০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬
https://www.facebook.com/obaidul1991

স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সংকট দুর করতে রাষ্টধর্ম ইসলামের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পরিচিত ও পরিচালিত করতে হবে

মতামত
  • Update Time : ০৮:৫১:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
  • / ১৩ Time View

ভূগোল বদলাতে হবে

 

স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হলে মুসলিম উম্মাহকে অবশ্যই তাদের ভূগোল বদলাতে হবে। বিভক্তির দেয়াল ভেঙে একতা গড়তে হবে। এটি স্রেফ রাজনীতি নয়, এটিই মহান আল্লাহর বিধান। একতা মহান রব’য়ের প্রতিশ্রুত রহমত আনে; বিভক্তি আনে প্রতিশ্রুত আযাব। বিভক্তি থেকে না বাঁচলে সম্পদে ও জনবলে শত গুণ বৃদ্ধি এনেও কোন লাভ হবে না। কারণ, বিভক্ত মানচিত্র অসম্ভব করে স্বাধীনতা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচা। ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো, বৃহৎ ভূগোলের বিকল্প নাই। ক্ষুদ্র ভূগোলের অর্থই শক্তিহীনতা ও পরাধীনতা। মুসলিম উম্মাহর আজকের শক্তিহীনতার মূল কারণ জনশক্তি বা সম্পদের কমতি নয়।  বরং সেটি হলো, বিভক্ত মানচিত্র। এজন্যই ইসলাম অতীতে শুধু বিশাল এলাকার জনগণের ধর্ম তথা মনের মানচিত্র পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রও। এটিই নবীজী (সা:)’য়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সূন্নত।  রাষ্ট্রের ভূগোলে লাগাতর বৃদ্ধি আনাই ছিল তাঁর সূন্নত। খোলাফায়ে রাশেদা সে সূন্নতকে অব্যাহত রেখেছিলেন। অপর দিকে নিজ দেশকে খণ্ডিত করাটি হলো শয়তানকে খুশি করার পথ। সেটি পরাজয়, পরাধীনতা ও বেইজ্জতির পথ।

 

মুসলিম উম্মাহর বিভক্ত ভূগোলের মধ্যে দিয়ে দৃশ্যমান হয় মহান রব’য়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বেঈমানী -যেমন প্রবল বিদ্রোহ ও বেঈমানী প্রকাশ পায় শরিয়াশূণ্য আদালত, পতিতা পল্লী, সূদী অর্থনীতি এবং দুর্নীতির প্লাবনে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশেই সেটিই এখন রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি। অপর দিকে একতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মহান রব’য়ের প্রতি বলিষ্ঠ ঈমান, তাঁর হুকুমের প্রতি গভীর আনুগত্য। এবং তাতে প্রকাশ পায় অপর মুসলিমের প্রতি গভীর ভাতৃত্ব। প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায় হলো, তাকে বাঁচতে হয় সে প্যান ইসলামী ভাতৃত্ব নিয়ে। মহান রব তাই শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত ফরজ করেননি, ফরজ  করেছেন সে ভাতৃত্বকেও। সে হুকুম এসেছে নিচের আয়াতে:

 

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

 

অর্থ: “মুমিনরা হলো পরস্পরে ভাই ভাই। অতএবতোমরা তোমাদের ভাইয়ের মধ্যে মিটমাট রে নিবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে -যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।”-(সুরা হুজরাত, আয়াত ১০)।

 

ভাইদের মধ্যে মতভেদ, বিরোধ, ভুল বুঝাবুঝি থাকতেই পারে। ফরজ হলো, সেগুলি মিটমাট করে নেয়া এবং ভাতৃত্বের বন্ধনকে বাঁচিয়ে রাখা। এবং হারাম হলো ভাতৃত্বের বন্ধনকে ছিন্ন করা এবং মিটমাট না করে সে মতভেদ ও ভুল বুঝাবুঝিকে সংঘাতের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। উপরিউক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, মিটমাট করে নেয়াটি ঈমানদারী ও তাকওয়ার পথ। সেটি মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে রহমতপ্রাপ্তির পথ। অপর দিকে ভাইদের  মাঝে সংঘাতের পথটি আযাবের পথ।  পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমদের মাঝে সে প্যান ইসলামী চেতনা ও ভাতৃত্বের বন্ধন বেঁচে নাই। সে ছিন্ন বন্ধনটি দৃশ্যমান হয় মুসলিম উম্মাহর ৫০ টির বেশী টুকরোয় বিভক্ত মানচিত্র দেখে। শুধু তাই নয়, বিভক্ত মানচিত্র বাঁচানোর অঙ্গীকার নিয়ে বাঁচাই প্রতি দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধবিগ্রহে প্রচণ্ড দেশপ্রেম গণ্য হয়। এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হয় এ বিভক্ত মানচিত্রের অবকাঠামো ভেঙে একতা গড়ার রাজনীতি। একতার তাড়নাটি গাদ্দারী গণ্য হয় নিজ দেশের স্বাধীনতার সাথে।

 

 

বিভক্তি ও বেঈমানীর রাজনৈতিক সংস্কৃতি

 

সত্য তো এটাই, বিভক্তি নিয়ে বাঁচাই মুসলিমদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘকাল যাবত তারা বাঁচছে নিজ দেশের ভূগোল ক্ষুদ্রতর করার রাজনীতি নিয়ে। এ রাজনীতি হলো শয়তান ও তার খলিফাদের খুশি করার রাজনীতি। এটি তো বিশুদ্ধ বেঈমানীর সংস্কৃতি। যারা প্রকৃত ঈমানদার তাদের চিত্তে এ বিভক্তি নিয়ে মাতম উঠবে -সেটিই তো কাঙ্খিত। কারণ আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন বিভক্তি। বেঈমানীর রাজনীতির পথ ধরেই আরব জাতীয়তাবাদীগণ খেলাফত ভেঙেছে। এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদীগণ ভেঙেছে পাকিস্তান। এবং সেটি কাফিরদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে। মহান রব কি তাতে খুশি হতে পারেন? অথচ মুসলিমদের অতীত গৌরবের অন্যতম কারণ, তাদের প্যান ইসলামী ভাতৃত্ব, একতা এবং বিশাল ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র। নানা ভাষা, নানা অঞ্চল ও নানা বর্ণের জনগণ সে বিশাল মানচিত্রে মিলে মিশে বাস করেছে। যেখানে ইচ্ছা, সেখানে তারা ঘর বেঁধেছে। এক ভাষার মানুষ অন্য ভাষার মানুষের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়েছে। ফলে বড় বড় শহরগুলি গড়ে উঠেছে মিশ্র জনবসতি নিয়ে।

 

মুসলিমদের মনের মানচিত্রকে খণ্ডিত করেছে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, গোত্রবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদের ন্যায় জাহিলী মতবাদ। তাতে মুসলিম ভূমিতে বেড়েছে সংকীর্ণ মনের অসভ্য মানুষের সংখ্যা -যারা বাঁচে অন্য বর্ণ, অন্য ভাষা ও অন্য অঞ্চলের মানুষের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে। এসব ক্ষুদ্র মনের মানুষের কারণেই খণ্ডিত হয়েছে মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র। ছোট মনের এ জীবদের পক্ষে অসম্ভব হলো ঈমানদার হওয়া। কারণ, ঈমান কখনোই বিষাক্ত জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, গোত্রবাদী ও আঞ্চলিকতাবাদী চেতনায় বাঁচে না। ঈমানদার তো তারাই যাদের মনটি বড় এবং মহৎ। যারা সামর্থ্য রাখে ভিন ভাষা, ভিন বর্ণ ও ভিন অঞ্চলের মুসলিমকে ভাই বলে আপন করে নেয়ার। কিন্তু যারা শুধু মুখের ভাষা, গায়ের রং এবং জন্মস্থান ভিন্ন হওয়ার কারণে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণে নামে -তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? এমন কাণ্ডকে কি কখনো সভ্য কাণ্ড বলা যায়? সেটি তো নিরেট বেঈমানী ও অসভ্যতা।  ১৯৭১’য়ে বাঙালি মুসলিম জীবনে সে বেঈমানী ও অসভ্যতা প্রকট ভাবে দেখা গেছে বিহারি হত্যা, বিহারি মহিলাদের ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ি দখল করার মাঝে।  ভাষা, বর্ণ ও জাত-পাতের ভিন্নতা সত্ত্বেও ভারতীয় পৌত্তলিকগণ যেরূপ ঐক্যবদ্ধ বিশাল ভারত গড়েছে -সে সামর্থ্য আরব মুসলিমগণ দেখাতে পারিনি। দেখাতে পারিনি বাঙালি মুসলিমগণও। এখানেই মুসলিমদের পশ্চাৎ পদতা। তাই বিশ্ববাসীর সামনে যে ইজ্জত ও স্বাধীনতা ভারতের রয়েছে -তা আরবদের যেমন নাই, নাই বাঙালি মুসলিমদেরও। যারা ভাঙার পথ বেছে নেয়, এ বিশ্বে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত কখনোই তাদের জন্য নয়। তাদের জন্য তো পরাজয়, পরাধীনতা ও বেইজ্জতি। সেটি শুধু ইতিহাসের নিয়ম নয়, সেটি মহান আল্লাহ তায়ালার বিধানও।

 

স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাসের কোন সহজ রাস্তা নাই। এগুলি কারো করুণার বিষয় নয়;  নিজ গুণে ও নিজ চেষ্টায় সেগুলি অর্জন করতে হয়। মুসলিমগণ যতদিন ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে এক বৃহৎ ভূগোলে একতাবদ্ধ ভাবে বসবাসের সামর্থ্য অর্জন না করবে ততদিন স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাসের বাসনা স্রেফ স্বপ্নই থেকে যাবে। পবিত্র কুর’আনের দৃষ্টিতে কলহ ও বিভক্তি নিয়ে বাঁচাই সবচেয়ে বড় পশ্চাদপদতা এবং সবচেয়ে বড় অসভ্যতা। এ পথটি বিদ্রোহ ও কুফুরির। তখন জাতীয় আয় বহু গুণ বাড়িয়েও স্বাধীনতা ও ইজ্জত জুটবে না। মাথাপিছু আয় বিশাল হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, কুয়েতকে তাই স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভিখারি হতে হয়। অথচ সে বিপর্যয় ও অসহায় অবস্থা থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহ তায়ালা একতাকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন। সে একতার নীতি গ্রহণ করেছে পৌত্তলিক ভারত, খৃষ্টান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বহু জাতিক রাশিয়া এবং চীন। অথচ মুসলিমগণ সে সভ্য ও ভদ্র নীতি বহু আগেই পরিহার করেছে এবং বিভক্তির অসভ্য পথ বেছে নিয়েছে। তাই ভাষা ও ভূগোল এক হওয়া সত্ত্বেও আরবগণ ২২ রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বিভক্তি গড়াকে হারাম করেছেন; কিন্তু তাঁর সে হুশিয়ারিতে মুসলিমগণ কর্ণপাত করেনি। বরং বিভেদ গড়তে বেছে নিয়েছে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদের হারাম মতবাদী রাজনীতিকে। এভাবে বেছে নিয়েছে আযাবের পথ এবং অসম্ভব করেছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। ২০/০৬/২০২৬

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

thedailysarkar

দৈনিক সরকার পত্রিকা ১৯৯১ সাল হতে ঢাকা হতে প্রকাশিত হচ্ছে।

https://www.facebook.com/obaidul1991

স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সংকট দুর করতে রাষ্টধর্ম ইসলামের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পরিচিত ও পরিচালিত করতে হবে

Update Time : ০৮:৫১:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

ভূগোল বদলাতে হবে

 

স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে হলে মুসলিম উম্মাহকে অবশ্যই তাদের ভূগোল বদলাতে হবে। বিভক্তির দেয়াল ভেঙে একতা গড়তে হবে। এটি স্রেফ রাজনীতি নয়, এটিই মহান আল্লাহর বিধান। একতা মহান রব’য়ের প্রতিশ্রুত রহমত আনে; বিভক্তি আনে প্রতিশ্রুত আযাব। বিভক্তি থেকে না বাঁচলে সম্পদে ও জনবলে শত গুণ বৃদ্ধি এনেও কোন লাভ হবে না। কারণ, বিভক্ত মানচিত্র অসম্ভব করে স্বাধীনতা ও ইজ্জত নিয়ে বাঁচা। ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো, বৃহৎ ভূগোলের বিকল্প নাই। ক্ষুদ্র ভূগোলের অর্থই শক্তিহীনতা ও পরাধীনতা। মুসলিম উম্মাহর আজকের শক্তিহীনতার মূল কারণ জনশক্তি বা সম্পদের কমতি নয়।  বরং সেটি হলো, বিভক্ত মানচিত্র। এজন্যই ইসলাম অতীতে শুধু বিশাল এলাকার জনগণের ধর্ম তথা মনের মানচিত্র পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রও। এটিই নবীজী (সা:)’য়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সূন্নত।  রাষ্ট্রের ভূগোলে লাগাতর বৃদ্ধি আনাই ছিল তাঁর সূন্নত। খোলাফায়ে রাশেদা সে সূন্নতকে অব্যাহত রেখেছিলেন। অপর দিকে নিজ দেশকে খণ্ডিত করাটি হলো শয়তানকে খুশি করার পথ। সেটি পরাজয়, পরাধীনতা ও বেইজ্জতির পথ।

 

মুসলিম উম্মাহর বিভক্ত ভূগোলের মধ্যে দিয়ে দৃশ্যমান হয় মহান রব’য়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বেঈমানী -যেমন প্রবল বিদ্রোহ ও বেঈমানী প্রকাশ পায় শরিয়াশূণ্য আদালত, পতিতা পল্লী, সূদী অর্থনীতি এবং দুর্নীতির প্লাবনে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশেই সেটিই এখন রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি। অপর দিকে একতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মহান রব’য়ের প্রতি বলিষ্ঠ ঈমান, তাঁর হুকুমের প্রতি গভীর আনুগত্য। এবং তাতে প্রকাশ পায় অপর মুসলিমের প্রতি গভীর ভাতৃত্ব। প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায় হলো, তাকে বাঁচতে হয় সে প্যান ইসলামী ভাতৃত্ব নিয়ে। মহান রব তাই শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত ফরজ করেননি, ফরজ  করেছেন সে ভাতৃত্বকেও। সে হুকুম এসেছে নিচের আয়াতে:

 

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

 

অর্থ: “মুমিনরা হলো পরস্পরে ভাই ভাই। অতএবতোমরা তোমাদের ভাইয়ের মধ্যে মিটমাট রে নিবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে -যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।”-(সুরা হুজরাত, আয়াত ১০)।

 

ভাইদের মধ্যে মতভেদ, বিরোধ, ভুল বুঝাবুঝি থাকতেই পারে। ফরজ হলো, সেগুলি মিটমাট করে নেয়া এবং ভাতৃত্বের বন্ধনকে বাঁচিয়ে রাখা। এবং হারাম হলো ভাতৃত্বের বন্ধনকে ছিন্ন করা এবং মিটমাট না করে সে মতভেদ ও ভুল বুঝাবুঝিকে সংঘাতের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। উপরিউক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, মিটমাট করে নেয়াটি ঈমানদারী ও তাকওয়ার পথ। সেটি মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে রহমতপ্রাপ্তির পথ। অপর দিকে ভাইদের  মাঝে সংঘাতের পথটি আযাবের পথ।  পরিতাপের বিষয় হলো, মুসলিমদের মাঝে সে প্যান ইসলামী চেতনা ও ভাতৃত্বের বন্ধন বেঁচে নাই। সে ছিন্ন বন্ধনটি দৃশ্যমান হয় মুসলিম উম্মাহর ৫০ টির বেশী টুকরোয় বিভক্ত মানচিত্র দেখে। শুধু তাই নয়, বিভক্ত মানচিত্র বাঁচানোর অঙ্গীকার নিয়ে বাঁচাই প্রতি দেশের রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও যুদ্ধবিগ্রহে প্রচণ্ড দেশপ্রেম গণ্য হয়। এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হয় এ বিভক্ত মানচিত্রের অবকাঠামো ভেঙে একতা গড়ার রাজনীতি। একতার তাড়নাটি গাদ্দারী গণ্য হয় নিজ দেশের স্বাধীনতার সাথে।

 

 

বিভক্তি ও বেঈমানীর রাজনৈতিক সংস্কৃতি

 

সত্য তো এটাই, বিভক্তি নিয়ে বাঁচাই মুসলিমদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘকাল যাবত তারা বাঁচছে নিজ দেশের ভূগোল ক্ষুদ্রতর করার রাজনীতি নিয়ে। এ রাজনীতি হলো শয়তান ও তার খলিফাদের খুশি করার রাজনীতি। এটি তো বিশুদ্ধ বেঈমানীর সংস্কৃতি। যারা প্রকৃত ঈমানদার তাদের চিত্তে এ বিভক্তি নিয়ে মাতম উঠবে -সেটিই তো কাঙ্খিত। কারণ আল্লাহ তায়ালা হারাম করেছেন বিভক্তি। বেঈমানীর রাজনীতির পথ ধরেই আরব জাতীয়তাবাদীগণ খেলাফত ভেঙেছে। এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদীগণ ভেঙেছে পাকিস্তান। এবং সেটি কাফিরদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে। মহান রব কি তাতে খুশি হতে পারেন? অথচ মুসলিমদের অতীত গৌরবের অন্যতম কারণ, তাদের প্যান ইসলামী ভাতৃত্ব, একতা এবং বিশাল ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র। নানা ভাষা, নানা অঞ্চল ও নানা বর্ণের জনগণ সে বিশাল মানচিত্রে মিলে মিশে বাস করেছে। যেখানে ইচ্ছা, সেখানে তারা ঘর বেঁধেছে। এক ভাষার মানুষ অন্য ভাষার মানুষের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়েছে। ফলে বড় বড় শহরগুলি গড়ে উঠেছে মিশ্র জনবসতি নিয়ে।

 

মুসলিমদের মনের মানচিত্রকে খণ্ডিত করেছে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, গোত্রবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদের ন্যায় জাহিলী মতবাদ। তাতে মুসলিম ভূমিতে বেড়েছে সংকীর্ণ মনের অসভ্য মানুষের সংখ্যা -যারা বাঁচে অন্য বর্ণ, অন্য ভাষা ও অন্য অঞ্চলের মানুষের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে। এসব ক্ষুদ্র মনের মানুষের কারণেই খণ্ডিত হয়েছে মুসলিম উম্মাহর ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র। ছোট মনের এ জীবদের পক্ষে অসম্ভব হলো ঈমানদার হওয়া। কারণ, ঈমান কখনোই বিষাক্ত জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, গোত্রবাদী ও আঞ্চলিকতাবাদী চেতনায় বাঁচে না। ঈমানদার তো তারাই যাদের মনটি বড় এবং মহৎ। যারা সামর্থ্য রাখে ভিন ভাষা, ভিন বর্ণ ও ভিন অঞ্চলের মুসলিমকে ভাই বলে আপন করে নেয়ার। কিন্তু যারা শুধু মুখের ভাষা, গায়ের রং এবং জন্মস্থান ভিন্ন হওয়ার কারণে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণে নামে -তাদেরকে কি ঈমানদার বলা যায়? এমন কাণ্ডকে কি কখনো সভ্য কাণ্ড বলা যায়? সেটি তো নিরেট বেঈমানী ও অসভ্যতা।  ১৯৭১’য়ে বাঙালি মুসলিম জীবনে সে বেঈমানী ও অসভ্যতা প্রকট ভাবে দেখা গেছে বিহারি হত্যা, বিহারি মহিলাদের ধর্ষণ ও তাদের ঘরবাড়ি দখল করার মাঝে।  ভাষা, বর্ণ ও জাত-পাতের ভিন্নতা সত্ত্বেও ভারতীয় পৌত্তলিকগণ যেরূপ ঐক্যবদ্ধ বিশাল ভারত গড়েছে -সে সামর্থ্য আরব মুসলিমগণ দেখাতে পারিনি। দেখাতে পারিনি বাঙালি মুসলিমগণও। এখানেই মুসলিমদের পশ্চাৎ পদতা। তাই বিশ্ববাসীর সামনে যে ইজ্জত ও স্বাধীনতা ভারতের রয়েছে -তা আরবদের যেমন নাই, নাই বাঙালি মুসলিমদেরও। যারা ভাঙার পথ বেছে নেয়, এ বিশ্বে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত কখনোই তাদের জন্য নয়। তাদের জন্য তো পরাজয়, পরাধীনতা ও বেইজ্জতি। সেটি শুধু ইতিহাসের নিয়ম নয়, সেটি মহান আল্লাহ তায়ালার বিধানও।

 

স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাসের কোন সহজ রাস্তা নাই। এগুলি কারো করুণার বিষয় নয়;  নিজ গুণে ও নিজ চেষ্টায় সেগুলি অর্জন করতে হয়। মুসলিমগণ যতদিন ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে এক বৃহৎ ভূগোলে একতাবদ্ধ ভাবে বসবাসের সামর্থ্য অর্জন না করবে ততদিন স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ইজ্জত নিয়ে বসবাসের বাসনা স্রেফ স্বপ্নই থেকে যাবে। পবিত্র কুর’আনের দৃষ্টিতে কলহ ও বিভক্তি নিয়ে বাঁচাই সবচেয়ে বড় পশ্চাদপদতা এবং সবচেয়ে বড় অসভ্যতা। এ পথটি বিদ্রোহ ও কুফুরির। তখন জাতীয় আয় বহু গুণ বাড়িয়েও স্বাধীনতা ও ইজ্জত জুটবে না। মাথাপিছু আয় বিশাল হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, কুয়েতকে তাই স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভিখারি হতে হয়। অথচ সে বিপর্যয় ও অসহায় অবস্থা থেকে বাঁচাতেই মহান আল্লাহ তায়ালা একতাকে ফরজ করেছেন এবং বিভক্তিকে হারাম করেছেন। সে একতার নীতি গ্রহণ করেছে পৌত্তলিক ভারত, খৃষ্টান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বহু জাতিক রাশিয়া এবং চীন। অথচ মুসলিমগণ সে সভ্য ও ভদ্র নীতি বহু আগেই পরিহার করেছে এবং বিভক্তির অসভ্য পথ বেছে নিয়েছে। তাই ভাষা ও ভূগোল এক হওয়া সত্ত্বেও আরবগণ ২২ রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা বিভক্তি গড়াকে হারাম করেছেন; কিন্তু তাঁর সে হুশিয়ারিতে মুসলিমগণ কর্ণপাত করেনি। বরং বিভেদ গড়তে বেছে নিয়েছে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদের হারাম মতবাদী রাজনীতিকে। এভাবে বেছে নিয়েছে আযাবের পথ এবং অসম্ভব করেছে ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ। ২০/০৬/২০২৬