০৮:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬

রাজশাহী দুর্গাপুরে প্রশাসনের নীরব আশীর্বাদে দুর্গাপুরে রাতভর অবৈধ পুকুর খননের তাণ্ডব

Reporter Name
  • Update Time : ০১:৪৬:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ৩০৭ Time View
স্টাফ রিপোর্টার ,মো: আতিকুর রহমান : রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় প্রশাসনের নাকের ডগায় রাতের আঁধারে চলছে অবৈধ পুকুর খননের রীতিমতো তাণ্ডব। কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই তিন ফসলি কৃষিজমিতে গভীর পুকুর কেটে সেই মাটি প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। দিনের আলোয় সব নীরব, কিন্তু রাত নামলেই মাঠ দখল করে নেয় এক শক্তিশালী মাটি–পুকুর সিন্ডিকেট।
স্থানীয়দের অভিযোগ,  রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের দাপটে প্রশাসন কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকায়। কেউ মুখ খুললেই হুমকি, ভয়ভীতি আর মিথ্যা মামলার আতঙ্ক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন রাত ১০টার পর ভারী যন্ত্রপাতি (এসকেভেটর) নিয়ে মাঠে নামে শ্রমিকরা। দিনের বেলায় কোনো কাজ না থাকলেও রাত হলেই শুরু হয় মাটি কাটার মহোৎসব। স্থানীয়দের ভাষ্য—এভাবে রাতের অন্ধকারকে ঢাল বানিয়ে প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে নির্বিঘ্নে চলছে অবৈধ কর্মকাণ্ড।
উপজেলার ২নং কিসমতগণকৈড় ইউনিয়নের উজালখলসী পূর্বপাড়া বিলে প্রায় ২০০ বিঘা তিন ফসলি কৃষিজমিতে পুকুর খনন করছেন গোপালপাড়া গ্রামের নবী উল্লাহর ছেলে বেলাল হোসেন ওরফে ব্যাটারি বেলাল। একই ইউনিয়নের বড়াইল পালাসপাড়া বিলে সরকারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করছেন গণকৈড় গ্রামের মফিজ সরকারের ছেলে হান্নান সরকার এবং বড়ইল গ্রামের এছামুদ্দিন মন্ডলের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল।
এছাড়াও ওই ইউনিয়নে আরও একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সিরাজগঞ্জে কর্মরত ডিবি কনস্টেবল মজনু, নিজেকে ডিবির ওসি পরিচয় দিয়ে রাতুগ্রাম বিলে প্রায় ৫০ বিঘা কৃষিজমিতে পুকুর খনন করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অন্যদিকে ৭নং জয়নগর ইউনিয়নের আনুলিয়া বিলে দুইটি পয়েন্টে চলছে অবৈধ পুকুর খনন। এলাকাবাসীর দাবি, ছলিম ও এরশাদের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ১৭৬ বিঘা জমি খনন করে ফেলেছে।
আইন অনুযায়ী কৃষিজমিতে পুকুর খননের জন্য প্রশাসনের লিখিত অনুমতি ও নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তার কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। অতিরিক্ত গভীর পুকুর খননের ফলে শুষ্ক মৌসুমেই আশপাশের জমিতে খরা দেখা দিচ্ছে। কৃষকদের আশঙ্কা—বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে, যা পুরো এলাকার কৃষি উৎপাদনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।
পুকুরের মাটি পরিবহনের জন্য ভারী ট্রলি ও ট্রাক চলাচলে এলাকার কাঁচা ও পাকা সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে ভ্যানচালক মান্নান বলেন,
“মাটির রাস্তা দিয়ে উঠে পাকা রাস্তায় যেতেই গাড়ি দুলে ওঠে। ভারী গাড়ির চাপে রাস্তা গর্ত হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।”
স্থানীয় কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন,
“তিন ফসলি জমিতে পুকুর মানেই কৃষি ধ্বংস। রাত হলেই মাটি কাটে। ধুলাবালিতে রসুন, পেঁয়াজ, মসুরসহ সব ফসল নষ্ট হচ্ছে। আমরা বারবার অভিযোগ করেছি, কিন্তু কেউ শুনছে না।”
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অভিযুক্ত সিন্ডিকেটের প্রকাশ্য দম্ভ। ঢাকা–গাজীপুর থেকে আসা ছলিম নিজেকে মূল হোতা দাবি করে বলেন,
“প্রশাসনের অনুমতি আছে আবার নাই। স্যাররা মৌখিক অনুমতি দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালীন শতাধিক পুকুর কেটেছি, আমি জানি কিভাবে কাটতে হয়।”
লিখিত অনুমোদন দেখাতে বললে হুমকির সুরে তিনি বলেন,
“বেশি কথা বললে চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেবো। বহু সাংবাদিক আমি সামলাইছি—এগুলো আমার প্রতিদিনের খেলা।”
এ বিষয়ে দুর্গাপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন,
“পুকুর খননের বিষয়টি ভূমি খাতের। এটি এসিল্যান্ড ও ইউএনও দেখেন। ভ্রাম্যমাণ অভিযানে পুলিশ চাইলে আমরা সহায়তা দিই।”
সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজুর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“মৌখিক বা লিখিত কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। এসব দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। লোক পাঠানো হয়েছিল, কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপরও যদি মাটি কাটে, তাহলে মামলা দেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “একটি পুকুরে একবারের বেশি মামলা দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে কৃষকদের আরও জোরালোভাবে এগিয়ে আসতে হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—যদি কোনো অনুমতি না থাকে, তাহলে রাতের পর রাত কীভাবে পুকুর খনন চলে? প্রশাসনের অভিযানের আগেই কীভাবে শ্রমিকরা সরে যায়, ব্যাটারি গাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়? তাহলে কি প্রশাসনের ভেতর থেকেই অবৈধ সিন্ডিকেট আগাম তথ্য পাচ্ছে?
দ্রুত অবৈধ পুকুর খনন ও মাটি পরিবহন বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার এবং জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তা না হলে দুর্গাপুর উপজেলার তিন ফসলি জমি, কৃষি ও পরিবেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে—এমন আশঙ্কাই এখন সচেতন মহলের ।
Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information

thedailysarkar

দৈনিক সরকার পত্রিকা ১৯৯১ সাল হতে ঢাকা হতে প্রকাশিত হচ্ছে।

রাজশাহী দুর্গাপুরে প্রশাসনের নীরব আশীর্বাদে দুর্গাপুরে রাতভর অবৈধ পুকুর খননের তাণ্ডব

Update Time : ০১:৪৬:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
স্টাফ রিপোর্টার ,মো: আতিকুর রহমান : রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় প্রশাসনের নাকের ডগায় রাতের আঁধারে চলছে অবৈধ পুকুর খননের রীতিমতো তাণ্ডব। কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই তিন ফসলি কৃষিজমিতে গভীর পুকুর কেটে সেই মাটি প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। দিনের আলোয় সব নীরব, কিন্তু রাত নামলেই মাঠ দখল করে নেয় এক শক্তিশালী মাটি–পুকুর সিন্ডিকেট।
স্থানীয়দের অভিযোগ,  রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের দাপটে প্রশাসন কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকায়। কেউ মুখ খুললেই হুমকি, ভয়ভীতি আর মিথ্যা মামলার আতঙ্ক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন রাত ১০টার পর ভারী যন্ত্রপাতি (এসকেভেটর) নিয়ে মাঠে নামে শ্রমিকরা। দিনের বেলায় কোনো কাজ না থাকলেও রাত হলেই শুরু হয় মাটি কাটার মহোৎসব। স্থানীয়দের ভাষ্য—এভাবে রাতের অন্ধকারকে ঢাল বানিয়ে প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে নির্বিঘ্নে চলছে অবৈধ কর্মকাণ্ড।
উপজেলার ২নং কিসমতগণকৈড় ইউনিয়নের উজালখলসী পূর্বপাড়া বিলে প্রায় ২০০ বিঘা তিন ফসলি কৃষিজমিতে পুকুর খনন করছেন গোপালপাড়া গ্রামের নবী উল্লাহর ছেলে বেলাল হোসেন ওরফে ব্যাটারি বেলাল। একই ইউনিয়নের বড়াইল পালাসপাড়া বিলে সরকারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করছেন গণকৈড় গ্রামের মফিজ সরকারের ছেলে হান্নান সরকার এবং বড়ইল গ্রামের এছামুদ্দিন মন্ডলের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল।
এছাড়াও ওই ইউনিয়নে আরও একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সিরাজগঞ্জে কর্মরত ডিবি কনস্টেবল মজনু, নিজেকে ডিবির ওসি পরিচয় দিয়ে রাতুগ্রাম বিলে প্রায় ৫০ বিঘা কৃষিজমিতে পুকুর খনন করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অন্যদিকে ৭নং জয়নগর ইউনিয়নের আনুলিয়া বিলে দুইটি পয়েন্টে চলছে অবৈধ পুকুর খনন। এলাকাবাসীর দাবি, ছলিম ও এরশাদের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ১৭৬ বিঘা জমি খনন করে ফেলেছে।
আইন অনুযায়ী কৃষিজমিতে পুকুর খননের জন্য প্রশাসনের লিখিত অনুমতি ও নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তার কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। অতিরিক্ত গভীর পুকুর খননের ফলে শুষ্ক মৌসুমেই আশপাশের জমিতে খরা দেখা দিচ্ছে। কৃষকদের আশঙ্কা—বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে, যা পুরো এলাকার কৃষি উৎপাদনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।
পুকুরের মাটি পরিবহনের জন্য ভারী ট্রলি ও ট্রাক চলাচলে এলাকার কাঁচা ও পাকা সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে ভ্যানচালক মান্নান বলেন,
“মাটির রাস্তা দিয়ে উঠে পাকা রাস্তায় যেতেই গাড়ি দুলে ওঠে। ভারী গাড়ির চাপে রাস্তা গর্ত হয়ে গেছে। একটু বৃষ্টি হলেই চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।”
স্থানীয় কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন,
“তিন ফসলি জমিতে পুকুর মানেই কৃষি ধ্বংস। রাত হলেই মাটি কাটে। ধুলাবালিতে রসুন, পেঁয়াজ, মসুরসহ সব ফসল নষ্ট হচ্ছে। আমরা বারবার অভিযোগ করেছি, কিন্তু কেউ শুনছে না।”
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অভিযুক্ত সিন্ডিকেটের প্রকাশ্য দম্ভ। ঢাকা–গাজীপুর থেকে আসা ছলিম নিজেকে মূল হোতা দাবি করে বলেন,
“প্রশাসনের অনুমতি আছে আবার নাই। স্যাররা মৌখিক অনুমতি দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালীন শতাধিক পুকুর কেটেছি, আমি জানি কিভাবে কাটতে হয়।”
লিখিত অনুমোদন দেখাতে বললে হুমকির সুরে তিনি বলেন,
“বেশি কথা বললে চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেবো। বহু সাংবাদিক আমি সামলাইছি—এগুলো আমার প্রতিদিনের খেলা।”
এ বিষয়ে দুর্গাপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন,
“পুকুর খননের বিষয়টি ভূমি খাতের। এটি এসিল্যান্ড ও ইউএনও দেখেন। ভ্রাম্যমাণ অভিযানে পুলিশ চাইলে আমরা সহায়তা দিই।”
সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজুর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“মৌখিক বা লিখিত কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। এসব দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। লোক পাঠানো হয়েছিল, কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপরও যদি মাটি কাটে, তাহলে মামলা দেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “একটি পুকুরে একবারের বেশি মামলা দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে কৃষকদের আরও জোরালোভাবে এগিয়ে আসতে হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—যদি কোনো অনুমতি না থাকে, তাহলে রাতের পর রাত কীভাবে পুকুর খনন চলে? প্রশাসনের অভিযানের আগেই কীভাবে শ্রমিকরা সরে যায়, ব্যাটারি গাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়? তাহলে কি প্রশাসনের ভেতর থেকেই অবৈধ সিন্ডিকেট আগাম তথ্য পাচ্ছে?
দ্রুত অবৈধ পুকুর খনন ও মাটি পরিবহন বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার এবং জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তা না হলে দুর্গাপুর উপজেলার তিন ফসলি জমি, কৃষি ও পরিবেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে—এমন আশঙ্কাই এখন সচেতন মহলের ।