০৭:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬
https://www.facebook.com/obaidul1991

বাঙালি মুসলিমের ঈমানী দায় ও ব্যর্থতা

মতামত
  • Update Time : ০৩:৫৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৩৮ Time View

মুসলিমের ঈমানী দায় 

 

 

 

 

 

ফিরোজ মাহবুব কামাল:

ঈমানদার হওয়ার দায় শুধু নামাজী, রোজাদার, হাজী ও দ্বীনের প্রচারক হওযা নয়, বরং তাকে ভাবতে হয় ভূরাজনীতি নিয়েও। ভাবতে হয় এবং নিজের অর্থ, মেধা ও জীবন দিয়ে নিয়োজিত হতে হয় ইসলামী রাষ্ট্রে নির্মাণে। নবীজী (সা:) তো সে ভাবেই বেঁচেছেন এবং অন্যদের বাঁচতে শিখিয়েছেন। সে ভাবেই বেঁচেছেন  প্রত্যেক সাহাবা। বুঝতে হবে, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে কোন মামূলী যুদ্ধ নয়। বরং সেটি হলো বিশাল এলাকার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টে দেয়ার জিহাদ। এটি এক উচ্চতর সভ্যতা নির্মাণের জিহাদ। পবিত্র জিহাদ এখানে শয়তানী শক্তির দখলদারি বিলুপ্ত করার। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে সেরূপ একটি রাষ্ট্র নির্মাণে ভারত বাধা দিবেই। কারণ পৃথিবীর এ প্রান্তে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরাই হলো শয়তানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সবচেয়ে অনুগত সৈনিক।

 

মুসলিম জীবনে জান্নাত লাভের কোন সহজ রাস্তা নাই। শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাতে ও দোয়া দরুদে মুসলিমের ধর্ম কর্ম শেষ হয় না। তাকে বাঁচতে হয়ে শত্রুর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই। যেমন মোকাবেলা করেছিলেন গৌরব যুগের মুসলিমগণ। তারা লড়েছিলেন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তির বিরুদ্ধে। বর্তমান মুহুর্তে আগ্রাসী ভারতের বিরুদ্ধে খাড়া হওয়াটাই বাঙালি মুসলিম জীবনের মূল চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ এখানে শুধু স্বাধীন ভাবে বাঁচার নয়, বরং প্রকৃত ঈমানদার রূপে বাঁচার। একাজ একমাত্র তারাই করতে পারবে যারা তাদের রব’য়ের কাছে নিজেদের জান ও মাল বিক্রয় করেছে জান্নাতের বিনিময়ে। মহান আল্লাহতায়ালার সাথে ঈমানদারের সে বিক্রয় নামার উল্লেখ এসেছে নিচের আয়াতে,

 

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ ۖ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ ۚ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ ۚ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُم بِهِ ۚ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

 

অর্থ: “আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যেতাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর পথ অতঃপর তারা শত্রুদের হত্যা করে এবং নিজেরাও নিহত হয়। তওরাতইঞ্জিল ও কোরআনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিকসুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেন-দেনের উপরযা তোমরা করছ তাঁর সাথে। আর এ হল মহান সাফল্য।” –(সুরা তাওবা, আয়াত ১১১)

বাঙালি মুসলিমের ব্যর্থতা

বাংলাদেশে নামাজী, রোজাদার, হাজী, তাবলিগী, ইমাম, মোয়াজ্জিন, আলেম, আল্লামা, হাফিজ, ফকিহ, পীরদের সংখ্যাটি বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় বিশাল। কিন্তু ক’জন প্রকৃত ঈমানদার? নামাজী, রোজাদার, হাজী, তাবলিগী, ইমাম, মোয়াজ্জিন, আলেম, আল্লামা, হাফিজ, ফকিহ, পীর হওয়ার চেয়ে বহুগুণ কঠিন হলো ঈমানদার হওয়া।  ঈমানদার হতে হলে তাকে বাঁচতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার সাথে চুক্তিবদ্ধ জীবন নিয়ে। চুক্তিটি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে নিজের জান মাল বিক্রয়ের। সেটিরই উল্লেখ এসেছে উপরিউক্ত আয়াতে। কিন্তু ক’জন বাংলাদেশী মুসলিম নিজের জান মাল বিক্রয় করেছে মহান রব’য়ের কাছে। অথচ সে সংখ্যাটি কখনোই গোপন থাকে না। কারণ সে সংখ্যাটি স্পষ্ট দেখা যায় জিহাদের ময়দানে। নবীজী (সা:)’য়ের আমলে তাদের সংখ্যাটি ছিল বিশাল। মহান রব’য়ের কাছে নিজের জান মাল বিক্রয় করেছিলেন নবীজী (সা:)’য়ের প্রত্যেক সাহাবা। যারা ব্যর্থ হয়েছে সে ক্রয় বিক্রয়ে, তাদেরকে মুনাফিক বলা হয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার ৩ শত অনুসারীর ন্যায় মুনাফিকগণ দূরে থেকেছে জিহাদ থেকে। সেদিন প্রকৃত ঈমানদারের প্রত্যেককে দেখা গেছে জিহাদের ময়দানে। অর্ধেকের বেশী সাহাবা সে জিহাদে শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের সে কুর’বানী মহান রব’য়ের সাহায্য নামিয়ে এনেছে। মুসলিম বাহিনীকে বিজয়ী করতে ফেরেশতাদের বাহিনী যুদ্ধে যোগ দিয়েছে।  ফলে মুসলিমগণ সেদিন দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন।

কিন্তু বাংলাদেশে নামাজী ও রমযানের রোজাদারের সংখ্যাটি কোটি কোটি হলেও সত্যিকার ঈমানদারের সংখ্যাটি অতি নগন্য। সেটি বুঝা যায় জিহাদের ময়দানে লোকবলের দারুন কমতি দেখে। ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বিজয় পায়নি মহান রব’য়ের এজেন্ডা। ফলে তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়া আইন স্রেফ কিতাবেই রয়ে গেছে। কিতাবে রয়ে গেছে পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত দুর্বৃত্ত নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। এবং প্রতিষ্ঠা পায়নি নবীজী (সা:)’য়ের অনুসরণে ইসলামী রাষ্ট্র। শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিজয়টি এখনো পৌত্তলিক ভারতের অনুসারি সেক্যুলারিস্ট ও জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের। তাদের সে বিজয়টি ১৯৭১ থেকেই। একাত্তেরর ন্যায় আজও তাদের কোয়ালিশনটি পৌত্তলিক ভারতের সাথে।

 

মুজিব, এরশাদ ও হাসিনা  পতন হয়েছে; কিন্তু তাদের স্থাপিত ইসলামবিরোধী সেক্যুলার প্রশাসনিক অবকাঠামো বিলুপ্ত হয়নি। ফলে নির্বাচন হলেও নির্বাচনের রায় তারাই নির্ধারণ করছে। ফলে অসম্ভব হচ্ছে নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়।  এর ফল হলো, বাংলাদেশে বার বার সরকার পরিবর্তন হলেও ভারতীয় আধিপত্যবাদী স্বার্থের গায়ে একটি আঁচড়ও লাগছে না। কারণ সরকার পরিবর্তনের কোন ঘটনাই রাষ্ট্রের deep state’য়ে কোন পরিবর্তন আনছে না। ফলে অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা।

 

 

হিসাব দেয়ার আগে হিসাব নেয়া উচিত

 

বাঙালি মুসলিমগণ যে আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে এবং  সত্যিকার ঈমানদার রূপে বাঁচতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে -তা শত্রু শক্তির বিজয়ই স্পষ্ট ভাবে বলে দেয়। প্রত্যেক ঈমানদারের নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত শত্রুশক্তির এ বিজয় রোধে রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গণে তার নিজের ভূমিকা কি ছিল? রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান রব’য়ের কাছে হিসাব দেয়ার আগে তার নিজের হিসাবটি নিজেরই নেয়া উচিত। তার সকল সামর্থ্য কি স্রেফ নিজের ও নিজের পরিবারের বাঁচাকে সফল করতেই নিঃশেষ হয়ে গেছে? সুরা কাহাফে এরূপ স্বার্থপর মানুষদেরকে সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষ বলা হয়েছে। প্রতিটি মুসলিমের সর্বাত্মক চেষ্টা হওয়া উচিত, দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে শেখা। এক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতাটি বিশাল। বস্তুত মুসলিমদের সকল ব্যর্থতার মূলে হলো এই দায়িত্ব নিয়ে বাঁচায় ব্যর্থতা।

 

অথচ ইসলাম প্রতিটি ঈমানদারকে যেমন তার ঈমানী দায়ের কথা বলে, তেমনি তাকে সে দায়িত্ব নিয়ে পদে পদে বাঁচতে শেখায়। এটিই ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষা। এবং এ নিয়েই মুসলিমের সংস্কৃতি।  অথচ পরিতাপের বিষয় হলো সে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে নির্মিত হয়নি। বাংলাদেশে হাজার হাজার মসজিদ মাদ্রাসা ও স্কুল কলেজ নির্মিত হলেও ব্যর্থ হয়েছে সে কাঙ্খিত ইসলামী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে। বরং গড়ে উঠেছে দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি। ফলে দেশটি দুর্বৃত্তিতে বার বার বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার হাতে বঙ্গ বিজয় হলেও শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গণে সে ইসলামী বিপ্লব কখনোই আসেনি। বিপ্লব থেমে গেছে স্রেফ রাজনৈতিক বিপ্লবে মাঝে।

 

অথচ সংস্কৃতি তো তাই যারা মধ্যে নর নারীর প্রতিদিনের এবং প্রতি ঘন্টার বসবাস। তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব। আর ইসলামী সংস্কৃতির নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো কুর’আনী জ্ঞান। ইসলামে তাই নামাজ রোজা ফরজ করার ১১ বছর পূর্বে কুর’আন শিক্ষা ফরজ করা হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে পবিত্র কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনের ফরজ কোন কালেই পালিত হয়নি। রবীন্দ্র সাহিত্য, নজরুল সাহিত্য গুরুত্ব পেয়েছে; কিন্তু কুর’আন শিক্ষা গুরুত্ব পায়নি। বাঙালি মুসলিমের সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা সহ সকল ব্যর্থতার মূলে হলো শিক্ষাখাতের এই বিশাল ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতার কারণে পাকিস্তান ভেঙে গেছে। বাংলাদেশও ব্যর্থ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ ব্যর্থ হওয়ার অর্থ ভারতের পেটে বিলীন হয়ে যাওয়া। এ ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হলে নবীজী (সা:) যেরূপ কুর’আন শিক্ষা দিয়ে কাজের শুরু করেছিলেন, বাঙালি মুসলিমদেরও শেখান থেকেই শুরু করতে হবে। এর কোন বিকল্প নাই। এর কোন শর্টকাট পথও নাই। এ ব্যর্থতা কাটিয়ে পারলে বাঙালি মুসলিম সফল হবে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে ইসলামের নতুন ইতিহাসের নির্মাণে। তবে সে জন্য জরুরি হলো শুরুর কাজটি শুরুতে করা।      

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thedailysarkar@gmail.com

About Author Information

https://www.facebook.com/obaidul1991

বাঙালি মুসলিমের ঈমানী দায় ও ব্যর্থতা

Update Time : ০৩:৫৯:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

মুসলিমের ঈমানী দায় 

 

 

 

 

 

ফিরোজ মাহবুব কামাল:

ঈমানদার হওয়ার দায় শুধু নামাজী, রোজাদার, হাজী ও দ্বীনের প্রচারক হওযা নয়, বরং তাকে ভাবতে হয় ভূরাজনীতি নিয়েও। ভাবতে হয় এবং নিজের অর্থ, মেধা ও জীবন দিয়ে নিয়োজিত হতে হয় ইসলামী রাষ্ট্রে নির্মাণে। নবীজী (সা:) তো সে ভাবেই বেঁচেছেন এবং অন্যদের বাঁচতে শিখিয়েছেন। সে ভাবেই বেঁচেছেন  প্রত্যেক সাহাবা। বুঝতে হবে, ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদে কোন মামূলী যুদ্ধ নয়। বরং সেটি হলো বিশাল এলাকার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টে দেয়ার জিহাদ। এটি এক উচ্চতর সভ্যতা নির্মাণের জিহাদ। পবিত্র জিহাদ এখানে শয়তানী শক্তির দখলদারি বিলুপ্ত করার। দক্ষিণ এশিয়ার বুকে সেরূপ একটি রাষ্ট্র নির্মাণে ভারত বাধা দিবেই। কারণ পৃথিবীর এ প্রান্তে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরাই হলো শয়তানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সবচেয়ে অনুগত সৈনিক।

 

মুসলিম জীবনে জান্নাত লাভের কোন সহজ রাস্তা নাই। শুধু নামাজ রোজা, হজ্জ যাকাতে ও দোয়া দরুদে মুসলিমের ধর্ম কর্ম শেষ হয় না। তাকে বাঁচতে হয়ে শত্রুর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই। যেমন মোকাবেলা করেছিলেন গৌরব যুগের মুসলিমগণ। তারা লড়েছিলেন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের ন্যায় দুটি বিশ্বশক্তির বিরুদ্ধে। বর্তমান মুহুর্তে আগ্রাসী ভারতের বিরুদ্ধে খাড়া হওয়াটাই বাঙালি মুসলিম জীবনের মূল চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ এখানে শুধু স্বাধীন ভাবে বাঁচার নয়, বরং প্রকৃত ঈমানদার রূপে বাঁচার। একাজ একমাত্র তারাই করতে পারবে যারা তাদের রব’য়ের কাছে নিজেদের জান ও মাল বিক্রয় করেছে জান্নাতের বিনিময়ে। মহান আল্লাহতায়ালার সাথে ঈমানদারের সে বিক্রয় নামার উল্লেখ এসেছে নিচের আয়াতে,

 

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ ۚ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ ۖ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ ۚ وَمَنْ أَوْفَىٰ بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ ۚ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُم بِهِ ۚ وَذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

 

অর্থ: “আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যেতাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর পথ অতঃপর তারা শত্রুদের হত্যা করে এবং নিজেরাও নিহত হয়। তওরাতইঞ্জিল ও কোরআনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিকসুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেন-দেনের উপরযা তোমরা করছ তাঁর সাথে। আর এ হল মহান সাফল্য।” –(সুরা তাওবা, আয়াত ১১১)

বাঙালি মুসলিমের ব্যর্থতা

বাংলাদেশে নামাজী, রোজাদার, হাজী, তাবলিগী, ইমাম, মোয়াজ্জিন, আলেম, আল্লামা, হাফিজ, ফকিহ, পীরদের সংখ্যাটি বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় বিশাল। কিন্তু ক’জন প্রকৃত ঈমানদার? নামাজী, রোজাদার, হাজী, তাবলিগী, ইমাম, মোয়াজ্জিন, আলেম, আল্লামা, হাফিজ, ফকিহ, পীর হওয়ার চেয়ে বহুগুণ কঠিন হলো ঈমানদার হওয়া।  ঈমানদার হতে হলে তাকে বাঁচতে হয় মহান আল্লাহতায়ালার সাথে চুক্তিবদ্ধ জীবন নিয়ে। চুক্তিটি মহান আল্লাহতায়ালার কাছে নিজের জান মাল বিক্রয়ের। সেটিরই উল্লেখ এসেছে উপরিউক্ত আয়াতে। কিন্তু ক’জন বাংলাদেশী মুসলিম নিজের জান মাল বিক্রয় করেছে মহান রব’য়ের কাছে। অথচ সে সংখ্যাটি কখনোই গোপন থাকে না। কারণ সে সংখ্যাটি স্পষ্ট দেখা যায় জিহাদের ময়দানে। নবীজী (সা:)’য়ের আমলে তাদের সংখ্যাটি ছিল বিশাল। মহান রব’য়ের কাছে নিজের জান মাল বিক্রয় করেছিলেন নবীজী (সা:)’য়ের প্রত্যেক সাহাবা। যারা ব্যর্থ হয়েছে সে ক্রয় বিক্রয়ে, তাদেরকে মুনাফিক বলা হয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার ৩ শত অনুসারীর ন্যায় মুনাফিকগণ দূরে থেকেছে জিহাদ থেকে। সেদিন প্রকৃত ঈমানদারের প্রত্যেককে দেখা গেছে জিহাদের ময়দানে। অর্ধেকের বেশী সাহাবা সে জিহাদে শহীদ হয়ে গেছেন। তাদের সে কুর’বানী মহান রব’য়ের সাহায্য নামিয়ে এনেছে। মুসলিম বাহিনীকে বিজয়ী করতে ফেরেশতাদের বাহিনী যুদ্ধে যোগ দিয়েছে।  ফলে মুসলিমগণ সেদিন দুটি বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন।

কিন্তু বাংলাদেশে নামাজী ও রমযানের রোজাদারের সংখ্যাটি কোটি কোটি হলেও সত্যিকার ঈমানদারের সংখ্যাটি অতি নগন্য। সেটি বুঝা যায় জিহাদের ময়দানে লোকবলের দারুন কমতি দেখে। ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বিজয় পায়নি মহান রব’য়ের এজেন্ডা। ফলে তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়া আইন স্রেফ কিতাবেই রয়ে গেছে। কিতাবে রয়ে গেছে পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত দুর্বৃত্ত নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। এবং প্রতিষ্ঠা পায়নি নবীজী (সা:)’য়ের অনুসরণে ইসলামী রাষ্ট্র। শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের দেশে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিজয়টি এখনো পৌত্তলিক ভারতের অনুসারি সেক্যুলারিস্ট ও জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের। তাদের সে বিজয়টি ১৯৭১ থেকেই। একাত্তেরর ন্যায় আজও তাদের কোয়ালিশনটি পৌত্তলিক ভারতের সাথে।

 

মুজিব, এরশাদ ও হাসিনা  পতন হয়েছে; কিন্তু তাদের স্থাপিত ইসলামবিরোধী সেক্যুলার প্রশাসনিক অবকাঠামো বিলুপ্ত হয়নি। ফলে নির্বাচন হলেও নির্বাচনের রায় তারাই নির্ধারণ করছে। ফলে অসম্ভব হচ্ছে নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়।  এর ফল হলো, বাংলাদেশে বার বার সরকার পরিবর্তন হলেও ভারতীয় আধিপত্যবাদী স্বার্থের গায়ে একটি আঁচড়ও লাগছে না। কারণ সরকার পরিবর্তনের কোন ঘটনাই রাষ্ট্রের deep state’য়ে কোন পরিবর্তন আনছে না। ফলে অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা।

 

 

হিসাব দেয়ার আগে হিসাব নেয়া উচিত

 

বাঙালি মুসলিমগণ যে আল্লাহতায়ালার খলিফা রূপে এবং  সত্যিকার ঈমানদার রূপে বাঁচতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে -তা শত্রু শক্তির বিজয়ই স্পষ্ট ভাবে বলে দেয়। প্রত্যেক ঈমানদারের নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত শত্রুশক্তির এ বিজয় রোধে রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গণে তার নিজের ভূমিকা কি ছিল? রোজ হাশরের বিচার দিনে মহান রব’য়ের কাছে হিসাব দেয়ার আগে তার নিজের হিসাবটি নিজেরই নেয়া উচিত। তার সকল সামর্থ্য কি স্রেফ নিজের ও নিজের পরিবারের বাঁচাকে সফল করতেই নিঃশেষ হয়ে গেছে? সুরা কাহাফে এরূপ স্বার্থপর মানুষদেরকে সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষ বলা হয়েছে। প্রতিটি মুসলিমের সর্বাত্মক চেষ্টা হওয়া উচিত, দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে শেখা। এক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতাটি বিশাল। বস্তুত মুসলিমদের সকল ব্যর্থতার মূলে হলো এই দায়িত্ব নিয়ে বাঁচায় ব্যর্থতা।

 

অথচ ইসলাম প্রতিটি ঈমানদারকে যেমন তার ঈমানী দায়ের কথা বলে, তেমনি তাকে সে দায়িত্ব নিয়ে পদে পদে বাঁচতে শেখায়। এটিই ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষা। এবং এ নিয়েই মুসলিমের সংস্কৃতি।  অথচ পরিতাপের বিষয় হলো সে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম দেশে নির্মিত হয়নি। বাংলাদেশে হাজার হাজার মসজিদ মাদ্রাসা ও স্কুল কলেজ নির্মিত হলেও ব্যর্থ হয়েছে সে কাঙ্খিত ইসলামী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে। বরং গড়ে উঠেছে দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি। ফলে দেশটি দুর্বৃত্তিতে বার বার বিশ্ব রেকর্ড গড়ে। ইখতিয়ার মহম্মদ বিন বখতিয়ার হাতে বঙ্গ বিজয় হলেও শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গণে সে ইসলামী বিপ্লব কখনোই আসেনি। বিপ্লব থেমে গেছে স্রেফ রাজনৈতিক বিপ্লবে মাঝে।

 

অথচ সংস্কৃতি তো তাই যারা মধ্যে নর নারীর প্রতিদিনের এবং প্রতি ঘন্টার বসবাস। তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব। আর ইসলামী সংস্কৃতির নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হলো কুর’আনী জ্ঞান। ইসলামে তাই নামাজ রোজা ফরজ করার ১১ বছর পূর্বে কুর’আন শিক্ষা ফরজ করা হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে পবিত্র কুর’আন থেকে জ্ঞানার্জনের ফরজ কোন কালেই পালিত হয়নি। রবীন্দ্র সাহিত্য, নজরুল সাহিত্য গুরুত্ব পেয়েছে; কিন্তু কুর’আন শিক্ষা গুরুত্ব পায়নি। বাঙালি মুসলিমের সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা সহ সকল ব্যর্থতার মূলে হলো শিক্ষাখাতের এই বিশাল ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতার কারণে পাকিস্তান ভেঙে গেছে। বাংলাদেশও ব্যর্থ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ ব্যর্থ হওয়ার অর্থ ভারতের পেটে বিলীন হয়ে যাওয়া। এ ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হলে নবীজী (সা:) যেরূপ কুর’আন শিক্ষা দিয়ে কাজের শুরু করেছিলেন, বাঙালি মুসলিমদেরও শেখান থেকেই শুরু করতে হবে। এর কোন বিকল্প নাই। এর কোন শর্টকাট পথও নাই। এ ব্যর্থতা কাটিয়ে পারলে বাঙালি মুসলিম সফল হবে দক্ষিণ এশিয়ার বুকে ইসলামের নতুন ইতিহাসের নির্মাণে। তবে সে জন্য জরুরি হলো শুরুর কাজটি শুরুতে করা।