https://www.facebook.com/obaidul1991
আইনের শাসন না থাকাই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা
- Update Time : ০৫:৫৬:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
- / ৪০ Time View

আমাদের বাংলাদেশের জনগণ রাজনীতি নিয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণভাবে জড়িত। কারণ এর সাথে তাদের দৈনন্দিন জীবন, জীবিকা, অধিকার এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন সরাসরি জড়িত রাজনীতি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যম নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের ভাগ্য ও সম্পদের বণ্টন নির্ধারণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রীয় নীতি, সরকারি চাকরি, ও সম্পদের বণ্টন সরাসরি রাজনীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই নাগরিকরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ও সুবিধার জন্য রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন। অতীতের সকল আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মতো বড় বড় জাতীয় পরিবর্তনগুলো সাধারণ মানুষের অংশ গ্রহণের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে। এই ঐতিহ্যই জনগণকে যেকোনো রাজনৈতিক সংকটে সচেতন ও সোচ্চার রাখে। বাংলাদেশের সমাজ ও পরিবারগুলো প্রায়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শে বিভক্ত। ফলে পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত রাজনৈতিক আলোচনা, বিতর্ক ও কৌতূহল মানুষের নিত্যদিনের অংশ দেখা যায়। অতীতে সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিতর্কের কারণে জনগণ সবসময় সচেতন থাকে এবং পরিবর্তনের আশায় রাজনৈতিক হালচালের দিকে ভাল নজর রাখে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন যখন শুরু হলো, তখন থেকেই দেশে আর্থসামাজিক সূচকে এগিয়ে গেলেও রাজনীতিতে কোনো অগ্রগতি নেই । প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এ দেশ রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হতে পারেনি। এ পরিস্থিতিকে ২০২০ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যারি ব্লেয়ার ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে ‘বাংলাদেশ প্যারাডক্স’ নামে দীর্ঘ নিবন্ধনও লিখেছেন। অন্য গবেষণায় দেখা যায়, আবদ্ধ ও উন্মুক্ত—দুই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য চলে। আর এখানে এসব চুক্তির একটা শৃঙ্খলা রয়েছে, অর্থাৎ চুক্তি সচরাচর ভঙ্গ হয় না। এটাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটা মূলমন্ত্র। তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল না ঘটার পেছনে এখানকার গোত্রভিত্তিক রাজনীতির কথাই শোনা যায়। গোত্রভিত্তিক রাজনীতির পরিণতি শেষ পর্যন্ত প্রতিহিংসায় রূপ নেয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গত মে মাসে প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ২৭ লাখের বেশি মানুষ বেকার। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সূত্রপাতও হয়েছিল বেকার সমস্যা থেকে সৃষ্ট হতাশা। যার পরিণতি ছিল কোটা আন্দোলনে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও সংহতি। এমন পরিস্থিতিই মক্কেলতন্ত্রের জন্ম দেয়, অর্থাৎ যার কাছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা রয়েছে, সে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে কর্মসংস্থান বা অন্য সুবিধা দিয়ে আনুগত্য কিনে নিতে পারে। আর এমন অনেক মানুষের সম্মিলনে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো গড়ে উঠেছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত, তুলনামূলক ভালো প্রার্থীর যদি পৃষ্ঠপোষকতা বা সুবিধা দেওয়ার সক্ষমতা না থাকে, তাহলে তাঁর পেছনে কেউ হাঁটে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এ চিত্র পাল্টাতে হলে প্রয়োজন জনগণকে নাগরিক করে তোলা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা থাকা। দূর্বল রাষ্ট্রের আরেকটা বড় কারণ হলো, দেশে আইনের শাসন না থাকা এবং মৌলিক চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। রাজনৈতিক বা অন্য অনেক ভুয়া মামলায় এখানে মানুষ গ্রেপ্তার হয়। আবার যথাযথ অপরাধেও অনেকের সাজা হয় না। এই অসম ব্যবস্থা, এখানে ক্ষমতাবানেরাই সুবিধা প্রাপ্ত। তাদের কাছে থাকা এসব সুবিধা পাওয়ার আশায় সাধারণ অনেক মানুষ তাদের প্রতি অনুগত থাকে। দেশে আইনের শাসন থাকলে এটা হতো না। ফলে উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীর পৃষ্ঠপোষকতা দিতে ব্যর্থ প্রার্থীর পক্ষে ভোটে জেতা কঠিন। তখন মক্কেলতন্ত্রকে মানুষ নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে রাষ্ট্র আরও দুর্বল হতে থাকে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়েল মিগডাল তাঁর ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত ‘স্ট্রং সোসাইটিজ অ্যান্ড উইক স্টেটস’ বইয়ে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার যে ধারণা দিয়েছেন, সেই ধারণার আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশে রাষ্ট্রের বিপরীতে সমাজ বেশি শক্তিশালী। বেশির ভাগ মানুষ মনে করে, শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে যেই রাষ্ট্র আন্দোলন দমন করতে পারে বা বল প্রয়োগ করতে পারে। এটা সম্পূর্ণ ভুল একটা ধারণা, বরং যে রাষ্ট্র যত বেশি দুর্বল, সে ততই সহিংসতার আশ্রয় নেয়। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স বেবার ‘পলিটিকস অ্যাজ আ ভোকেশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্রের সহিংসতার একাধিপত্য রয়েছে। সামন্ত প্রভুদেরও নিজেদের পেটুয়া বাহিনী ছিল। কিন্তু পুলিশ-সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্র সেই ক্ষমতা অনেক বেশি সংহত করেছে। কিন্তু সহিংসতার একাধিপত্যের এ ব্যবহার সাধারণত রাষ্ট্রের দুর্বলতা প্রকাশ করে। আর পৃথিবীতে যাদের আমরা ভঙ্গুর রাষ্ট্র বলি, তারা তো টিকেই থাকে সহিংসতার এ একাধিপত্যের জোরে।
——- মোশারফ হোসেন



























