০৭:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬
https://www.facebook.com/obaidul1991

গণেশের মাথা হাতির মতো কেন ? ——– মোশারফ হোসেন

মতামত
  • Update Time : ১২:২৩:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৪ Time View

ছোট কাল থেকেই জানার ইচ্ছা ছিল মানুষের শরীরে হাতির মাথা কেন? যোগ বিয়োগ করে কিছুই মিলাতে পারতাম
না। বয়স্ক হিন্দুদেরকে জিজ্ঞেস করলেও বলতে পারতো না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলোকে এই পড়ন্ত
বেলায় জানতে পারি সনাতনী আদিশক্তি পার্বতী ও দেবাদিদেব মহাদেবের প্রিয় পুত্র গণেশের মাথা হাতির মতো
কেন? এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে এক রোমাঞ্চকর পৌরাণিক কাহিনিতে, যা গভীর অর্থবহ। সেই কাহিনি
অনুসারে, একবার দেবী পার্বতী শরীরে কাচা হলুদ বাটা মেখে স্নানে যাওয়ার আগে তাঁর শরীরের ময়লা থেকে
একটি মানবশিশুকে তৈরি করেন এবং তাকে তাঁর কক্ষের প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত করেন। পার্বতী সেই শিশুটিকে
আদেশ দেন যে, তাঁর অনুমতি ছাড়া যেন কাউকে সেই কক্ষে প্রবেশ করতে না দেওয়া হয়। এর কিছু ক্ষণ পরে
স্বয়ং শিব সেখানে এসে পার্বতীর কক্ষে প্রবেশ করতে চান। কিন্তু 'দ্বাররক্ষী' শিশুটি তাঁকে বাধা দেয়। শিবের
বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও সে নিজের অবস্থানে অনড় থাকে। শিব অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে নিজের ত্রিশূল দিয়ে
তার মাথা কেটে ফেলেন! পার্বতী এই ঘটনা জানতে পেরে শোকে এবং ক্রোধে বিহ্বল হয়ে পড়েন। তাঁর ক্রোধ
এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তা সমগ্র সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দিতে পারত! শিব তখন তাঁর ভুল বুঝতে পেরে পার্বতীকে
শান্ত করেন। প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি শিশুটির জীবন ফিরিয়ে দেবেন। মহাদেব তাঁর অনুচরদের নির্দেশ দেন যে,
তারা যেন উত্তর দিকে মুখ করে থাকা প্রথম জীবিত প্রাণীটির মাথা কেটে নিয়ে আসে। এই নির্দেশ মান্য করে
অনুচরেরা একটি হাতির মাথা খুঁজে পান। শিব সেই হাতির মাথাটি শিশুটির শরীরের সঙ্গে জুড়ে তাকে পুনরুজ্জীবিত
করেন। তিনিই শিশুটির নাম দেন গণেশ, যার অর্থ হল – গণদের ঈশ্বর বা নেতা। কোনো কোনো পুরাণে উল্লেখ
আছে যে, শনিদেবের কুদৃষ্টির কারণে শিশুটির মাথা পুড়ে ছাই বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন সেখানে হাতির মাথা
জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী তাৎপর্য -হাতির বড় মাথা ও কান জ্ঞান, গভীর চিন্তা এবং
ভালো শোনার ক্ষমতার প্রতীক। হাতি যেমন জঙ্গল বা বড় বড় বাধা অতিক্রম করতে করতে সোজা এগিয়ে যায়,
তেমনি গণেশ মানুষের জীবনের সমস্ত বাধা দূর করেন। গণেশের গজমুখ হওয়া কীসের প্রতীক? গণেশের গজমুখ
হওয়া কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনি নয়, বরং এটি একাধিক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তার প্রতীক।

সরকার

প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের প্রতীক: হাতি হল প্রজ্ঞা, শক্তি এবং বুদ্ধির প্রতীক। গণেশের গজমুখ এই গুণাবলীর
প্রতিনিধিত্ব করে। এটি বোঝায় যে, গণেশ কেবল বিঘ্নহর্তা নন, তিনি জ্ঞানেরও দেবতা। হাতির কান বিশাল
হয় কেন ? যা প্রতীকী ভাবে বোঝায়– গণেশ তাঁর ভক্তদের প্রতিটি প্রার্থনা এবং অনুরোধ মনোযোগ সহকারে
শোনেন। এটি শ্রবণশক্তি এবং মনোযোগের প্রতীক। হাতির চোখ ছোট হলেও তা গভীর মনোযোগ ও তীক্ষ্ণ
দৃষ্টির প্রতীক। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, শ্রী গণেশ সব কিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সূক্ষ্ম
বিষয়গুলিও দেখতে পান। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ সালে সারা দেশে ধুমধাম সহকারে পালিত হতে চলেছে গণেশ
চতুর্থী। গোটা দেশে এই সিদ্ধিদাতার পুজো নিয়ে বহু ধরনের উন্মাদনা উৎসাহ প্রতিবারই দেখা যায়। এখন
প্রশ্ন হল দেবী দুর্গার প্রতিমার সাথে গণেশের মূর্তি সংযোজনের কারন কি? একসাথে পূজা করার পেছনে মূলত
আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও পারিবারিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলোঃ-
সনাতন ধর্মে দেবী দুর্গা ও শিবের সন্তান হলেন গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। বাঙালি সংস্কৃতিতে
বিশ্বাস করা হয়, দুর্গাপূজার সময় দুর্গা মর্ত্যে তাঁর বাপের বাড়ি আসেন। আর একা আসেন না, তিনি তাঁর চার
সন্তানকে সাথে নিয়েই আসেন। তাই পারিবারিক পুনর্মিলন ও মাতৃত্বের পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে গণেশ দেবীর
সাথে অধিষ্ঠিত থাকেন। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, যেকোনো শুভ কাজ বা পূজার শুরুতে সবার প্রথমে গণেশের পূজা
করা আবশ্যক। তিনি হলেন সিদ্ধিদাতা অর্থ্যৎ (সাফল্য প্রদানকারী) এবং বিঘ্নহর্তা (বাধা দূরকারী)।
দুর্গাপূজার মতো একটি মহোৎসব যেন কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই সফলভাবে সম্পন্ন হয়, সেজন্যই দেবীর
সাথে গণেশকে রাখা ও পূজা করা হয়। দেবী দুর্গা হলেন শক্তির প্রতীক, লক্ষ্মী সম্পদের, সরস্বতী জ্ঞানের,

কার্তিক বীরত্বের এবং গণেশ হলেন বুদ্ধি, জ্ঞান ও শুভ সূচনার প্রতীক। মানবজীবনে চলার জন্য এই পাঁচটি
গুণেরই সমান প্রয়োজন। তাই তাদের মা দুর্গার সাথে গণেশসহ বাকি সন্তানদের উপাসনা আধ্যাত্মিক ও
জাগতিক জীবনের এক পূর্ণাঙ্গ রূপকে প্রকাশ করে। গণেশ হলেন সনাতনী হিন্দু ধর্মের গণমানুষের দেবতা।
দুর্গাপূজাকে সার্বজনীন বা সবার উৎসব করে তোলার প্রতীক হিসেবেও গণেশের উপস্থিতি অত্যন্ত
তাৎপর্যপূর্ণ। সারা দেশে এবার আমাদের সনাতনী হিন্দু ভাইদের বড় উৎসব দূর্গো পূজো সুন্দরভাবে
মহোৎসবে পালিত হয়েছে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

thedailysarkar

দৈনিক সরকার পত্রিকা ১৯৯১ সাল হতে ঢাকা হতে প্রকাশিত হচ্ছে।

https://www.facebook.com/obaidul1991

গণেশের মাথা হাতির মতো কেন ? ——– মোশারফ হোসেন

Update Time : ১২:২৩:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

ছোট কাল থেকেই জানার ইচ্ছা ছিল মানুষের শরীরে হাতির মাথা কেন? যোগ বিয়োগ করে কিছুই মিলাতে পারতাম
না। বয়স্ক হিন্দুদেরকে জিজ্ঞেস করলেও বলতে পারতো না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলোকে এই পড়ন্ত
বেলায় জানতে পারি সনাতনী আদিশক্তি পার্বতী ও দেবাদিদেব মহাদেবের প্রিয় পুত্র গণেশের মাথা হাতির মতো
কেন? এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে এক রোমাঞ্চকর পৌরাণিক কাহিনিতে, যা গভীর অর্থবহ। সেই কাহিনি
অনুসারে, একবার দেবী পার্বতী শরীরে কাচা হলুদ বাটা মেখে স্নানে যাওয়ার আগে তাঁর শরীরের ময়লা থেকে
একটি মানবশিশুকে তৈরি করেন এবং তাকে তাঁর কক্ষের প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত করেন। পার্বতী সেই শিশুটিকে
আদেশ দেন যে, তাঁর অনুমতি ছাড়া যেন কাউকে সেই কক্ষে প্রবেশ করতে না দেওয়া হয়। এর কিছু ক্ষণ পরে
স্বয়ং শিব সেখানে এসে পার্বতীর কক্ষে প্রবেশ করতে চান। কিন্তু 'দ্বাররক্ষী' শিশুটি তাঁকে বাধা দেয়। শিবের
বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও সে নিজের অবস্থানে অনড় থাকে। শিব অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে নিজের ত্রিশূল দিয়ে
তার মাথা কেটে ফেলেন! পার্বতী এই ঘটনা জানতে পেরে শোকে এবং ক্রোধে বিহ্বল হয়ে পড়েন। তাঁর ক্রোধ
এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তা সমগ্র সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দিতে পারত! শিব তখন তাঁর ভুল বুঝতে পেরে পার্বতীকে
শান্ত করেন। প্রতিশ্রুতি দেন যে, তিনি শিশুটির জীবন ফিরিয়ে দেবেন। মহাদেব তাঁর অনুচরদের নির্দেশ দেন যে,
তারা যেন উত্তর দিকে মুখ করে থাকা প্রথম জীবিত প্রাণীটির মাথা কেটে নিয়ে আসে। এই নির্দেশ মান্য করে
অনুচরেরা একটি হাতির মাথা খুঁজে পান। শিব সেই হাতির মাথাটি শিশুটির শরীরের সঙ্গে জুড়ে তাকে পুনরুজ্জীবিত
করেন। তিনিই শিশুটির নাম দেন গণেশ, যার অর্থ হল – গণদের ঈশ্বর বা নেতা। কোনো কোনো পুরাণে উল্লেখ
আছে যে, শনিদেবের কুদৃষ্টির কারণে শিশুটির মাথা পুড়ে ছাই বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন সেখানে হাতির মাথা
জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী তাৎপর্য -হাতির বড় মাথা ও কান জ্ঞান, গভীর চিন্তা এবং
ভালো শোনার ক্ষমতার প্রতীক। হাতি যেমন জঙ্গল বা বড় বড় বাধা অতিক্রম করতে করতে সোজা এগিয়ে যায়,
তেমনি গণেশ মানুষের জীবনের সমস্ত বাধা দূর করেন। গণেশের গজমুখ হওয়া কীসের প্রতীক? গণেশের গজমুখ
হওয়া কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনি নয়, বরং এটি একাধিক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তার প্রতীক।

সরকার

প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের প্রতীক: হাতি হল প্রজ্ঞা, শক্তি এবং বুদ্ধির প্রতীক। গণেশের গজমুখ এই গুণাবলীর
প্রতিনিধিত্ব করে। এটি বোঝায় যে, গণেশ কেবল বিঘ্নহর্তা নন, তিনি জ্ঞানেরও দেবতা। হাতির কান বিশাল
হয় কেন ? যা প্রতীকী ভাবে বোঝায়– গণেশ তাঁর ভক্তদের প্রতিটি প্রার্থনা এবং অনুরোধ মনোযোগ সহকারে
শোনেন। এটি শ্রবণশক্তি এবং মনোযোগের প্রতীক। হাতির চোখ ছোট হলেও তা গভীর মনোযোগ ও তীক্ষ্ণ
দৃষ্টির প্রতীক। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, শ্রী গণেশ সব কিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সূক্ষ্ম
বিষয়গুলিও দেখতে পান। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ সালে সারা দেশে ধুমধাম সহকারে পালিত হতে চলেছে গণেশ
চতুর্থী। গোটা দেশে এই সিদ্ধিদাতার পুজো নিয়ে বহু ধরনের উন্মাদনা উৎসাহ প্রতিবারই দেখা যায়। এখন
প্রশ্ন হল দেবী দুর্গার প্রতিমার সাথে গণেশের মূর্তি সংযোজনের কারন কি? একসাথে পূজা করার পেছনে মূলত
আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও পারিবারিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলোঃ-
সনাতন ধর্মে দেবী দুর্গা ও শিবের সন্তান হলেন গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। বাঙালি সংস্কৃতিতে
বিশ্বাস করা হয়, দুর্গাপূজার সময় দুর্গা মর্ত্যে তাঁর বাপের বাড়ি আসেন। আর একা আসেন না, তিনি তাঁর চার
সন্তানকে সাথে নিয়েই আসেন। তাই পারিবারিক পুনর্মিলন ও মাতৃত্বের পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে গণেশ দেবীর
সাথে অধিষ্ঠিত থাকেন। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, যেকোনো শুভ কাজ বা পূজার শুরুতে সবার প্রথমে গণেশের পূজা
করা আবশ্যক। তিনি হলেন সিদ্ধিদাতা অর্থ্যৎ (সাফল্য প্রদানকারী) এবং বিঘ্নহর্তা (বাধা দূরকারী)।
দুর্গাপূজার মতো একটি মহোৎসব যেন কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই সফলভাবে সম্পন্ন হয়, সেজন্যই দেবীর
সাথে গণেশকে রাখা ও পূজা করা হয়। দেবী দুর্গা হলেন শক্তির প্রতীক, লক্ষ্মী সম্পদের, সরস্বতী জ্ঞানের,

কার্তিক বীরত্বের এবং গণেশ হলেন বুদ্ধি, জ্ঞান ও শুভ সূচনার প্রতীক। মানবজীবনে চলার জন্য এই পাঁচটি
গুণেরই সমান প্রয়োজন। তাই তাদের মা দুর্গার সাথে গণেশসহ বাকি সন্তানদের উপাসনা আধ্যাত্মিক ও
জাগতিক জীবনের এক পূর্ণাঙ্গ রূপকে প্রকাশ করে। গণেশ হলেন সনাতনী হিন্দু ধর্মের গণমানুষের দেবতা।
দুর্গাপূজাকে সার্বজনীন বা সবার উৎসব করে তোলার প্রতীক হিসেবেও গণেশের উপস্থিতি অত্যন্ত
তাৎপর্যপূর্ণ। সারা দেশে এবার আমাদের সনাতনী হিন্দু ভাইদের বড় উৎসব দূর্গো পূজো সুন্দরভাবে
মহোৎসবে পালিত হয়েছে।