https://www.facebook.com/obaidul1991
বাঙালী মুসলিম চেতনায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ —ফিরোজ মাহবুব কামাল
- Update Time : ০৬:২০:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২১ Time View

বাংলা কবিতায় মহম্মদ আলী জিন্নাহ
একাত্তরের পর মুজিবার প্রতি ক্ষোভ ও আক্রোশ নিয়ে লেখা হয়েছে, “ভাত দে হারামাজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো” ইত্যাদি জাতীয় কবিতা। পাকিস্তানের ২৩ বছরে দেশটির মানচিত্র খাবার সাধ নিয়ে কেউ কি কবিতা লিখেছে? অথচ সেটি লেখা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাত্র ৩ বছরের মধ্যেই। যে দেশের সরকার দুর্ভিক্ষ ডেকে এনে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটায় -সে দেশের সরকার ও মানচিত্রের বিরুদ্ধে আক্রোশ জাগাই স্বাভাবিক। শেখ মুজিবের পিঠের চামড়া দিয়ে ঢোল বানানোর আক্রোশে বক্তৃতা দিয়েছে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী মতিয়া চৌধুরী। কিন্তু পাকিস্তানের ২৩ বছরে বাংলা ভাষায একটি কবিতাও কি লেখা হয়েছে যাতে প্রকাশ পেয়েছে পাকিস্তান ও তার নেতা কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি ঘৃণা ও আক্রোশ। পাকিস্তান ভাঙ্গা হয়েছে, একাত্তরের পর বাংলাদেশের যেসব প্রতিষ্ঠানের সাথে জিন্নাহর নাম জড়িত ছিল সেখান থেকে তার নামও সরানো হয়েছে, কিন্তু সে আমলের কবিতা ও সাহিত্যকে কে নির্মূল করবে? বরং লক্ষণীয় হলো,কায়েদে আযমের প্রশংসায় বাংলা ভাষায় যত কবিতা লেখা হয়েছে তা বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক নেতার কপালে জুটেনি।
পূর্ব পাকিস্তানকে যারা পাকিস্তানের উপনিবেশ ভাবেন সে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁকে উদেশ্য করে বাংলা ভাষায় যেসব কবিতারচিত হয়েছে তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। বেগম সুফিয়া কামাল লিখেছেন,
“তসলীম লহ,হে অমর প্রাণ!কায়েদে আজমজাতির পিতা!
মুকুট বিহীন সম্রাট ওগো!সকল মানব-মনের মিতা।
অমা-নিশীথের দৃর্গম পথে আলোকের দূত! অগ্রনায়ক!
সিপাহসালার!বন্দী জাতিরে আবার দেখালে মুক্তি-আলোক।”
-(মাসিক মাহে নও। ঢাকা,ডিসেম্বর ১৯৫৯)।
অন্য এক কবিতায় তিনি লিখেছেন,
“জাতির পতাকা-তলে একত্রিত সকলে তোমারে
স্মরণ করিছে বারে বারে,
তোমার আসন আজও সকলের হৃদয়ের মাঝে
তোমারে লইয়া ভরে আছে।
যুগে যুগে তুমি তব দানের প্রভায়
চিরঞ্জীব হয়ে র’বে আপনারী দিব্যি মহিমায়।
কায়েদে আজম। তবদান
মহাকাল-বক্ষ ভরি রহিবে অম্লান।”
-(মাসিক মাহে নও।ঢাকা,ডিসেম্বর ১৯৫৫)।
কায়েদে কাযমের সম্মানে কবি ফররুখ আহমদ লিখেছেন:
“কায়েদের পথ চিনে বাঁচাবো এ পাক হুকুমত।
কলিজার খুন দিয়ে তিলে তিলে,কিম্বা এক সাথে
নির্ভীক জামাতবদ্ধ অকৃপণ রক্ত বিনিময়ে
বিজয়ী শত্রুর ‘পরে,অকম্পিত দুর্ধর্ষ সংগ্রামে
নেতার আদর্শ নিয়ে আজাদীর পূর্ণতার পথে
উদ্বুদ্ধ বাণীতে তার গ’ড়ে যাবো এ পাক ওতান,
বাঁচাবো মর্যাদা তার –যে মর্যাদা মহান পিতার
এ দেশের প্রতি পথ যার দীপ্ত স্মৃতির প্রতীক,
তার অসমাপ্ত কাজ আমাদের দায়িত্ব বিশাল।”
-(বার্ষিকী) নয়া সড়ক
(শাহেদ আলী সংকলিত, ১৯৮৯)
কায়েদে আজম স্মরণে সিকান্দার আবু জাফর লিখেছেন,
“ডোবেনি যে রবি,নেভেনি যে আলো
মুছিবে না কোন কালে,
এই কালে পৃথিবীর ভালে
জ্যোতি-প্রদীপ্ত উজ্বল সেই
সূর্য্যের প্রতিভাস
সে রচিয়া গেছে মৃত্যুবিহীন
আপনার ইতিহাস।
সে ছড়ায়ে গেছে মৃত্যুঞ্জয়ী
মহাজীবনের বীজ,
সে ফোটায়ে গেছে লক্ষ বুকের
তিমির সরসী নীরে
চির প্রভাতের আনন্দ সরসিজ।
মৃত্যু ‘অতীত জীবন তাহার
মৃত্যু সাগর তীরে
দিগন্তহীন সীমা বিস্তৃত জীবনের মহাদেশে
যুগ-যুগান্ত সে আসিবে ফিরি ফিরে।
-(শাহেদ আলী সংকলিত,১৯৮৯)
আওয়ামী লীগ আমলের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং বাংলা এ্যাকাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক ডঃ মাযহারুল ইসলাম লিখেছেন,
“সহসা আলোর পরশ লাগালো
প্রাণে প্রাণে এক চেতনা জাগলো
আধার দুয়ার খুলে গেল সম্মুখে
কে তুমি হে নব-পথ-সন্ধানী আলোকদ্রষ্টা?
কে তুমি নতুন মাটির স্রষ্টা?
…
যে এনেছে বুক জুড়ে আশ্বাস
যে দিয়েছে সত্তা নিয়ে বাঁচবার বিশ্বাস
অগণন মানুষের হৃদয়-মঞ্জিলে
-সে আমার কাযেদে আজম
আমার তন্ত্রীতে যার ঈমানের একতার
শৃঙ্খলার উঠিছে ঝংকার
সুন্দর মধুর মনোরম।”-(শাহেদ আলী সংকলিত, ১৯৮৯)
ড. মাজহারুল ইসলাম অন্য এক কবিতায় কায়েদে আযম সম্পর্কে লিখেছেন,
“আঁধারের গ্লানিভরা জাতির জীবন
কোথাও ছিল না যেন প্রাণ স্পন্দন
মৃত্যু-তুহীন দিন গুণে গুণে এখানে ওখানে
শুধু যেন বারবার চলিষ্ণু পখের প্রান্তে ছেদ টেনে আনে
ম্লান পথ হয়ে ওঠে আরো ঘন ম্লান
আঁধারে বিলীন হলো মুক্তি-সন্ধান।
তারপর মৃত্যু-জয়ী সে এক সৈনিক
সৃষ্টির আনন্দ নিয়ে নেমে এলো আঁধারের পথে
চোখে মুখে অপূর্ব স্বপন
হাতে আঁকা অপরূপ নতুন দেশের রূপায়ন
এ মাটিতে সে এক বিস্ময়,
মৃত বুকে প্রাণ এলো
মুক্তির চেতনা এলো।
প্রাণ যাক তবু সেই স্বপ্ন হোক জয়
নির্বিকার ত্যাগের আহবান!
পথে পথে রক্তের আহবান।
-মাটির ফসল, -(শাহেদ আলী সংকলিত,১৯৮৯)
কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন,
“মুসলিম লীগের আন্দোলন যেরূপ গদাই-লস্করী চালে চলছিল, তাতে আমি আমার অন্তরে কোন বিপুল সম্ভাবনার আশার আলোক দেখতে পাইনি। হঠাৎ লীগ নেতা কায়েদে আজম যেদিন পাকিস্তানের কথা তুলে হুংকার দিয়ে উঠলেন -“আমরা ব্রিটিশ ও হিন্দু ফ্রন্টে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করব” সেদিন আমি উল্লাসে চীৎকার করে বলেছিলাম –হাঁ, এতোদিনে একজন ‘সিপাহসালার’ সেনাপতি এলেন। আমার তেজের তলোয়ার তখন ঝলমল করে উঠলো।”-(শাহেদ আলী সংকলিত,১৯৮৯)
বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক এবং ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাব আবু হেনা মোস্তাফা কামাল কায়েদে আজমের সম্মানে লিখেছেন,
“প্রদীপ্ত চোখে আবার আকাশকে দেখলাম
পড়লাম এক উজ্বল ইতিহাসঃ
সে ইতিহাসের পাতায় পাতায় একটি সোনালী নাম…
আবার আমরা আমরা চোখ তুলে তাই দেখলাম এ আকাশ।
তোমাকে জেনেছি আকাশের চেয়ে বড়—
সাগরের চেয়ে অনেক মহত্তর—
কেননা ক্লান্ত চোখের পাতায় নতুন আলোর ঝড়
তুমি এনে দিলে।নতুন জোয়ার ছুঁয়ে গেল বন্দর।
-(মাসিক মাহে নও,ঢাকা ডিসেম্বর ১৯৫৩)
কবি বন্দেআলী মিয়া লিখেছেন,
“জাতির জনক –তোমারে সালাম!
পাক-ভারতের ইতিহাসে তোমার নাম লেখা রইলো।
লেখা রইলো কালের পাতায়,
শতাব্দীর অন্ধ কারাগারের দ্বার ঠেলে
হে জ্যোতির্ময়,পরাধীন মুসলিম জাহানে তুমি এলে।
তোমার আবির্ভাবে খসে পড়লো গোলামীর জিঞ্জির।”
-(মাসিক মাহে নও,ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৫৩)
কায়েদে আজমের মৃত্যুতে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন,
“অনুর্বর প্রহরে আমার-প্রাণ দিলে সুর দিলে তুমি,
আমার মৃত্তিকালদ্ধ ফসলের ভিত্তিভূমি তুমি।
প্রতিকূল প্রহরের প্রবঞ্চনা ফিরে গেল অসীম কুন্ঠায়,
আসলাম দীপ্ত পথে খরতর সূর্যের আশায়।
তুমি সে সূর্যের দিন,তুমি তার আরম্ভের প্রভা,
সবুজের সমারোহ জীবনের দগ্ধ দিন
প্রাণের বহ্নিব মোহে জেগে উঠে নতুন সঙ্গীতে-
অপূর্ণ জীবন আজ পরিপূর্ণ হলো বন্ধু তোমার ইঙ্গিতে।
…
মানব কন্ঠে যে সুর জাগালে তুমি,
সে সুরে এবার তুলে কল্লোল আমার জন্মভূমি।
– নয়া সড়ক (বার্ষিকী),(সংকলনে শাহেদ আলী, ১৯৮৯)।
এমন কি প্রখ্যাত বামপন্থী তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য কায়েদে আজমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যে কবিতাটি লিখেছিলেন সেটিও অনন্য। তার কিছু অংশ হলঃ
“তপস্যা শেষ,ভাঙ্গো আজ মৌনতা,
দুর্গের দ্বার খোলো বিনিদ্র দ্বারী,
শত্রুরা মূঢ়,সম্ভাষে স্বাধীনতা,
আমরা জয়ের সাগরে জমাবো পাড়ি,
আজকে এ-দেশ শুনেছে যে ব্রত কথা
সোনার খাঁচার সঙ্গে তাইতো আড়ি।”
সুকান্তের এ কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ য়ের স্বাধীনতা পূর্বকালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। পরে ড. আনিসুজ্জামানের সংগ্রহে প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমীর ত্রৈ মাসিক সাহিত্য পত্রিকা “উত্তরাধিকার” এর শ্রাবন-আশ্বিন ১৩৯১ (জুলাই-আগস্ট) সংখ্যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক সময়ের চেয়ারম্যান মোহম্মদ মনিরুজ্জামান লিখেছেন কায়েদে আজমের জন্মদিন উপলক্ষে লিখেছেন,
“তুমি নেই,কি আশ্চর্য,তবু তুমি আছ-
এ অসীম বিস্ময়ে
চিনেছি আমার দেশ।অন্ধকারে
যেখানে জ্বালালে আলো,রাত্রির মিনারে
শোনালে সমুদ্র-বালী;সেই তাকে
যতই বাঁধুক বন্যা ঝড়-ঝঞ্ঝা যন্ত্রণার পাঁকে
সে শুধু প্রদীপ্ত মুখ,
দৃঢ়কন্ঠ উচ্চকিত।একাগ্র উৎসুক
আমি –ছিনেছি তোমাকে প্রতি শ্বাসের হাওয়ায়
মনে মনে
ঘাসের শিশিরে,মৃদু নক্ষত্রের রূপালি জীবনে
দেখিছি প্রোজ্বল হৃদয়ে।তাই
জন্মদিন প্রতিদিন,জেনেছি তোমারে।”
– মাসিক মাহে –নও,ঢাকা।ডিসেম্বর ১৯৫৬।
…
বনে বনে পাহাড়ে ও ঘাসে
আজাদী বন্যা এন যাদুদণ্ড দিয়ে
জাগালেন সুপ্তিমগ্ন পাষাণ-পুরীকে
এই বিংশ শতকের কোন যাদুকর!
নবরাষ্ট্র গঠনের অমোঘ আহবান!
-মাসিক দিলরুবা, (সংগ্রহে শাহেদ আলী, ১৯৮৯।
শিক্ষাবিদ, কবি ও গবেষক মোফাখখারুল ইসলাম কায়েদে আজমের মৃত্যুতে লিখেছেন,
“কায়েদে আজম! কায়েদে আজম! কে বলে মরেছ তুমি?
গুরু জিহাদের রণ-প্রস্তুতিতে হয়তো পড়েছ ঘুমি!
ঝড়-তুফানে ঝাপটা সয়েছ সারা রাত জেগে জেগে,
ভোরের পবনে ঢুলিয়া পড়েছ রাতের তন্দ্রাবেগে!
যাত্রা-ঘণ্টা তেমনি বাজিছে দূর পথে ঠুনঠুনি,
তোমার কন্ঠ সমান আবেগে আজো হেঁকে ওঠে শুনি!
আজো হেঁকে ওঠেঃ এক পা-ও নহে পিছুপানে কভূ নয়!
শাণিত জ্ঞানের তেগ হেনে চলো যেথা আছে সংশয়!
ছিলে সম্মুখে, এবার মোদের পশ্চাতে শুধু এলে,
তোমার মনের তাকত মোদের সমূখে দিতেছে ঠেলে।
তাই আজো চলি –আজো চলি তব পথ,
আমার যে নাই কাঁদিবার ফুরসৎ!
তুমি ত হুকুম করোনি এখনো থামিতে পথের মাঝে,
অশ্রু মছিয়া সমতালে তাই চলিতেছি রণ-সাজে।
এই ধরিলাম তোমার নিশান পুনঃ!
ঝঞ্ঝার বেগ, মৃত্যু-তুফান কোনো
নোয়াতে কখন পারিবে না এরে, পারিবে না লাজ দিতে;
আমরা রক্ত জিম্মা রহিল এর মান রক্ষিতে।”
-কাব্য বীথি, ১৯৫৪।
কায়েদে আজম স্মরণে কবি তালিম হোসেন লিখেছেন,
“জিন্দেগানীর মুক্তি দিশারী,হে জিন্দা মুসলিম!
তব রশ্মির সম্পাত আছে চাঁদ সিতারার পরে।
সে চাঁদ-সিতারা নিশান আমার –আলোকিত অন্তর,
গুমরাহা রাতে পথ হারাবো না-লহ এই নির্ভর।
জিন্দেগানীর মুক্তি দিশারী, হে জিন্দা মুসলিম!
রুদ্ধ আঁধার জিন্দারে দিলে আলোর তসলীম।
স্বেচ্ছা-বন্দী দীন আত্মারে দেখালে রাহে নাজাত,
মৃত্যু –তন্দ্র মুর্চ্ছাতুরের পিয়ালে আবহায়াত!
কার ইশকের পরশ ছোঁয়ালে, হে মোর আতশী সাকী?
নয়া জিন্দেগী তহুরা –নেশায় কোন মাশুকের লাগি
শত মৃত্যুর পারাইয়া আসি জীবনের ময়দানে-
বিজয় নিশান আধো-চাঁদ আঁকা নিশানের আহবানে।
-দিশারি (সংগ্রহে শাহেদ আলী, ১৯৮৯)
কবি বেনজির আহমদ লিখেছেন,
“হে কায়েদ নতুন দিনের,
এ-ও তব দান
মিথ্যার আঁধার টুটি আলোকের গান
এ-ও তব দান।
…
হে কায়েদ নতুন দিনের
মৃত্যু নহে তব অবসান,
জীবন্ত সূর্যের মতো বিশ্বের মানস লোকে
তুমিও যে মৃত্যু –জয়ী অমৃত-সন্তান।
-(কাব্য বীথি, ১৯৫৪)।
কায়েদে আজমের স্মরণে কবি ফজল শাহাবুদ্দীন লিখেছেন,
“তুমি এলে হে নাবিক,প্রভাতের পানপাত্র হাতে
আঁধারে মুখর হোল জীবনের প্রদীপ্ত শপথে
রাত্রির বন্দর থেকে মৌসমীর হাসিন ঊষায়।
অনেক ঝড়ের পর মুঠি মুঠি প্রভাতের আলো
বিদীর্ণ রাত্রির শেষে রক্ত বীজ মাঠেতে ছড়ালো।”
-মাসিক মাহে নও,ঢাকা,ডিসেম্বর ১৯৫৬।
জিন্নাহর প্রতি কেন এ অকৃত্রিম ভালবাসা?
কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহরপ্রতি বাঙালী মুসলিমের এরূপ গভীর ভালবাসার সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। ব্রিটিশের গোলামী থেকে মুক্তি লাভই বাঙালী মুসলিমের প্রকৃত স্বাধীনতা ছিল না। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সাথে সাথে তাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল গোলামীর আরেকটি ভয়ংকর জিঞ্জির। সেটি আধিপত্যবাদি বর্ণ হিন্দুদের। ইংরেজের গোলামী থেকে মুক্তি পাওয়ার চেয়েও কঠিন ছিল অতি নিষ্ঠুর ও নির্দয় হিন্দুদের খপ্পর থেকে মুক্তি পাওয়া। ইংরেজদের আমলে মুসলিম নারী-পুরুষদের হত্যা, মসজিদ ধ্বংস ও মুসলিম নারীদের ধর্ষণের লক্ষ্যে হাজার হাজার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আয়োজন হয়নি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারতীয় রাজনীতির এটিই প্রবলতম সংস্কৃতি। হিন্দু নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস চাচ্ছিল ভারতীয় মুসলিমদের পরাধীনতার খাঁচাতে পুরতে।বাঙালী মুসলিমদের জন্য তাই অপরিহার্য ছিল ইংরেজ ও হিন্দু –উভয়ের গোলামী থেকে স্বাধীনতা লাভ। ১৯৪৭ সালে সেটিই সম্ভব হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন সে আন্দোলনের মহান নেতা। গান্ধি না হলেও ভারত ব্রিটিশের শাসন থেকে স্বাধীনতা পেত। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ছিল কায়েদে আযমের ন্যায় যোগ্য নেতৃত্ব -যিনি একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন বিশাল ভারতের নানা ভাষা, নানা অঞ্চল,নানা মজহাব ও নানা ফেরকার মুসলিমদের।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলার মুসলিমদের যে উপকারটি মোহম্মদ আলী জিন্নাহ করেছেন তা ইখতিয়ার মোহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বঙ্গবিজয়ের পর আর কেউ করেননি। মাতৃভাষার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন গুজরাটি। বেড়ে উঠেছেন করাচি ও মুম্বাইতে। এরপরও বাঙালী মুসলমানের ভাগ্য পরিবর্তনে যে কোন বাঙালীর চেয়ে এই অবাঙালী ব্যক্তির ভূমিকাটিই ছিল সবচেয়ে অধিক। নইলে বাঙালী মুসলমানের স্বাধীন ভাবে বেড়ে উঠার স্বপ্নটি নিছক স্বপ্নই থেকে যেত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাওয়াতে একমাত্র ঢাকা শহরে যে সংখ্যক ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, কৃষিবিদ, সামরিক অফিসার ও অন্যান্য শিক্ষিত পেশাজীবীদের বসবাস তা সমগ্র ভারতের ২২ কোটি মুসলিমের মাঝে নেই। ভারতের জনসংখ্যার ১৫% ভাগ মুসলিম, অথচ সরকারি চাকুরিতে তাদের অনুপাত শতকরা তিন ভাগও নয়। এ তথ্যটি এমনকি ২০০৬ সালে সাচার কমিটির ন্যায় দিল্লি সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত তদন্ত কমিটির রিপোর্টেও প্রকাশ পেয়েছে। ইখতিয়ার মোহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গ-বিজয় করে মুক্তি দিয়েছিলেন পৌত্তলিকতার অভিশাপ থেকে।তিনি সন্ধান দিয়েছিলেন জান্নাতের পথের।দুর্বৃত্ত হিন্দু রাজার কুফুরি শাসন বিলুপ্ত করে তিনি সুযোগ করে দিয়েছিলেন বঙ্গভূমিতে প্রথম শরিয়তের আইন প্রতিষ্ঠার। এভাবে বাংলার বিশাল জনগোষ্ঠী সেদিন সুযোগ পেয়েছিল মুসলিম রূপে বেড়ে উঠার। একই রূপ সুযোগ সৃষ্টি হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
অবাঙালীদের ঘৃনা করা ও বাংলাদেশীদের সকল ব্যর্থতার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করা –এটিই বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চরিত্রের প্রধানতম দিক। অথচ বাঙালী মুসলিমের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে দুই জন ব্যক্তির দান সর্বাধিক -তাদের কেউই বাঙালী নন। তারা হলেন কায়েদে আযম মুহম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ইখতিয়ার মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি। তাছাড়া বাঙালী মুসলিমের হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে যিনি বসে আছেন তিনিও বাংলাদেশ বা বাংলা ভাষার কেউ নন। তিনি হলেন মহান নবীজী, মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ মানব এবং অবাঙালী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। তাই ভাষার নামে প্রাচীর গড়ে বাংলার মুসলিমদেরকে কি তাদের অবাঙালী আপনজনদের থেকে দূরে রাখা যায়? ভাষা, বর্ণ, গোত্র বা ভূগোলের নামে বিভেদের দেয়াল গড়া ইসলামে এ জন্যই হারাম। অথচ সে জঘন্য হারাম কাজটি নিয়েই বাঙালী জাতীয়তাবাদীদের রাজনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি। মুসলিমের বন্ধনটি হলো ঈমানের। পাকিস্তানী আমলে ভাষার নামে সে নিষিদ্ধ দেয়াল গড়ার কাজটি হয়নি। বরং সে দেয়াল ভাঙ্গার কাজটিই হয়েছিল। তাই অসংখ্য পিতামাতা অবাঙালী জিন্নাহর নামে নিজ সন্তানদের নাম রেখেছেন। জিন্নাহর স্মৃতিকে স্মরণীয় করতে দেশের মানুষ তার নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়েছে। কোন হানাদার,দখলদার বা ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিষ্ঠাতার নামে কি সেটি হয়? কিন্তু যে বাঙালী সেক্যুলারিস্টদের চেতনার মানচিত্রটি আগ্রাসী শক্তির হাতে অধিকৃত -তারা কি ইতিহাসের এ সত্য বিষয়গুলি বুঝবার সামর্থ্য রাখে? এরূপ মানসিক বিকলাঙ্গতা নিয়ে পাকিস্তানের ২৩ বছরকে উপনিবেশিক যুগ বলবে -সেটিই কি স্বাভাবিক নয়? আর সেটি না করলে বাঙালীর মনে হিন্দু ভারতের বন্দনাকে জায়েজ করা যায় কি করে?























