প্রতিহিংসায় শান্তি আসে না ———— মোশারফ হোসেন
- Update Time : ০৪:৫৭:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
- / ৪২ Time View

আমাদের দেশ আয়তনে খুব ছোট। আয়তন অনুযায়ী জনসংখ্যা অনেক বেশী। দেশটাকে নিয়ে
অতীতে রাজনীতিবিদরা দেশ বাণিজ্য করেছে। জনগনের করের টাকা মেরে সরকারী কর্মচারীরা
অবৈধ টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছে। সরকারী কর্মচারীরা এসব করতে সাহস পেয়েছে
একমাত্র রাজনীতি দলের প্রতিহিংসার সুযোগে। ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য, রাজনৈতিক
অসহিষ্ণুতা, এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশে প্রতিহিংসার রাজনীতির
চর্চা চলে আসছে। বিরোধী মতকে দমন করে চিরকাল ক্ষমতায় থাকার লোভ এবং অতীতে ঘটে
যাওয়া সংঘাত ও অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতাই এই ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতির মূল
কারণ। রাজনীতিকে জনসেবার পরিবর্তে ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা
করা হয়। ফলে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকা বা যাওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। বিচার
বিভাগ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখন
রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের বিরোধীদের শায়েস্তা করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে হাতিয়ার হিসেবে
ব্যবহার করে। বিরোধী দলের অস্তিত্বকে সম্মান না করা এবং ভিন্ন মতকে শত্রু হিসেবে
দেখার নেতিবাচক প্রবণতা। অতীতে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম বা নির্যাতনের
বিচার না হওয়া এবং পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর পূর্ববর্তী সরকারের ওপর পাল্টা
আক্রমণ চালানোর দুষ্টচক্র। রাজনীতিতে কালো টাকা এবং পেশিশক্তির ব্যবহার বাড়ায়
রাজনৈতিক বিরোধগুলো প্রায়ই সহিংসতায় রূপ নেয়। এই প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে
আসতে আইনের নিরপেক্ষ শাসন, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সহনশীল
রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা অপরিহার্য। প্রতিহিংসা রাজনীতিতে কোনো কল্যাণ আসে না।
এটি ইতিহাসে প্রমাণিত সত্য। ক্ষমতার পালাবদল যতবার হয়েছে, প্রতিশোধের আগুন
ততবারই সমাজকে দগ্ধ করেছে। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। বিচার
ব্যবস্থার মানক্ষুণ্ন হয়েছে। গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। আর তাই আজ নতুন করে
ভাবার সময় এসেছে-প্রতিহিংসার চক্র থেকে বেরিয়ে না এলে আমাদের ভবিষ্যৎ আরও
সংকটময় হয়ে উঠবে। মানুষ যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন মনে হয় তার অধিকার সবকিছু।
বিরোধীরা যেন শত্রু। সমালোচনা যেন অপরাধ। আর ক্ষমতা হাতছাড়া হলে বিপরীত পক্ষের
হাতে প্রতিশোধের পথ খুলে যায়। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির ভেতর একটি অশুভ চক্র
তৈরি হয়েছে—“তুমি আমাকে করেছ, আমিও তোমাকে করবো।” এই চক্রে পতিত হলে রাষ্ট্র
আর জনগণ- দু’জনই হারায়।একটু পিছনের দিকে তাকালে দেখা যায় বিগত চার দশকে এ দেশে
এক শ্রেণির লুটেরাগন সম্পদের পাহাড় গড়েছে। অন্যদিকে মধ্যবিত্তের অনেকেই নেমে গেছেন
দারিদ্র্য সীমার নিচে। আর্থিক অসংগতি সাধারণের মধ্যে সার্বক্ষণিক চাপা ক্ষোভ তৈরি
করছে। কাঙ্ক্ষিত জীবন অর্জনে ব্যর্থতা সমাজে তৈরি করছে অসম প্রতিযোগিতা। বেকারত্ব
সৃষ্টি করছে হতাশা। একই সমাজে উচ্চ শ্রেণির বর্ণাঢ্য জীবন নিম্নবিত্তকে ঈর্শাকাতর
করছে। ধর্মীয় গোঁড়ামির ফলে বেড়েছে উন্মাদনা। অযোগ্য ব্যক্তির উত্থান এবং যোগ্যতমের
পতনে তৈরি হয়েছে বিভেদ। সমাজের এই অসম বাস্তবতা সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ
ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। তারা মানসিকভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। দেশের সমাজ জীবন অসহিষ্ণু
হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করেছে রাষ্ট্র পরিচালকরা। এদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈষম্য
প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আর্থিক বৈষম্য। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ যেখানে
মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খায়,সেখানে লুটেরা শ্রেণি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়
বিত্তবৈভবে আয়েশি জীবনযাপন করে। তারা আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, দুবাই, কানাডা, মালয়েশিয়া,
লন্ডনে সেকেন্ড হোম গড়ে তোলেন। বায়ু পরিবর্তনের জন্য চলে যান পৃথিবীর নামিদামি
সৈকতে। বিনোদনের জন্য বেছে নেন উন্নতমানের আধুনিক হোটেল। তাদের ব্যাংক হিসাবে
থাকে কোটি কোটি টাকা। অন্যদিকে দেশের সাধারণ নাগরিক তিনবেলা ঠিকমতো খেতে পায় না।
চিকিৎসার খরচ জোটে না। করতে পারে না মাথাগোঁজার একটু খানি ঠাঁই। জীবনযাপনের
ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। প্রতিহিংসার রাজনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
উন্নয়ন ও ভাবমূর্তির জন্য একটি বিরাট হুমকি । সে কারণে এখনই তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
গড়ে তুলতে হবে। নতুবা আজ যা বিভিন্ন দলের মধ্যে সংঘটিত হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে তা নিজ
নিজ দলের অভ্যন্তরেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রতিহিংসাতেই
শেষ হতে দেখা যায়। সুতরাং আমাদের মনে রাখতেই হবে, আমরা বিশ্বের মানচিত্রের ছেট্ট
একটি দেশের মানুষ তাই প্রতিহিংসাপরায়ণতা শান্তি আনতে পারে না। শান্তি আসে অহিংসায়।





















