https://www.facebook.com/obaidul1991
প্রজন্মকে সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার চেষ্টা করি। ———— মোশারফ হোসেন
- Update Time : ০৪:২৬:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
- / ৩৬ Time View

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী ও রামায়ণ অনুসারে, লঙ্কাপুরী ছিল রাক্ষসরাজ রাবণের রাজধানী এবং রাক্ষসদের
প্রধান আবাসস্থল। এর পেছনের পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক লঙ্কার রাজা ছিলেন দশ মাথাওয়ালা রাবণ, যিনি
বিশ্রবা মুনি ও কৈকসীর (নিকষা) পুত্র। তাঁর নেতৃত্বে লঙ্কায় রাক্ষসদের একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন সভ্যতা
গড়ে উঠেছিল। রামায়ণ অনুসারে, রাবণ ও তাঁর অনুগামী রাক্ষস সেনা লঙ্কায় বাস করতেন। রাক্ষসদের জীবনের
মূল আদর্শ ছিল শক্তি অর্জন এবং ভোগবিলাস। রামায়ণে বর্ণিত লঙ্কাকে বর্তমানের শ্রীলঙ্কা দ্বীপ হিসেবে
চিহ্নিত করা হয়। প্রাচীনকালে ওই অঞ্চলে আদিবাসী বা ভিন্ন সংস্কৃতির শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল,
যাদের আর্য সাহিত্যে 'রাক্ষস' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কয়েক বছর আগে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক মন্দার
কারনে সরকারকে আম জনতা দিগম্বর করেছিল। সেই শ্রীলঙ্কা অল্প দিনেই অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ঘুরে
দড়িয়েছে। ২০২২ সালের চরম দেউলিয়াত্ব এবং তীব্র রাজনৈতিক সংকটের পর, শ্রীলঙ্কা মূলত আইএমএফ
(IMF)-এর বেলআউট প্যাকেজ, কঠোর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার, পর্যটন খাতের পুনরুজ্জীবন এবং
প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ওপর ভর করে মাত্র ৩-৪ বছরের মধ্যে অভাবনীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এমনকি
২০২৫-২০২৬ সালের দিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪% থেকে ৫% এ পৌঁছায় এবং বিশ্বব্যাংক দেশটিকে
পুনরায় 'উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আর আমাদের দেশের অনেক এম পি মহোদয় অবৈধ
টাকার পিছনে ঘুরার কারন কি ? জনপ্রতিনিধি বা সংসদ সদস্যদের (এমপি) একাংশের অবৈধ অর্থ উপার্জনের
প্রবণতা বা দুর্নীতির পেছনে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং কাঠামোগত বেশ কিছু কারণ কাজ করে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সুশাসন গবেষক এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল -এর মতো বৈশ্বিক দুর্নীতি
পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই কারণগুলো উঠে এসেছে । বর্তমান রাজনৈতিক
সংস্কৃতিতে একটি নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে বিশাল অংকের অর্থের প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে
প্রার্থীরা ধার-দেনা করে বা নিজস্ব সম্পদ বিক্রি করে নির্বাচনে অংশ নেন। জয়ী হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই
সেই খরচ তুলে নেওয়া এবং পরবর্তী নির্বাচনের জন্য তহবিল গঠনের একটি বৈষয়িক তাগিদ তৈরি হয়।
রাজনীতিকে অনেকে জনসেবার চেয়ে "বিনিয়োগ ও মুনাফা"র ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করায় এই প্রবণতা বাড়ে।
আশা করি বুঝতে পারছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যখন আদর্শিক রাজনীতিকদের চেয়ে ব্যবসায়ী বা
আর্থিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মনোনয়ন পাওয়ার হার বৃদ্ধি পায়, তখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে
বাণিজ্যিক মানসিকতার প্রতিফলন ঘটে। এর ফলে আইন প্রণয়ন বা নীতি তৈরির চেয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত
আর্থিক লাভকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। শক্তিশালী ও স্বাধীন সুশাসন ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে
জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের সঠিক হিসাব বা আয়ের উৎস নিয়ে জবাবদিহি করতে হয় না। সংসদীয় কমিটিগুলোর
দুর্বল নজরদারি এবং দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার
সংস্কৃতি বা 'সংস্কৃতি অব ইমপিউনিটি' তৈরি হয়। সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় স্থানীয় উন্নয়ন
প্রকল্প, বিভিন্ন লাইসেন্স বা পারমিট অনুমোদন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ
থাকে। এই অতিরিক্ত ক্ষমতার কারণে ঠিকাদারি থেকে কমিশন নেওয়া, তদবির বাণিজ্য এবং স্থানীয় সম্পদ
দখলের মাধ্যমে অবৈধ টাকা আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। আমাদের দেশের বাস্তবতায় একজন এমপিকে তাঁর
এলাকায় দলীয় কর্মী-সমর্থকদের লালন-পালন, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অনুদান এবং নিজস্ব একটি
বিশাল প্রভাব বলয় টিকিয়ে রাখতে হয়। এই বিপুল পরিমাণ নিয়মিত ব্যয় মেটানোর জন্য বৈধ আয়ের বাইরে
গিয়ে অবৈধ আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। নাগরিক সমাজের বিভিন্ন আলোচনা ও পথসভায়
প্রায়ই বলা হয় যে, অবৈধ অর্থের পেছনে ছোটার মূল মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো সীমাহীন লোভ এবং
ভোগবিলাসের মানসিকতা। জনগণের মৌলিক অধিকার বা সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা না করে কেবল
ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় গড়ার প্রতিযোগিতাই এই নৈতিক স্খলনের মূল কারণ। এই পরিস্থিতি থেকে
উত্তরণের জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা
জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভাল না। এখন প্রশ্ন হল
আমরা কিভাবে অনৈতিক কাজ থেকে বেরিয়ে আসব? রাজনীতিতে কালো টাকার প্রভাব, দুর্নীতি এবং অনৈতিক
অর্থ উপার্জনের এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক,
প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও
সুশাসন গবেষকদের মতে, অনৈতিক কাজ থেকে বেরিয়ে আসার প্রধান উপায়গুলো হতে পারে- ১. নির্বাচনী
ব্যবস্থার আমূল সংস্কার যেহেতু অনৈতিক টাকার প্রধান উৎস নির্বাচনী ব্যয়, তাই প্রথমেই এই জায়গাটিতে
আঘাত করতে হবে:- নির্বাচনী ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ ও প্রয়োগ :- নির্বাচনে একজন প্রার্থী
সর্বোচ্চ কত টাকা খরচ করতে পারবেন, তা আইন করে কঠোরভাবে সুনির্দিষ্ট করতে হবে। ডিজিটাল ও স্বচ্ছ
নির্বাচনী তহবিল :- প্রতিটি প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকবে। দল ও প্রার্থীরা কার কাছ থেকে
কত টাকা অনুদান পাচ্ছেন এবং কোথায় কত খরচ করছেন, তা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও জনগণের জন্য উন্মুক্ত
(Publicly Transparent) রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন (State Funding): যোগ্য ও জনবান্ধব প্রার্থীদের
জন্য আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়। ২.
প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে
শক্তিশালী করা জরুরি খুবই জরুরী। দুদককে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন করতে হবে, যাতে
যেকোনো জনপ্রতিনিধির আয়ের উৎস ও সম্পদের হিসাব নিয়ে তারা নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারে। প্রতিটি
সরকারি মন্ত্রণালয়ের খরচ ও উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকিতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে বিরোধী দলের
সদস্যদের নেতৃত্বে আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী করতে হবে। অপরাধী দলের লোক হলেও তাকে আইনের
আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনীতিকে ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের হাত থেকে
মুক্ত করে আদর্শিক জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল টাকার জোর দেখে মনোনয়ন
দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। সৎ, শিক্ষিত, এবং মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন জনগণের পাশে থাকা ত্যাগী
কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে। নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের জমা দেওয়া সম্পদ ও আয়ের হলফনামা নির্বাচন
কমিশন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) দ্বারা কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। আমাদের সবাইকে দেশটাকে
সুন্দর ভাবে সাজিয়ে গুজিয়ে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার চেষ্টা করি।
আমিন।
























