০৯:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬

মুসলিম উম্মাহর বিপর্যয় ও ঈমানী দায়

মতামত
  • Update Time : ০১:০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
  • / ১৮৬ Time View

মুসলিমদের আজকের বিপর্যয়ের মূল কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে চরম ব্যর্থতা। কুর’আন হাদীস আজ ঘরে ঘরে বেঁচে থাকলেও সমগ্র মুসলিম জাহানে কোন ইসলামী রাষ্ট্র বেঁচে নাই। প্রায় সবগুলি মুসলিম রাষ্ট্র অধিকৃত হয়ে গেছে ইসলামের শত্রু-শক্তির হাতে। দেশে দেশে রাষ্ট্রীয় শক্তিকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করা হচ্ছে মুসলিমদের বিভক্ত রাখা, শরিয়াকে বিলুপ্ত রাখা এবং ইসলামের এজেন্ডাকে পরাজিত রাখার কাজে। আজকের মুসলিমদের পতন ও বিপর্যয়ের মূল কারণ এটিই। চোর-ডাকাতদের হাতে ঘরবাড়ি অধিকৃত হলে এতো বড় ক্ষতি হয় না। কারণ তখনও ঈমান বেঁচে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র যখন দুর্বৃত্ত জাহেলদের হাতে অধিকৃত হলে তখন জনগণকে পূর্ণ ঈমান নিয়ে বাঁচতে দেয়া হয় না। তখন অসম্ভব করা হয় পূর্ণ ইসলাম পালন। পূর্ণ ইসলাম পালনের জন্য অপরিহার্য হলো ইসলামী রাষ্ট্র।

ঈমান বিলুপ্তির শয়তানী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের নামে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা দিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কাজ করে ছাত্রদের চেতনার ভূমিতে বিষ ঢালার ক্ষেত্র রূপে। ফলে বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে যারা জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, সেক্যুলারিজম, কম্যুনিজমের ন্যায় হারাম মতবাদের স্রোতে ভেসে গেছে তারা গ্রামের নিরক্ষর জনগণ নয়, বরং দেশের এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারীরা। ডিগ্রিপ্রাপ্ত এই বদমায়েশগণ বাংলাদেশকে দুর্বৃত্তিতে ৫ বার প্রথম স্থানে পৌছে দিয়েছে। বদমায়েশ তো তারাই যাদের মায়েশ তথা জীবিকা হলো বদ তথা হারাম। সরকারি প্রশাসনে থাকা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এ দুর্বৃত্তগণ একটি সুষ্ঠ নির্বাচনও দিতে পারে না। গণতন্ত্রের বদলে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে বদমায়েশতন্ত্র। গণতন্ত্রে সরকার নির্বাচিত হয় জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য। আর বদমায়েশতন্ত্র সরকার নির্বাচিত হয় বদমায়েশদের দ্বারা বদমায়েশদের জন্য।   

অনৈসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম বড় নাশকতা হলো, পূর্ণ ইসলাম-পালনকে অসম্ভব করে আদালতে শরিয়ার বিচারকে অসম্ভব করে। অথচ শরিয়া পালন না করলে মুসলিম শুধু নামেই মুসলিম থেকে যায়, মহান রব’য়ের খাতায় সে কাফির, জালিম ও ফাসিকের খেতাব পায় -যার ঘোষণা এসেছে সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে। অথচ বাংলাদেশে শরিয়া নিষিদ্ধ। মুসলিমদের মাঝে ঈমান তার সুস্থতা নিয়ে বেঁচে থাকলে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়া বিধানের এমন বিলুপ্তিতে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে তুমুল জিহাদ শুরু হতো। শুধু তাই নয়, শুরু হতো ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতার নামে গড়া বিভক্ত মানচিত্রের দেয়াল ভাঙার কাজ। কারণ মুসলিম উম্মাহর দেহে বিভক্তি গড়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো বিভক্তি বাঁচিয়ে রাখাও। অথচ বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে বাঁচা মুসলিমদের রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বিভক্ত ভূগোল গড়ার দিনগুলিকে তারা জাতীয় উৎসবের দিন বানিয়েছে। অথচ এরূপ বিভক্তি নিয়ে বাঁচার মধ্যে দৃশ্যমান হয় বেঈমানী। এবং একতার মাঝে প্রকাশ ঘটে ঈমানদারীর।

মুসলিম উম্মাহর এই ভূ-রাজনৈতিক বিভক্তির কারণ, মুসলিম ভূমিতে শাসন চলছে শয়তানের খলিফাদের। শয়তান মুসলিমদের মাঝে যেমন বেঈমানী চায়, তেমনি বিভক্তিও চায়। চায়, নিষিদ্ধ হোক শরিয়া এবং সিদ্ধ হোক পতিতাপল্লী, মদ ব্যবসা ও জুয়ার ব্যবসা। এবং শয়তান চায়, দেশে মোল্লা-মৌলভীগণ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ ছেড়ে ফিরকাগত কলহ বিবাদে ব্যস্ত থাকুক এবং একে অপরকে কাফির বলুক। বাংলাদেশে শয়তান এক্ষেত্রে শত ভাগ সফল। শয়তানের অনুসারীদের বিজয় উৎসব তাই প্রতিদিন। শয়তানের খলিফাদের দখলদারির বিরুদ্ধে জিহাদ যে এখনো শুরু হয়নি -সেটিই প্রমাণ করে বেশির ভাগ মানুষের মাঝে ঈমান তার পূর্ণতা বা সুস্থতা নিয়ে বেঁচে নাই। আগুনের অস্তিত্ব বুঝা যায় তার উত্তাপে। তেমনি ব্যক্তির মাঝে ঈমানের উপস্থিতি বুঝা যায় মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে জিহাদ দেখে।

মাছ যেমন জলাশয় ছাড়া বাঁচে না, ঈমানদারের ঈমান ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া বাঁচে না। এ কারণেই অতীতে মুসলিমগণ যেখানে ঘর গড়েছে, সেখানে অবশ্যই ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র শুধু মুসলিমদের স্বাধীনতা ও জান-মালের নিরাপত্তা দেয় না, নিরাপত্তা দেয় তাদের ঈমানের ভূমিকেও। সেটি কুর’আনী জ্ঞানসমৃদ্ধ শিক্ষা ব্যবসথার মাধ্যমে। মুসলিমদের গৌরব কালে সেরূপ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় ও প্রতিরক্ষায় যখনই ডাক পড়েছে তখন সকল মুসলিম রণাঙ্গনে নেমে এসেছে এবং জানমালের বিশাল কুরবানীও পেশ করেছে। যারা জিহাদে নামেনি তাদের মুনাফিক বলা হয়েছে। এটিই ইসলামের ইতিহাস। তাই তাবুক যুদ্ধের সময় কিছু মুনাফিক ছাড়া কোন সামর্থ্যবান মুসলিম পুরুষ ঘরে বসে ছিল না। অন্য কোন জাতির জীবনে এমন ইতিহাস একটি বারের জন্যও নির্মিত হয়নি। মুসলিমের জীবনে এটিই হলো সর্বোচ্চ দায়। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে এবং সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার কাজে পূর্ণ দায়িত্বশীল হওয়ার মাঝেই প্রকৃত ঈমানদারী।

মুসলিম জীবনে ঈমান ও জিহাদ একত্রে বাঁচে। ঈমান মারা গেলে জিহাদও মারা যায়। শয়তান ও তার অনুসারীগণ সেটি জানে। তাই জিহাদের বিলুপ্তি ঘটানোর লক্ষ্যে তারা প্রথমে ঈমানের বিলুপ্তি ঘটায়। ঈমানের বিলুপ্তি ঘটানোর কাজটি সহজ। পানি বন্ধ করলে যেমন ক্ষেতের ফসল মারা যায়, তেমনি কুর’আনী জ্ঞানদান বন্ধ হলে মারা যায় ঈমান। শয়তান সেটি জানে। তাই শয়তানের অনুসারীগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেলে স্কুলে কুর’আন শিক্ষা প্রথমে বন্ধ করে। ব্রিটিশগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেয়ে তাই প্রথম মুসলিমদের মাদ্রাসাগুলি বন্ধ করেছিল এবং ইসলামমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিল। মুসলিম শাসনামলের দেশের প্রায় ৫ ভাগের এক ভাগ জমি বরাদ্দ থাকতো মসজিদ-মাদ্রাসা চালানোর জন‌্য, কিন্তু ইংরেজরা সে জমি কেড়ে নিয়ে হিন্দু জমিদারদের দেয়।

অনৈসলামী দেশে শয়তানের এজেন্ডাই হলো রাষ্ট্রের এজেন্ডা। এমন দেশে জনগণ ও ছাত্র-ছাত্রীদের চেতনার ভূমিতে বিষ প্রয়োগের কাজে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তি। অনৈসলামি রাষ্ট্রের এটিই হলো সবচেয়ে ভয়ানক নাশকতা। সে নাশকতার পরিমাপটি বুঝা যায় নামাজী ও রোজাদারেদের জীবন থেকে ঈমানদারসুলভ দায়িত্বশীলতার বিলুপ্তি দেখে। পরিতাপের বিষয় হলো, ব্রিটিশ শাসন শেষ হলেও বাংলাদেশের ন্যায় ব্রিটিশদের সাবেক কলোনী গুলিতে এখনো বেঁচে আছে ব্রিটিশ কাফিরদের প্রণীত শিক্ষানীতি। ফলে মুসলিমগণ ব্যর্থ হচ্ছে পূর্ণ ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠতে। তারা নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ নিয়ে বাঁচলেও সত্যিকার ঈমান ও জিহাদ নিয়ে বাঁচে না। তখন জিহাদ থেকে দূরে থাকাটি তাদের জীবনে স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। জিহাদ তাদের কাছে উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস মনে হয়। এবং এ যুগের অচল বিষয় মনে হয় ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়া।

তাই যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র নাই, সেখানে মসজিদ-মাদ্রাসা, নামাজ-রোজা বিপুল ভাবে বাড়লেও সে ঈমানী দায়িত্বশীলতা বাড়ে না। বাড়ে না মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার সাথে সম্পৃক্ততা। সংগঠিত হয় না জিহাদ। তখন নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও নিয়মিত কুর’আন পাঠ করেও নিষ্ক্রিয় ও নীরব থাকাটিই স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। তবে তাদের জীবনে যুদ্ধ এবং সে যুদ্ধে অর্থদান ও রক্তদান যে নাই -তা নয়। তারা যুদ্ধ করে; সে যুদ্ধে অর্থদান এবং রক্তদানও করে। তবে সেগুলি করে জাতি, গোত্র, ভাষা, ভূগোল, দল ও নেতার নামে; কখনোই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নয়। ১৯৭১’য়ে বাঙালি মুসলিমগণ পৌত্তলিক ভারতের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে কি কম রক্ত দিয়েছে? কিন্তু এ অবধি আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তার আইনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে তারা একটি বারের জন্যও ময়দানে নামেনি। সাহাবায়ে কেরামের ধর্মপালন থেকে বাঙালি মুসলিমের ধর্মপালনে এখানেই বড় পার্থক্য।

মুসলিমদের এরূপ ব্যর্থতার কারণে মুসলিম বিশ্বে রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়লেও একখানি ইসলামী রাষ্ট্রও নির্মিত হয়নি। ফলে কোথাও প্রতিষ্ঠা পায়নি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়া বিধান। এটি কি কম বিস্ময় যে, মুসলিম দেশে ইজ্জত পায়নি মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইন। বরং মুসলিমদের শ্রম, মেধা, রাজস্ব ও রক্তের কুরবানীতে বিজয়ীর বেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে জাতীয়তাবাদী বর্বর ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদ, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, সেক্যুলারিজমের ন্যায় নানা নামের ও নানা জাতের জাহিলিয়াত। এভাবেই মহান রব’য়ের ভূমিতে গৌরব বেড়েছে নানা দল, নানা গোত্র ও নানা কর্তৃত্ববাদী নেতার। এভাবেই বিজয় বেড়েছে শয়তানের। আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় বেঈমানি আর কি হতে পারে?

মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সরকারের কাজ হয়েছে জনগণের মাঝে সে বেঈমানিকে আরো তীব্রতর করা। মুসলিম ভূমিতে অনৈসলামি রাষ্ট্র বেঁচে আছে বস্তুত সে বেঈমানির উপর। এটি যে নিশ্চিত জাহান্নামের পথ -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? যাদের হৃদয়ে ঈমান কিছুটা হলেও এখনো বেঁচে আছে, মহান আল্লাহতায়ালার এবং তাঁর দ্বীনের এরূপ অসম্মান নিয়ে তাদের হৃদয়ে ক্রন্দন হওয়া উচিত। এবং সর্ব সামর্থ্য নিয়ে লিপ্ত হওয়া উচিত ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে। ইসলামী রাষ্ট্র যেমন অতীতে মুসলিমদের বিশ্বশক্তির মর্যাদা দিয়েছিল, সে মর্যাদা আজও দিতে পারে। প্রেসক্রিপশন তো তখনই কাজ দেয় যখন সেটিকে কাজে লাগানো হয়। তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে নবীজী (সা:)‌’য়ের যে মহান সূন্নত -সেটি তো তখনই কাজ দিবে যখন সেটির সঠিক অনুসরণ হবে। চলমান এ বিপর্যয় থেকে মুক্তির কি এছাড়া কোন ভিন্ন পথ আছে?  

ইসলাম গড়তে বলে এবং ভাঙাকে হারাম বলে। অথচ ডিগ্রিপ্রাপ্ত বাঙালি দুর্বৃত্তগণ ভাঙাকে গর্বের বিষয় বানিয়েছে। শয়তানের এজেন্ডাই তাদের এজেন্ডা। তাদের হাতে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নাশকতার সবচেয়ে বড় কাণ্ডটি হলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র এবং সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধ। এবং সেটি ভারতের পৌত্তলিক কাফিরদের সাথে নিয়ে। কোন মুসলিম ভূমিতে পৌত্তলিক কাফিরদের সেটিই হলো তাদের ইতিহাসের বড় বিজয়। তবে পাকিস্তান ভেঙে তারা খুশি হয়নি। বাংলাদেশকে ভারতের গোলাম এবং দুর্বৃত্তিতে ৫ বার শীর্ষে পৌছে দিয়েও তারা খুশি হয়নি। শয়তানের এ খলিফাগণ এখন বাংলাদেশকেই ধ্বংস করতে চায়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগকে এরা রুখতে চায়। কোন ঈমানদার কি এ মুহুর্তে নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে? নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা হবে নিরেট মুনাফিকি।

 

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

thedailysarkar

দৈনিক সরকার পত্রিকা ১৯৯১ সাল হতে ঢাকা হতে প্রকাশিত হচ্ছে।

মুসলিম উম্মাহর বিপর্যয় ও ঈমানী দায়

Update Time : ০১:০৭:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬

মুসলিমদের আজকের বিপর্যয়ের মূল কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে চরম ব্যর্থতা। কুর’আন হাদীস আজ ঘরে ঘরে বেঁচে থাকলেও সমগ্র মুসলিম জাহানে কোন ইসলামী রাষ্ট্র বেঁচে নাই। প্রায় সবগুলি মুসলিম রাষ্ট্র অধিকৃত হয়ে গেছে ইসলামের শত্রু-শক্তির হাতে। দেশে দেশে রাষ্ট্রীয় শক্তিকে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করা হচ্ছে মুসলিমদের বিভক্ত রাখা, শরিয়াকে বিলুপ্ত রাখা এবং ইসলামের এজেন্ডাকে পরাজিত রাখার কাজে। আজকের মুসলিমদের পতন ও বিপর্যয়ের মূল কারণ এটিই। চোর-ডাকাতদের হাতে ঘরবাড়ি অধিকৃত হলে এতো বড় ক্ষতি হয় না। কারণ তখনও ঈমান বেঁচে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্র যখন দুর্বৃত্ত জাহেলদের হাতে অধিকৃত হলে তখন জনগণকে পূর্ণ ঈমান নিয়ে বাঁচতে দেয়া হয় না। তখন অসম্ভব করা হয় পূর্ণ ইসলাম পালন। পূর্ণ ইসলাম পালনের জন্য অপরিহার্য হলো ইসলামী রাষ্ট্র।

ঈমান বিলুপ্তির শয়তানী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের নামে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা দিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কাজ করে ছাত্রদের চেতনার ভূমিতে বিষ ঢালার ক্ষেত্র রূপে। ফলে বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে যারা জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, সেক্যুলারিজম, কম্যুনিজমের ন্যায় হারাম মতবাদের স্রোতে ভেসে গেছে তারা গ্রামের নিরক্ষর জনগণ নয়, বরং দেশের এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রিধারীরা। ডিগ্রিপ্রাপ্ত এই বদমায়েশগণ বাংলাদেশকে দুর্বৃত্তিতে ৫ বার প্রথম স্থানে পৌছে দিয়েছে। বদমায়েশ তো তারাই যাদের মায়েশ তথা জীবিকা হলো বদ তথা হারাম। সরকারি প্রশাসনে থাকা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এ দুর্বৃত্তগণ একটি সুষ্ঠ নির্বাচনও দিতে পারে না। গণতন্ত্রের বদলে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে বদমায়েশতন্ত্র। গণতন্ত্রে সরকার নির্বাচিত হয় জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য। আর বদমায়েশতন্ত্র সরকার নির্বাচিত হয় বদমায়েশদের দ্বারা বদমায়েশদের জন্য।   

অনৈসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম বড় নাশকতা হলো, পূর্ণ ইসলাম-পালনকে অসম্ভব করে আদালতে শরিয়ার বিচারকে অসম্ভব করে। অথচ শরিয়া পালন না করলে মুসলিম শুধু নামেই মুসলিম থেকে যায়, মহান রব’য়ের খাতায় সে কাফির, জালিম ও ফাসিকের খেতাব পায় -যার ঘোষণা এসেছে সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতে। অথচ বাংলাদেশে শরিয়া নিষিদ্ধ। মুসলিমদের মাঝে ঈমান তার সুস্থতা নিয়ে বেঁচে থাকলে মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়া বিধানের এমন বিলুপ্তিতে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে তুমুল জিহাদ শুরু হতো। শুধু তাই নয়, শুরু হতো ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও আঞ্চলিকতার নামে গড়া বিভক্ত মানচিত্রের দেয়াল ভাঙার কাজ। কারণ মুসলিম উম্মাহর দেহে বিভক্তি গড়া যেমন হারাম, তেমনি হারাম হলো বিভক্তি বাঁচিয়ে রাখাও। অথচ বিভক্ত মানচিত্র নিয়ে বাঁচা মুসলিমদের রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বিভক্ত ভূগোল গড়ার দিনগুলিকে তারা জাতীয় উৎসবের দিন বানিয়েছে। অথচ এরূপ বিভক্তি নিয়ে বাঁচার মধ্যে দৃশ্যমান হয় বেঈমানী। এবং একতার মাঝে প্রকাশ ঘটে ঈমানদারীর।

মুসলিম উম্মাহর এই ভূ-রাজনৈতিক বিভক্তির কারণ, মুসলিম ভূমিতে শাসন চলছে শয়তানের খলিফাদের। শয়তান মুসলিমদের মাঝে যেমন বেঈমানী চায়, তেমনি বিভক্তিও চায়। চায়, নিষিদ্ধ হোক শরিয়া এবং সিদ্ধ হোক পতিতাপল্লী, মদ ব্যবসা ও জুয়ার ব্যবসা। এবং শয়তান চায়, দেশে মোল্লা-মৌলভীগণ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ ছেড়ে ফিরকাগত কলহ বিবাদে ব্যস্ত থাকুক এবং একে অপরকে কাফির বলুক। বাংলাদেশে শয়তান এক্ষেত্রে শত ভাগ সফল। শয়তানের অনুসারীদের বিজয় উৎসব তাই প্রতিদিন। শয়তানের খলিফাদের দখলদারির বিরুদ্ধে জিহাদ যে এখনো শুরু হয়নি -সেটিই প্রমাণ করে বেশির ভাগ মানুষের মাঝে ঈমান তার পূর্ণতা বা সুস্থতা নিয়ে বেঁচে নাই। আগুনের অস্তিত্ব বুঝা যায় তার উত্তাপে। তেমনি ব্যক্তির মাঝে ঈমানের উপস্থিতি বুঝা যায় মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে জিহাদ দেখে।

মাছ যেমন জলাশয় ছাড়া বাঁচে না, ঈমানদারের ঈমান ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া বাঁচে না। এ কারণেই অতীতে মুসলিমগণ যেখানে ঘর গড়েছে, সেখানে অবশ্যই ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র শুধু মুসলিমদের স্বাধীনতা ও জান-মালের নিরাপত্তা দেয় না, নিরাপত্তা দেয় তাদের ঈমানের ভূমিকেও। সেটি কুর’আনী জ্ঞানসমৃদ্ধ শিক্ষা ব্যবসথার মাধ্যমে। মুসলিমদের গৌরব কালে সেরূপ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় ও প্রতিরক্ষায় যখনই ডাক পড়েছে তখন সকল মুসলিম রণাঙ্গনে নেমে এসেছে এবং জানমালের বিশাল কুরবানীও পেশ করেছে। যারা জিহাদে নামেনি তাদের মুনাফিক বলা হয়েছে। এটিই ইসলামের ইতিহাস। তাই তাবুক যুদ্ধের সময় কিছু মুনাফিক ছাড়া কোন সামর্থ্যবান মুসলিম পুরুষ ঘরে বসে ছিল না। অন্য কোন জাতির জীবনে এমন ইতিহাস একটি বারের জন্যও নির্মিত হয়নি। মুসলিমের জীবনে এটিই হলো সর্বোচ্চ দায়। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে এবং সে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার কাজে পূর্ণ দায়িত্বশীল হওয়ার মাঝেই প্রকৃত ঈমানদারী।

মুসলিম জীবনে ঈমান ও জিহাদ একত্রে বাঁচে। ঈমান মারা গেলে জিহাদও মারা যায়। শয়তান ও তার অনুসারীগণ সেটি জানে। তাই জিহাদের বিলুপ্তি ঘটানোর লক্ষ্যে তারা প্রথমে ঈমানের বিলুপ্তি ঘটায়। ঈমানের বিলুপ্তি ঘটানোর কাজটি সহজ। পানি বন্ধ করলে যেমন ক্ষেতের ফসল মারা যায়, তেমনি কুর’আনী জ্ঞানদান বন্ধ হলে মারা যায় ঈমান। শয়তান সেটি জানে। তাই শয়তানের অনুসারীগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেলে স্কুলে কুর’আন শিক্ষা প্রথমে বন্ধ করে। ব্রিটিশগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে পেয়ে তাই প্রথম মুসলিমদের মাদ্রাসাগুলি বন্ধ করেছিল এবং ইসলামমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিল। মুসলিম শাসনামলের দেশের প্রায় ৫ ভাগের এক ভাগ জমি বরাদ্দ থাকতো মসজিদ-মাদ্রাসা চালানোর জন‌্য, কিন্তু ইংরেজরা সে জমি কেড়ে নিয়ে হিন্দু জমিদারদের দেয়।

অনৈসলামী দেশে শয়তানের এজেন্ডাই হলো রাষ্ট্রের এজেন্ডা। এমন দেশে জনগণ ও ছাত্র-ছাত্রীদের চেতনার ভূমিতে বিষ প্রয়োগের কাজে হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করে শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তি। অনৈসলামি রাষ্ট্রের এটিই হলো সবচেয়ে ভয়ানক নাশকতা। সে নাশকতার পরিমাপটি বুঝা যায় নামাজী ও রোজাদারেদের জীবন থেকে ঈমানদারসুলভ দায়িত্বশীলতার বিলুপ্তি দেখে। পরিতাপের বিষয় হলো, ব্রিটিশ শাসন শেষ হলেও বাংলাদেশের ন্যায় ব্রিটিশদের সাবেক কলোনী গুলিতে এখনো বেঁচে আছে ব্রিটিশ কাফিরদের প্রণীত শিক্ষানীতি। ফলে মুসলিমগণ ব্যর্থ হচ্ছে পূর্ণ ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠতে। তারা নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ নিয়ে বাঁচলেও সত্যিকার ঈমান ও জিহাদ নিয়ে বাঁচে না। তখন জিহাদ থেকে দূরে থাকাটি তাদের জীবনে স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। জিহাদ তাদের কাছে উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস মনে হয়। এবং এ যুগের অচল বিষয় মনে হয় ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়া।

তাই যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র নাই, সেখানে মসজিদ-মাদ্রাসা, নামাজ-রোজা বিপুল ভাবে বাড়লেও সে ঈমানী দায়িত্বশীলতা বাড়ে না। বাড়ে না মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডার সাথে সম্পৃক্ততা। সংগঠিত হয় না জিহাদ। তখন নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও নিয়মিত কুর’আন পাঠ করেও নিষ্ক্রিয় ও নীরব থাকাটিই স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়। তবে তাদের জীবনে যুদ্ধ এবং সে যুদ্ধে অর্থদান ও রক্তদান যে নাই -তা নয়। তারা যুদ্ধ করে; সে যুদ্ধে অর্থদান এবং রক্তদানও করে। তবে সেগুলি করে জাতি, গোত্র, ভাষা, ভূগোল, দল ও নেতার নামে; কখনোই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নয়। ১৯৭১’য়ে বাঙালি মুসলিমগণ পৌত্তলিক ভারতের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে কি কম রক্ত দিয়েছে? কিন্তু এ অবধি আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তার আইনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে তারা একটি বারের জন্যও ময়দানে নামেনি। সাহাবায়ে কেরামের ধর্মপালন থেকে বাঙালি মুসলিমের ধর্মপালনে এখানেই বড় পার্থক্য।

মুসলিমদের এরূপ ব্যর্থতার কারণে মুসলিম বিশ্বে রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়লেও একখানি ইসলামী রাষ্ট্রও নির্মিত হয়নি। ফলে কোথাও প্রতিষ্ঠা পায়নি মহান আল্লাহতায়ালার শরিয়া বিধান। এটি কি কম বিস্ময় যে, মুসলিম দেশে ইজ্জত পায়নি মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর আইন। বরং মুসলিমদের শ্রম, মেধা, রাজস্ব ও রক্তের কুরবানীতে বিজয়ীর বেশে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে জাতীয়তাবাদী বর্বর ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদ, রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, সেক্যুলারিজমের ন্যায় নানা নামের ও নানা জাতের জাহিলিয়াত। এভাবেই মহান রব’য়ের ভূমিতে গৌরব বেড়েছে নানা দল, নানা গোত্র ও নানা কর্তৃত্ববাদী নেতার। এভাবেই বিজয় বেড়েছে শয়তানের। আল্লাহতায়ালা ও তাঁর দ্বীনের বিরুদ্ধে এর চেয়ে বড় বেঈমানি আর কি হতে পারে?

মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সরকারের কাজ হয়েছে জনগণের মাঝে সে বেঈমানিকে আরো তীব্রতর করা। মুসলিম ভূমিতে অনৈসলামি রাষ্ট্র বেঁচে আছে বস্তুত সে বেঈমানির উপর। এটি যে নিশ্চিত জাহান্নামের পথ -তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? যাদের হৃদয়ে ঈমান কিছুটা হলেও এখনো বেঁচে আছে, মহান আল্লাহতায়ালার এবং তাঁর দ্বীনের এরূপ অসম্মান নিয়ে তাদের হৃদয়ে ক্রন্দন হওয়া উচিত। এবং সর্ব সামর্থ্য নিয়ে লিপ্ত হওয়া উচিত ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে। ইসলামী রাষ্ট্র যেমন অতীতে মুসলিমদের বিশ্বশক্তির মর্যাদা দিয়েছিল, সে মর্যাদা আজও দিতে পারে। প্রেসক্রিপশন তো তখনই কাজ দেয় যখন সেটিকে কাজে লাগানো হয়। তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে নবীজী (সা:)‌’য়ের যে মহান সূন্নত -সেটি তো তখনই কাজ দিবে যখন সেটির সঠিক অনুসরণ হবে। চলমান এ বিপর্যয় থেকে মুক্তির কি এছাড়া কোন ভিন্ন পথ আছে?  

ইসলাম গড়তে বলে এবং ভাঙাকে হারাম বলে। অথচ ডিগ্রিপ্রাপ্ত বাঙালি দুর্বৃত্তগণ ভাঙাকে গর্বের বিষয় বানিয়েছে। শয়তানের এজেন্ডাই তাদের এজেন্ডা। তাদের হাতে মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নাশকতার সবচেয়ে বড় কাণ্ডটি হলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র এবং সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভাঙার যুদ্ধ। এবং সেটি ভারতের পৌত্তলিক কাফিরদের সাথে নিয়ে। কোন মুসলিম ভূমিতে পৌত্তলিক কাফিরদের সেটিই হলো তাদের ইতিহাসের বড় বিজয়। তবে পাকিস্তান ভেঙে তারা খুশি হয়নি। বাংলাদেশকে ভারতের গোলাম এবং দুর্বৃত্তিতে ৫ বার শীর্ষে পৌছে দিয়েও তারা খুশি হয়নি। শয়তানের এ খলিফাগণ এখন বাংলাদেশকেই ধ্বংস করতে চায়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে কোন উদ্যোগকে এরা রুখতে চায়। কোন ঈমানদার কি এ মুহুর্তে নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে? নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা হবে নিরেট মুনাফিকি।