
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বন রক্ষার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, অভিযোগ উঠেছে তারাই এখন বনভূমি দখলের নেপথ্যের কারিগর। বন বিভাগের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা থাকলেও গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা বনবিট এলাকায় তার বাস্তব প্রতিফলন নেই বললেই চলে। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা-কর্মচারী, দালালচক্র ও ভূমিদস্যুদের যোগসাজশে সংরক্ষিত বনভূমি দখল এখন যেন প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল জানায়, বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশের পর নতুন স্থাপনার নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই বিট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে পুনরায় কাজ সম্পন্ন করা হয়। দখল হওয়া বনভূমি পুনরুদ্ধারে কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি। ফলে বনভূমি দখলকারীরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কালিয়াকৈর রেঞ্জের চন্দ্রা বন বিটের সংরক্ষিত কয়েক হাজার বিঘা বনভূমি স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, দালাল ও তদবিরকারীদের সহায়তায় দখল করা হচ্ছে। শুধু দখলই নয়, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব জমি বিক্রি করে একটি চক্র কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য গড়ে তুলেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্বাসপাড়ায় মুক্তি ওবায়দুর,লাভলী দাগং ২৫২৭ , হাওয়া বেগম, জাকির হোসেন মাটি কাটায় আব্দুল সাত্তার কালামপুর খাজার ডেকে মাসুদ হোসেন , রংপুরের টেক আব্দুল হামিদের ছেলে মনির হোসেন বনভূমি দখল করে বাড়ি নির্মাণ করছেন। জোলাপাড়ায় আফাজ উদ্দিন ইতোমধ্যে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সুরিচালায় ডিমারকেশন ছাড়াই জুয়েল নামে এক ব্যক্তি বাড়ির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্বাসপাড়ার ভাঙ্গারপাড় এলাকায় শাল-গজারি বনের ভেতরে চঞ্চল মিয়া দোকানঘর নির্মাণ করেছেন। এছাড়াও সুরিচালা দারুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানার পূর্ব পাশে সংরক্ষিত আরএস গেজেটভুক্ত বনভূমিতে আবু সাঈদ মন্ডল ইটের দেয়াল তুলে ১০ কক্ষবিশিষ্ট ভবনের নির্মাণকাজ করছেন বলে দেখা গেছে। অন্যদিকে পাশাগেটের মুন্সিটেক এলাকায় জাহাঙ্গীর আলম টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বোর্ডমিল এলাকায় জামাল নামে এক ব্যক্তি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। বিশ্বাসপাড়ার জিকজ্যাক মাঠের পশ্চিম পাশে নুরজাহান নামে এক নারী বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। কালামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সড়কের মুখে সাইফুল নামে এক ব্যক্তি টিনশেড ঘর তুলেছেন। শুধু তাই নয়, ডং ব্যাং গেট সংলগ্ন মোল্লারটেক এলাকায় বনভূমির সীমানা ঘেঁষে ডিমারকেশন ছাড়াই জসিম উদ্দিন দুইতলা ভবনের ফাউন্ডেশন করেছেন। তার নির্মাণাধীন ভবনের সামনেই গজারি বনের ভেতরে আরও ১০ থেকে ১২টি নতুন টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। বনের জমিতে ভবন নির্মাণের বিষয়ে আবু সাঈদ মন্ডল বলেন, ১৯৫৬ সালের দলিল থাকলেও আরএস রেকর্ড বনের নামে রয়েছে।আমি চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেই কাজ করছি। অন্যদিকে সুরিচালার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দার অভিযোগ, বনের জমিতে ঘর করতে টাকা ছাড়া কিছুই হয় না। আবু সাঈদ মন্ডলের কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। পরে চার লাখ টাকার বিনিময়ে আবার শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বন প্রহরী মিনহাজের মাধ্যমে দুই লাখ টাকা বন কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে, বাকি টাকা কাজ শেষে দেওয়া হবে। যারা বন রক্ষা করবে, তারাই এখন বনভূমি দখলের সঙ্গে জড়িত। নতুন করে বনভূমি দখলের বিষয়ে জানতে চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা ইকবাল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। তবে সহকারী বন সংরক্ষক ও কালিয়াকৈর রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিদুল ইসলাম শাকিল বলেন, পর্যায়ক্রমে আশপাশের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। নতুন করে দখলের তথ্য পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি সত্যিই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর থাকে, তাহলে দিনের পর দিন সংরক্ষিত বনভূমিতে বহুতল ভবন, টিনশেড ঘর ও দোকান নির্মাণ হলো কীভাবে? আর যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে বন রক্ষকদের বিরুদ্ধে কবে নেওয়া হবে দৃশ্যমান ব্যবস্থা—সেই উত্তরই এখন খুঁজছে এলাকাবাসী।
























