https://www.facebook.com/obaidul1991
সম্পত্তির লোভে বাবাকে হত্যার নৃশংসতা: দুই বছর পর ছেলের জবানবন্দিতে উন্মোচিত চাঞ্চল্যকর রহস্য
- Update Time : ০৮:৪৬:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
- / ২৬ Time View

বাঁশখালী প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার এক পিতৃহত্যার ঘটনায় প্রায় দুই বছর পর বেরিয়ে এসেছে রোমহর্ষক এক সত্য। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে নিজের বাবাকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে ছেলের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রো এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, হত্যার শিকার মীর মজিবুর রহমান খান বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব চাম্বল এলাকার বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন বাবুর্চির কাজ করে পরিবার চালিয়েছেন তিনি। জীবনের শেষ সময়ে মেয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়ে তাকে নির্মম মৃত্যুর শিকার হতে হয়।
তদন্তে প্রকাশ পায়, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মজিবুর রহমান খানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তার বড় ছেলে বেলাল হোসেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি একজন নারীকে ব্যবহার করেন। ওই নারীকে দিয়ে মজিবুর রহমান খানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের অভিনয় তৈরি করা হয় এবং সেই সূত্র ধরে তাকে ফাঁদে ফেলা হয়।
পিবিআইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৭ জুন ওই নারীর ডাকে চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকার একটি বাসায় যান মজিবুর রহমান খান। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন বেলাল হোসেনের সহযোগী আব্দুল জলিল। বাসায় তাকে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পান করানো হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
এরপর অচেতন অবস্থায় তাকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হয়। সন্ধ্যার পর চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থানাধীন সিডিএ আউটার রিং রোডের নির্জন এলাকায় নিয়ে গিয়ে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরে তার মরদেহ রাস্তার পাশের ঝোপে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় ঘাতকরা।
ঘটনার দুই দিন পর, ৯ জুন হালিশহর থানা পুলিশ অজ্ঞাত পরিচয়ের একটি মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় ময়নাতদন্ত শেষে অজ্ঞাত হিসেবেই দাফন করা হয় মরদেহটি। সে সময় মামলার তদন্তেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় বিষয়টি চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পথে চলে যায়।
তবে নিহতের পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে মেয়ের পক্ষ থেকে বাবার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা হয়। আদালতের নির্দেশনায় পুনরায় তদন্ত শুরু করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্তকারীরা ধীরে ধীরে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনা উদ্ঘাটন করেন।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১৩ জুন কর্ণফুলীর মইজ্জারটেক এলাকা থেকে নিহতের ছেলে বেলাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বাবাকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেন। পরবর্তীতে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও প্রদান করেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সহযোগী আব্দুল জলিলকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম জানান, তদন্তে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সম্পত্তির লোভ থেকেই পরিকল্পিতভাবে মীর মজিবুর রহমান খানকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার কাজে ব্যবহৃত নারী সহযোগীর পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি এবং তাকে আটকের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই বছর আগে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা মরদেহের আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, উদ্ধার হওয়া সেই মরদেহটিই ছিল মীর মজিবুর রহমান খানের।
একজন বাবা, যিনি সারাজীবন পরিশ্রম করে সন্তানদের মানুষ করেছেন, জীবনের শেষ পরিণতিতে তাকেই হতে হয়েছে সন্তানের ষড়যন্ত্রের শিকার। সম্পত্তির লোভ যখন মানবিকতা ও বিবেককে গ্রাস করে, তখন সবচেয়ে আপন সম্পর্কও পরিণত হতে পারে মৃত্যুফাঁদে। বাঁশখালীর এই হৃদয়বিদারক ঘটনা সমাজের কাছে আবারও একটি কঠিন বার্তা দিয়ে গেল—লোভের কাছে পরাজিত হলে রক্তের সম্পর্কও হারিয়ে ফেলতে পারে তার পবিত্রতা।
























