১২:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আধুনিক নগর শাসনের সংকট: মশা নিয়ন্ত্রণে কাঠামোগত ব্যর্থতা, জবাবদিহির ঘাটতি ও অনিবার্য সংস্কারের প্রশ্ন
Reporter Name
- Update Time : ০১:২১:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
- / ২১ Time View

কবি মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু :বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনায় এডিস মশার বিস্তার এখন আর কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক সক্ষমতার ভেতরকার ফাঁকফোকর, পরিকল্পনাহীনতা এবং জবাবদিহিহীনতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। প্রতি বছর একই সংকটের পুনরাবৃত্তি এখন একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—আমরা কি সত্যিই মশার বিরুদ্ধে লড়ছি, নাকি একটি ব্যর্থ ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতীকী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুও চার শতাধিক। ২০২৬ সালেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। এগুলো শুধুই পরিসংখ্যান নয়; এগুলো প্রশাসনিক ব্যর্থতার নীরব অভিযোগপত্র। প্রতিটি মৃত্যু যেন আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে একেকটি প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়। এটি একটি স্থায়ী নগর বিপর্যয়ের নাম, যার শিকড় নগর পরিকল্পনার ভেতরেই প্রোথিত।
ঢাকা ও অন্যান্য শহরে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়—এটি শহরের কাঠামোগত অংশে পরিণত হয়েছে। ছাদে জমে থাকা পানি, অর্ধনির্মিত ভবনের অব্যবস্থাপনা, ভাঙা ড্রেনেজ, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং বিপর্যস্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে শহর নিজেই মশার কারখানায় পরিণত হয়েছে।
এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া কী? ফগিং, কিছু অভিযান, কিছু ঘোষণা, কিছু প্রেস ব্রিফিং—তারপর নীরবতা। সংকট এলে প্রশাসন জাগে, সংকট কমলে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এটাই এখন নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তব চরিত্র।
এটাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা—প্রতিক্রিয়া আছে, প্রতিরোধ নেই।
প্রতিবছর একই ভুল, একই কাঠামো, একই ব্যর্থ পুনরাবৃত্তি। প্রজননস্থল ধ্বংস, ড্রেনেজ সংস্কার, বৈজ্ঞানিক নজরদারি—সবই নীতিতে আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা সীমিত। ফলে সমস্যার মূল শিকড় অক্ষত থেকে যায়, আর সংকট চক্রাকারে ফিরে আসে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা—কীটনাশকের কার্যকারিতা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ। দীর্ঘদিন একই রাসায়নিক ব্যবহার, নিম্নমানের সরবরাহ এবং মশার অভিযোজন ক্ষমতা—সব মিলিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ফগিং কার্যক্রম এখন কার্যত প্রতীকী।
নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন নিয়ন্ত্রণহীনতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে-সেখানে ময়লা, বন্ধ ড্রেন, জলাবদ্ধতা—এই শহর নিজেই নিজের জন্য বিপর্যয় তৈরি করছে। এটি আর কেবল অব্যবস্থাপনা নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত ভাঙনের প্রতিফলন।
সম্প্রতি নগর প্রশাসনের একটি বিদেশ সফর সংক্রান্ত প্রস্তাব নীতিগতভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে—নগর ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার, ব্যয়নীতি এবং জবাবদিহির সংকট কতটা গভীর। সংকটের সময় ভ্রমণ নয়, প্রয়োজন ছিল পরিকল্পনা—এই বাস্তবতা এখানে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা নির্মমভাবে আমাদের ঘাটতি তুলে ধরে। সিঙ্গাপুরে এটি আইনভিত্তিক শূন্য-সহনশীলতা নীতি। জাপানে এটি নগর নকশার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এটি ডেটা, প্রযুক্তি, পূর্বাভাস এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর আমরা এখনো প্রতিক্রিয়ার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি।
এই ব্যবধান প্রযুক্তির নয়—এটি শাসন কাঠামোর ব্যর্থতা।
এখন আর পুরনো পদ্ধতিতে সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি নতুন নগর শাসন দর্শন, যেখানে মশা নিয়ন্ত্রণ হবে কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক অগ্রাধিকার।
বর্তমানে গৃহীত উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের নগর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কিছু প্রযুক্তিনির্ভর ও কাঠামোগত সংস্কার বিবেচনায় আনা জরুরি। এর মধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়ে গবেষণা ও সীমিত পর্যায়ের আলোচনা থাকলেও অধিকাংশই এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এগুলো ভবিষ্যৎ নগর ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রয়োজন—
• স্মার্ট সিটি ডিজিটাল টুইন (Digital Twin City) প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে পুরো শহরের একটি ভার্চুয়াল প্রতিরূপ তৈরি করা যাবে। কোথায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, কোথায় মশার প্রজননস্থল গড়ে উঠছে এবং কোন এলাকায় রোগ বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে তা আগাম শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
• ড্রোনভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বহুতল ভবনের ছাদ, পরিত্যক্ত জমি, জলাবদ্ধ এলাকা এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকা স্থানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
• IoT (Internet of Things) ভিত্তিক স্মার্ট মশা ফাঁদ স্থাপন, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মশার ঘনত্ব, গতিবিধি এবং বিস্তারের তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় ডেটা সিস্টেমে পাঠাবে।
• AI-সমন্বিত জলবায়ু ও স্বাস্থ্য পূর্বাভাস কেন্দ্র, যা বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং রোগ সংক্রমণের তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারবে।
• স্বয়ংক্রিয় নির্মাণ-সাইট মনিটরিং ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ প্রকল্পগুলো দ্রুত শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
• নাগরিক অংশগ্রহণভিত্তিক স্মার্ট রিপোর্টিং অ্যাপ, যেখানে সাধারণ মানুষ ছবি, ভিডিও ও অবস্থানসহ সম্ভাব্য প্রজননস্থলের তথ্য সরাসরি প্রশাসনের কাছে পাঠাতে পারবেন এবং প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
• ব্লকচেইনভিত্তিক জবাবদিহি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ অর্থ, ক্রয়, সরবরাহ, কীটনাশক ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম জনসম্মুখে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
• নগর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, যেখানে বাড়ির মালিক, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, আবাসিক প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও জবাবদিহি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে।
• স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, তথ্যপ্রযুক্তি ও নগর পরিকল্পনা বিভাগের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন, যাতে সংকটকালীন নয়, বরং বছরজুড়ে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
কিন্তু প্রযুক্তি একা যথেষ্ট নয়—যতক্ষণ না প্রশাসন প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করে।
একইভাবে নাগরিক আচরণও দায় এড়াতে পারে না। ছাদ, নির্মাণ এলাকা, ময়লা ব্যবস্থাপনা এবং আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার সংস্কৃতি ছাড়া কোনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
সবশেষে বাস্তবতা একটাই—মশা নয়, সংকট হলো আমাদের নগর শাসনের ভাঙা কাঠামো। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, পরিকল্পনাগত দূরদর্শিতা এবং জবাবদিহির একটি কঠিন পরীক্ষা।
যেদিন প্রতিক্রিয়া নয়, প্রতিরোধ হবে নীতির কেন্দ্রবিন্দু; যেদিন প্রযুক্তি, পরিকল্পনা, জবাবদিহি এবং নাগরিক সচেতনতা একসঙ্গে কাজ করবে—সেদিনই কেবল এই শহর সত্যিকার অর্থে নিরাপদ, টেকসই এবং বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে।
Tag :






















