০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬
https://www.facebook.com/obaidul1991

২০ জুন আন্তর্জাতিক শরণার্থী নিরাপত্তা দিবস – বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী: অতীত ও বর্তমান

বিশেষ প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৮:৩০:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
  • / ১২ Time View

বিশেষ প্রতিনিধি:   

রোহিঙ্গা কারা?
রোহিঙ্গারা মূলত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য (পূর্বে আরাকান) অঞ্চলের একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করলেও মিয়ানমার সরকার তাদের দেশের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে গ্রহণ করেনি। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন কার্যকর হওয়ার পর অধিকাংশ রোহিঙ্গা কার্যত রাষ্ট্রহীন (Stateless) হয়ে পড়ে।
অতীতের ইতিহাস
১. ব্রিটিশ আমল (১৮২৪–১৯৪৮)
ব্রিটিশ শাসনামলে আরাকান অঞ্চলে শ্রমিক ও কৃষক হিসেবে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
পরবর্তীতে জাতিগত ও রাজনৈতিক বিরোধ বাড়তে থাকে।
২. মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর
১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
ধীরে ধীরে তাদের রাজনৈতিক অধিকার, শিক্ষা ও চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়।
৩. ১৯৭৮ সালের অভিযান
মিয়ানমারের সামরিক সরকার “অপারেশন নাগামিন” পরিচালনা করে।
প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
৪. ১৯৯১–৯২ সালের সংকট
সামরিক অভিযান ও নির্যাতনের কারণে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
৫. ২০১৭ সালের গণ-নির্বাসন
আগস্ট ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ব্যাপক অভিযান শুরু হয়।
জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এটিকে জাতিগত নিধন (Ethnic Cleansing) বা সম্ভাব্য গণহত্যার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রায় ৭.৫ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
বিশ্বের বৃহত্তম শশরণার্থী শিবির
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী
কক্সবাজার বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরগুলোর একটি। বিশেষ করে কুতুপালং শরণার্থী শিবির বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতিগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বর্তমান পরিস্থিতি (২০২৬)
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১.৯ থেকে ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে।
অধিকাংশই কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে এবং কিছুসংখ্যক ভাসানচর-এ বসবাস করছে।
২০২৪–২০২৫ সালে রাখাইনে নতুন সংঘাতের কারণে আরও প্রায় ১.৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর তারা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
প্রধান সমস্যা
১. মানবিক সমস্যা
২. খাদ্য ঘাটতি
৩. অপুষ্টি
৪. স্বাস্থ্যসেবা সংকট
৫. শিক্ষা সীমাবদ্ধতা
৬. নিরাপত্তা সমস্যা
৭. ক্যাম্পে অপরাধী চক্রের তৎপরতা
৮. মানবপাচার
৯. মাদক ও চোরাচালানের ঝুঁকি
১০. পরিবেশগত সমস্যা
১১. বন উজাড়
১২. ভূমিক্ষয়
১৩. স্থানীয় সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ
১৪. অর্থনৈতিক প্রভাব
১৫. স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা
১৬. অবকাঠামোর ওপর চাপ
১৭. সরকারি ও আন্তর্জাতিক ব্যয় বৃদ্ধি
প্রত্যাবাসনের প্রচেষ্টা
বাংলাদেশ, মিয়ানমার, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বহুবার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় অধিকাংশ রোহিঙ্গা ফিরে যেতে রাজি নয়। ২০২৫ সালে মিয়ানমার কিছু রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাই শুরু করলেও ব্যাপক প্রত্যাবাসন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
১. নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা
২. আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বজায় রাখা
৩. শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা
৪. রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন
৫. দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট মোকাবিলা
৬. রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

thedailysarkar

দৈনিক সরকার পত্রিকা ১৯৯১ সাল হতে ঢাকা হতে প্রকাশিত হচ্ছে।

https://www.facebook.com/obaidul1991

২০ জুন আন্তর্জাতিক শরণার্থী নিরাপত্তা দিবস – বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী: অতীত ও বর্তমান

Update Time : ০৮:৩০:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি:   

রোহিঙ্গা কারা?
রোহিঙ্গারা মূলত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য (পূর্বে আরাকান) অঞ্চলের একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী। তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করলেও মিয়ানমার সরকার তাদের দেশের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে গ্রহণ করেনি। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন কার্যকর হওয়ার পর অধিকাংশ রোহিঙ্গা কার্যত রাষ্ট্রহীন (Stateless) হয়ে পড়ে।
অতীতের ইতিহাস
১. ব্রিটিশ আমল (১৮২৪–১৯৪৮)
ব্রিটিশ শাসনামলে আরাকান অঞ্চলে শ্রমিক ও কৃষক হিসেবে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
পরবর্তীতে জাতিগত ও রাজনৈতিক বিরোধ বাড়তে থাকে।
২. মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর
১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
ধীরে ধীরে তাদের রাজনৈতিক অধিকার, শিক্ষা ও চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়।
৩. ১৯৭৮ সালের অভিযান
মিয়ানমারের সামরিক সরকার “অপারেশন নাগামিন” পরিচালনা করে।
প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
৪. ১৯৯১–৯২ সালের সংকট
সামরিক অভিযান ও নির্যাতনের কারণে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
৫. ২০১৭ সালের গণ-নির্বাসন
আগস্ট ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ব্যাপক অভিযান শুরু হয়।
জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এটিকে জাতিগত নিধন (Ethnic Cleansing) বা সম্ভাব্য গণহত্যার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
প্রায় ৭.৫ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
বিশ্বের বৃহত্তম শশরণার্থী শিবির
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী
কক্সবাজার বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরগুলোর একটি। বিশেষ করে কুতুপালং শরণার্থী শিবির বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতিগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বর্তমান পরিস্থিতি (২০২৬)
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১.৯ থেকে ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে।
অধিকাংশই কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে এবং কিছুসংখ্যক ভাসানচর-এ বসবাস করছে।
২০২৪–২০২৫ সালে রাখাইনে নতুন সংঘাতের কারণে আরও প্রায় ১.৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর তারা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
প্রধান সমস্যা
১. মানবিক সমস্যা
২. খাদ্য ঘাটতি
৩. অপুষ্টি
৪. স্বাস্থ্যসেবা সংকট
৫. শিক্ষা সীমাবদ্ধতা
৬. নিরাপত্তা সমস্যা
৭. ক্যাম্পে অপরাধী চক্রের তৎপরতা
৮. মানবপাচার
৯. মাদক ও চোরাচালানের ঝুঁকি
১০. পরিবেশগত সমস্যা
১১. বন উজাড়
১২. ভূমিক্ষয়
১৩. স্থানীয় সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ
১৪. অর্থনৈতিক প্রভাব
১৫. স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা
১৬. অবকাঠামোর ওপর চাপ
১৭. সরকারি ও আন্তর্জাতিক ব্যয় বৃদ্ধি
প্রত্যাবাসনের প্রচেষ্টা
বাংলাদেশ, মিয়ানমার, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বহুবার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় অধিকাংশ রোহিঙ্গা ফিরে যেতে রাজি নয়। ২০২৫ সালে মিয়ানমার কিছু রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাই শুরু করলেও ব্যাপক প্রত্যাবাসন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
১. নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা
২. আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বজায় রাখা
৩. শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা
৪. রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন
৫. দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট মোকাবিলা
৬. রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিকত্বের স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।