাধ্যমে আসার পরিমাণটা বাড়ছে। এটা ভুল ধারণা।
ধর্ষণ আগেও ছিল, এখনো আছে এবং সেটা বাড়ছেও। দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে,
সারা দেশে গণমাধ্যমের নেটওয়ার্ক আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন আরও অনেক
বিস্তৃত ও শক্তিশালী হয়েছে, পাশাপাশি ফেইসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যমের এক নতুন ধরনের সক্রিয়তা আমরা এখন দেখছি। এর ফলে কোনো ধর্ষণের
ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া আগে যত সহজ ছিল এখন আর সেটা করা যাচ্ছে না। কোনো না
কোনোভাবে সেটা প্রকাশিত হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো মূল ধারার গণমাধ্যমে
আসার আগে ফেইসবুকে তা প্রকাশিত হচ্ছে এবং পরে গণমাধ্যমও সেটা প্রকাশ করছে।
ফলে ধর্ষণের খবর প্রকাশ সহজ হয়েছে। এছাড়া মানুষের সচেতনতা বেড়েছে, আগে
যৌননিপীড়ন বা ধর্ষণের কথা প্রকাশ করতে যে লাজলজ্জা ও ভীতির মানসিকতা কাজ
করত সেটা আস্তে আস্তে কমে আসছে। এটাও ধর্ষণের খবর বেশি প্রকাশিত হওয়ার
একটা উল্লেখযোগ্য কারণ বলে মনে করি। এটা একটা ভালো লক্ষণ হলেও ধর্ষণ
সংক্রান্ত নানা ধারণা এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া এখনো খুবই সমস্যাজনক।
সর্বোপরি ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে এ বিষয়ে সামাজিক প্রতিরোধ
জাগিয়ে তুলতে হবে।

























