০৬:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬
https://www.facebook.com/obaidul1991

১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী ১৩ আগস্ট সততা আর মেধাবী রাজনীতির উজ্জল দৃষ্টান্ত আনোয়ার জাহিদ

মতামত
  • Update Time : ১১:২০:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৭ Time View

রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগনের যখন আস্থা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, যখন রাজনীতি মানেই হচ্ছে ক্ষমতায় গিয়ে জনগনকে ভুলে যাওয়া, দেশকে ভুলে গিয়ে শুধু অর্থ বানানোর নেশা, ঠিক তখন যে কয়জন রাজনীতিবিদকে সতাতার মাপকাঠিতে স্বরণ করা যায় তাদের মধ্যে অবশ্যই আনোয়ার জাহিদ একজন। রাজনৈতিক মত পার্থক্য থাকতেই পারে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। নানা মত ও পথের ফারাক থাকার পরও এটা নি:সন্দেহে বলতে পারি একজন পরিপূর্ণ সৎ রাজনীতিবিদের কাতারে আনোয়ার জাহিদ অবশ্যই দৃষ্টান্ত। দেশের জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে এক আপোষহীন নেতার নাম আনোয়ার জাহিদ। বাম রাজনীতির দিক্ষা নিয়ে রাজনীতির মাঠে এলেও জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধের রাজনীতির সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি দেশের জনগণকে নতুন মডেলের রাজনীতি উপহার দিয়েছেন। দেশ ও গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সকল দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তির সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। যার ফলে নিজের দলের ভিতর লুকায়িত থাকা বর্ণচোড়াদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন বার বার। তবুও নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও চেতনার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেন নাই। সাংবাদিকতায়ও তিনি ছিলেন মেধাবী ও উজ্বল নক্ষত্র।

আনোয়ার জাহিদ ছিলেন সততা ও মেধাভিত্তিক রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য আনোয়ার জাহিদ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তির মাঝে অকল্পনীয় যে ঐক্যের সূচনা হয়েছিল তার রূপকার ছিলেন তিনি। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই রূপকারকেই এক সময় দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার গড়ে দেয়া ঐক্য ২০০১-০৬ পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনা করলেও একবারও তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারেনি। এমনকি তার চিকিৎসার জন্যও পাশে দাঁড়ায়নি তারা। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে। যার ফল আজও আমাদের ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ভোগ করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়।

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও জাতীয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া পরবর্তী জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বার্থক নেতৃত্ব দিয়েছেন আনোয়ার জাহিদ। যখন রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আঙ্গুল উঠানো হয় তখন আনোয়ার জাহিদকে উপস্থিত করা যায় সততার দৃষ্টান্ত হিসাবে। আনোয়ার জাহিদ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করলেও কারো সর্ম্পকে কুটুক্তি বা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করতেন না, যা আজকের রাজনীতিতে ক্রমেই হ্রাস পেতে পেতে শূণ্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে। রাজনীতিতে বিরোধী শক্তির সমালোচনা করতে গিয়ে রাজনীতিবিদরা এমন সব শব্দ ও ভাষা ব্যবহার করছেন যাতে করে মেধাবীরা রাজনীতি থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। তিনি সারা জীবন জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছেন। তার প্রদর্শিত পথে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জাতীয়তাবাদী শক্তি ক্ষমতা ভোগ করেছে। ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। আবারো জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তি সংসদ দখল করেছে। কিন্তু, পুরানো সেই রাজনীতির দিকেই ফেরত যাচ্ছে তারা। আবারো বিভক্তির রাজনীতি ও দেশের স্বার্থের চাই সাম্রাজ্যবাদী ও ধনীক শ্রেনীর স্বার্থের রাজনীতি শুরু হয়েছে। যার পরিনতি খুব বেশী সুখকর নাও হতে পারে আমাদের জন্য। আনোয়ার জাহিদ কখনো তার রাজনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তিনি যে রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন তাই প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন। আমরা যখন শুধুমাত্র ক্ষমতায় জন্য রাজনৈতিক বিশ্বাসকে পদদলিত করতে কুণ্ঠিত হই না, তখন আনোয়ার জাহিদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন রাজনীতির সংজ্ঞা কী? নীতিহীন রাজনীতির যুগে আনোয়ার জাহিদ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধ্রুবতারা। তাঁর মতো মেধাবী, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতার আজ বড়ই প্রয়োজন।

আনোয়ার জাহিদ ১২ জুন ১৯৩৮ সালে ঝিনাইদহের ঘোড়াশাল ইউনিয়নের নারিকেল বাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এ এম দেলোয়ার হোসেন ও মাতা রাজিয়া বেগম। তিনি ১৯৫৬ সালে ঝিনাইদহ মডেল হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি খুলনা বিএল কলেজ, রাজশাহী সরকারি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ১৯৬১ সালে তিনি কারাগারে আইনজীবী কামরুননাহার লাইলীকে বিয়ে করেন। তাদের এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। আনোয়ার জাহিদ ৫৫ সালে সাহিত্য মজলিসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ইত্তেহাদের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতুর সহকারী সম্পাদক, ১৯৫৯ সালে দৈনিক সংবাদের সহকারী সম্পাদক, ১৯৬০ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক, ১৯৬৩ সালে সাপ্তাহিক জনতার সম্পাদক, ১৯৬৬ সালে ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডের উপ-সম্পাদক, ১৯৭০ সালে সাপ্তাহিক গণবাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, ১৯৭২ সালে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি পিপলসের বার্তা সম্পাদক ও বাংলাদেশ টাইমসের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক ইনকিলাবের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬২, ৬৩, ৬৪, সালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজ) সাধারণ সম্পাদক, ১৯৬৫ ও ৬৬ সালে সহ-সভাপতি, ১৯৭৮ ও ৮৩ সালে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৬ ছাত্রলীগের ঝিনাইদহ মহকুমার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঝিনাইদহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজের ছাত্রসংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। ১৯৬২ সালে কারামুক্ত হন। ১৯৬৫ সালে নিখিল-পাকিস্তান ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৬ সালে ন্যাপ দুই ভাগে বিভক্ত হলে তিনি মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে ন্যাপ পুনর্গঠিত হলে তিনি কেন্দ্রীয় সদস্য হন। ১৯৭৮ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন ও ঘোষণাপত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। একই সাথে তিনি ন্যাপের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। পরে গণতন্ত্রী পার্টি গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন এরশাদ সরকারের তথ্য, ত্রাণ এবং শ্রম-জনশক্তি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জানুয়ারি ১৯৮৮ সালে মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন।

১৯৮৯ সালে তার নেতৃত্বে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীসহ  ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপি গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-বিএনডিপি গঠন করে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালের ১০ দলের সমন্বয়ে গঠিত এনডিএ’র সিক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপার্সনেরর তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন। হঠাৎ করেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। যারা ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির সাথে আপোষ করে রাজনীতি করতে চান তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত হয়েছিলেন তিনি। সে সময় সংবাদপত্রে এক স্বাক্ষাতকারে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘ অপরাধির শাস্তি হলো। অথচ অপরাধি নিজেই জানে না কি তার অপরাধ।’ দৃম্যবাণ যে কারণ বলা হতো, সেই কারণেই জন্য যিনি মূলত দায়ি তিনি বিএনপিতে প্রত্যাবর্তন করলেও আনোয়ার জাহিদের আর সেই দলে ফেরত যাবার সুযোগ হয় নাই। অথবা তিনিও আর সেই দলে প্রত্যাবর্তনের কোন দরজা খোজার চেষ্টা করেন নাই। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি রাজনীতিতে থাকলেও দলীয় রাজনীতি থেকে তিনি নিজেকে দূরেই রেখেছিলেন।

যখন রাজনীতিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আঙ্গুল উঠানো হয় তখন আনোয়ার জাহিদকে উপস্থিত করা যায় সততা দৃষ্টান্ত হিসাবে। আনোয়ার জাহিদ রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করলেও কারো সর্ম্পকে কুটুক্তি বা অশ্লীল শব্দের ব্যবহার করতেন না। যা আজকের রাজনীতিতেই ক্রমেই কমে হ্রাস পাচ্ছে। তিনি সারা জীবন জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছেন। আনোয়ার জাহিদ আজীবন সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে ও মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে গেছেন। তার মতো মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান নেতার প্রয়োজন জাতি সকল সময় অনুভব করবে। আনোয়ার জাহিদের সংস্পর্শে অনেক রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই দেখা গেছে নানা সময়ে। আজ হয়তো তাদের আর সময় নাই বা সময় তাদের প্রতিকুলে তাই আনোয়ার জাহিদকে স্মরণ করতে অসুবিধা। অন্যদিকে যেই সাংবাদিক সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাও হয়তো এখন আর আনোয়ার জাহিদকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করতে সময়পাবে না। তবুও আনোয়ার জাহিদ আছেন এবং থাকবেন। দু:সময়ে তাকে স্বরণ করবেন হয়তো।

সততার রাজনীতির পথিকৃত আনোয়ার জাহিদ ১৩ আগস্ট ২০০৮ সালে ঢাকার গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করি।

(লেখক : কলামিস্ট, রাজনীতিক  কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

thedailysarkar

দৈনিক সরকার পত্রিকা ১৯৯১ সাল হতে ঢাকা হতে প্রকাশিত হচ্ছে।

https://www.facebook.com/obaidul1991

১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী ১৩ আগস্ট সততা আর মেধাবী রাজনীতির উজ্জল দৃষ্টান্ত আনোয়ার জাহিদ

Update Time : ১১:২০:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগনের যখন আস্থা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, যখন রাজনীতি মানেই হচ্ছে ক্ষমতায় গিয়ে জনগনকে ভুলে যাওয়া, দেশকে ভুলে গিয়ে শুধু অর্থ বানানোর নেশা, ঠিক তখন যে কয়জন রাজনীতিবিদকে সতাতার মাপকাঠিতে স্বরণ করা যায় তাদের মধ্যে অবশ্যই আনোয়ার জাহিদ একজন। রাজনৈতিক মত পার্থক্য থাকতেই পারে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। নানা মত ও পথের ফারাক থাকার পরও এটা নি:সন্দেহে বলতে পারি একজন পরিপূর্ণ সৎ রাজনীতিবিদের কাতারে আনোয়ার জাহিদ অবশ্যই দৃষ্টান্ত। দেশের জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে এক আপোষহীন নেতার নাম আনোয়ার জাহিদ। বাম রাজনীতির দিক্ষা নিয়ে রাজনীতির মাঠে এলেও জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধের রাজনীতির সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি দেশের জনগণকে নতুন মডেলের রাজনীতি উপহার দিয়েছেন। দেশ ও গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সকল দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তির সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। যার ফলে নিজের দলের ভিতর লুকায়িত থাকা বর্ণচোড়াদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন বার বার। তবুও নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও চেতনার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেন নাই। সাংবাদিকতায়ও তিনি ছিলেন মেধাবী ও উজ্বল নক্ষত্র।

আনোয়ার জাহিদ ছিলেন সততা ও মেধাভিত্তিক রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য আনোয়ার জাহিদ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তির মাঝে অকল্পনীয় যে ঐক্যের সূচনা হয়েছিল তার রূপকার ছিলেন তিনি। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই রূপকারকেই এক সময় দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার গড়ে দেয়া ঐক্য ২০০১-০৬ পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনা করলেও একবারও তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারেনি। এমনকি তার চিকিৎসার জন্যও পাশে দাঁড়ায়নি তারা। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে। যার ফল আজও আমাদের ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ভোগ করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়।

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও জাতীয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া পরবর্তী জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বার্থক নেতৃত্ব দিয়েছেন আনোয়ার জাহিদ। যখন রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আঙ্গুল উঠানো হয় তখন আনোয়ার জাহিদকে উপস্থিত করা যায় সততার দৃষ্টান্ত হিসাবে। আনোয়ার জাহিদ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করলেও কারো সর্ম্পকে কুটুক্তি বা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করতেন না, যা আজকের রাজনীতিতে ক্রমেই হ্রাস পেতে পেতে শূণ্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে। রাজনীতিতে বিরোধী শক্তির সমালোচনা করতে গিয়ে রাজনীতিবিদরা এমন সব শব্দ ও ভাষা ব্যবহার করছেন যাতে করে মেধাবীরা রাজনীতি থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। তিনি সারা জীবন জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছেন। তার প্রদর্শিত পথে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জাতীয়তাবাদী শক্তি ক্ষমতা ভোগ করেছে। ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতন হয়েছে। আবারো জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তি সংসদ দখল করেছে। কিন্তু, পুরানো সেই রাজনীতির দিকেই ফেরত যাচ্ছে তারা। আবারো বিভক্তির রাজনীতি ও দেশের স্বার্থের চাই সাম্রাজ্যবাদী ও ধনীক শ্রেনীর স্বার্থের রাজনীতি শুরু হয়েছে। যার পরিনতি খুব বেশী সুখকর নাও হতে পারে আমাদের জন্য। আনোয়ার জাহিদ কখনো তার রাজনীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তিনি যে রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন তাই প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন। আমরা যখন শুধুমাত্র ক্ষমতায় জন্য রাজনৈতিক বিশ্বাসকে পদদলিত করতে কুণ্ঠিত হই না, তখন আনোয়ার জাহিদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন রাজনীতির সংজ্ঞা কী? নীতিহীন রাজনীতির যুগে আনোয়ার জাহিদ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধ্রুবতারা। তাঁর মতো মেধাবী, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতার আজ বড়ই প্রয়োজন।

আনোয়ার জাহিদ ১২ জুন ১৯৩৮ সালে ঝিনাইদহের ঘোড়াশাল ইউনিয়নের নারিকেল বাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এ এম দেলোয়ার হোসেন ও মাতা রাজিয়া বেগম। তিনি ১৯৫৬ সালে ঝিনাইদহ মডেল হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি খুলনা বিএল কলেজ, রাজশাহী সরকারি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ১৯৬১ সালে তিনি কারাগারে আইনজীবী কামরুননাহার লাইলীকে বিয়ে করেন। তাদের এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। আনোয়ার জাহিদ ৫৫ সালে সাহিত্য মজলিসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ইত্তেহাদের সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে অর্ধ সাপ্তাহিক ধূমকেতুর সহকারী সম্পাদক, ১৯৫৯ সালে দৈনিক সংবাদের সহকারী সম্পাদক, ১৯৬০ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক, ১৯৬৩ সালে সাপ্তাহিক জনতার সম্পাদক, ১৯৬৬ সালে ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডের উপ-সম্পাদক, ১৯৭০ সালে সাপ্তাহিক গণবাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, ১৯৭২ সালে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি পিপলসের বার্তা সম্পাদক ও বাংলাদেশ টাইমসের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক ইনকিলাবের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬২, ৬৩, ৬৪, সালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজ) সাধারণ সম্পাদক, ১৯৬৫ ও ৬৬ সালে সহ-সভাপতি, ১৯৭৮ ও ৮৩ সালে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৬ ছাত্রলীগের ঝিনাইদহ মহকুমার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঝিনাইদহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজের ছাত্রসংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৬১ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। ১৯৬২ সালে কারামুক্ত হন। ১৯৬৫ সালে নিখিল-পাকিস্তান ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৬ সালে ন্যাপ দুই ভাগে বিভক্ত হলে তিনি মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে ন্যাপ পুনর্গঠিত হলে তিনি কেন্দ্রীয় সদস্য হন। ১৯৭৮ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন ও ঘোষণাপত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। একই সাথে তিনি ন্যাপের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। পরে গণতন্ত্রী পার্টি গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন এরশাদ সরকারের তথ্য, ত্রাণ এবং শ্রম-জনশক্তি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জানুয়ারি ১৯৮৮ সালে মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন।

১৯৮৯ সালে তার নেতৃত্বে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীসহ  ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপি গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-বিএনডিপি গঠন করে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালের ১০ দলের সমন্বয়ে গঠিত এনডিএ’র সিক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপার্সনেরর তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন। হঠাৎ করেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। যারা ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির সাথে আপোষ করে রাজনীতি করতে চান তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত হয়েছিলেন তিনি। সে সময় সংবাদপত্রে এক স্বাক্ষাতকারে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘ অপরাধির শাস্তি হলো। অথচ অপরাধি নিজেই জানে না কি তার অপরাধ।’ দৃম্যবাণ যে কারণ বলা হতো, সেই কারণেই জন্য যিনি মূলত দায়ি তিনি বিএনপিতে প্রত্যাবর্তন করলেও আনোয়ার জাহিদের আর সেই দলে ফেরত যাবার সুযোগ হয় নাই। অথবা তিনিও আর সেই দলে প্রত্যাবর্তনের কোন দরজা খোজার চেষ্টা করেন নাই। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি রাজনীতিতে থাকলেও দলীয় রাজনীতি থেকে তিনি নিজেকে দূরেই রেখেছিলেন।

যখন রাজনীতিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আঙ্গুল উঠানো হয় তখন আনোয়ার জাহিদকে উপস্থিত করা যায় সততা দৃষ্টান্ত হিসাবে। আনোয়ার জাহিদ রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করলেও কারো সর্ম্পকে কুটুক্তি বা অশ্লীল শব্দের ব্যবহার করতেন না। যা আজকের রাজনীতিতেই ক্রমেই কমে হ্রাস পাচ্ছে। তিনি সারা জীবন জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করেছেন। আনোয়ার জাহিদ আজীবন সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে ও মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে গেছেন। তার মতো মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান নেতার প্রয়োজন জাতি সকল সময় অনুভব করবে। আনোয়ার জাহিদের সংস্পর্শে অনেক রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই দেখা গেছে নানা সময়ে। আজ হয়তো তাদের আর সময় নাই বা সময় তাদের প্রতিকুলে তাই আনোয়ার জাহিদকে স্মরণ করতে অসুবিধা। অন্যদিকে যেই সাংবাদিক সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাও হয়তো এখন আর আনোয়ার জাহিদকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করতে সময়পাবে না। তবুও আনোয়ার জাহিদ আছেন এবং থাকবেন। দু:সময়ে তাকে স্বরণ করবেন হয়তো।

সততার রাজনীতির পথিকৃত আনোয়ার জাহিদ ১৩ আগস্ট ২০০৮ সালে ঢাকার গুলশানে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করি।

(লেখক : কলামিস্ট, রাজনীতিক  কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)