মুসলিম উম্মাহর কেন এ শক্তিহীন পতিত দশা?
- Update Time : ১২:৫৩:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
- / ৩২ Time View

ধর্মের নামে নাশকতা ধর্মের বিরুদ্ধে
অসখ্য ভেজাল ঔষধও ঔষধের রূপ ধরে বাজারে আসে। সেগুলি প্রচুর খরিদদারও পায়। তেমনি মিথ্যা বা ভেজাল ধর্মও ধর্মের রূপ ধরে সমাজে আসে। সেগুলিও বিপুল অনুসারী পায়। বনি ইসরাইলীদের কোন পৌত্তলিক কাফের বা নাস্তিক পথভ্রষ্ট করেনি। পথভ্রষ্ট করেছে তাদের আলেমগণ। তারা সফল ভাবে হযরত মূসা (আ:)’র শেখানো প্রকৃত ইসলামকে জনগণ থেকে আড়াল করেছে। হযরত মূসা (আ:)’র শিক্ষাকে যখন হযরত ঈসা (আ🙂 জীবন্তু করার চেষ্টা করলেন তখন ইহুদী আলেমগণ মিথ্যা অপবাদ দিকে তাঁকে জেরুজালেমের রোমান শাসকের হাতে তুলে দিল। তাঁকে হত্যা করারও দাবী জানালো। মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের সে অপরাধের বিবরণ অতি বিশদ ভাবে তুলে ধরেছেন পবিত্র কুর’আনে।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাযে কেরামের জিহাদ ও তাদের কুরবানীকে যারা সাধারণ মুসলিমদের থেকে আড়াল করে রেখেছে তারাও কোন পৌত্তলিক কাফের নয়। তারা ইহুদী, নাছারা বা নাস্তিক নয়। আড়াল করে রাখার সে কাজটি তো তাদের, যাদের হাতে অধিকৃত হয়ে আছে ৫০টি বেশ মুসলিম রাষ্ট্র এবং সে দেশগুলির লক্ষ লক্ষ মসজিদ মাদ্রসা ও সুফি খানকা। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে জিহাদ করলেন, তাদের সে সূন্নত নিয়ে এসব মোল্লা মৌলভী, পীর দরবেশ, মোহাদ্দেস ও ইমামগণ বাঁচে না। তিনি যে যেরূপ বর্ম পড়তেন, তলোয়ার নিয়ে যেরূপ যুদ্ধে যেতেন এবং শত্রুর হত্যায় যেরূপ যুদ্ধের ময়দানে নামতেন – নবীজী (সা:)’য়ের সে মহান সূন্নতগুলি এসব মোল্লা মৌলভী, পীর দরবেশ, মোহাদ্দেস ও ইমামদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। বরং গুরুত্ব পেয়েছে, খাওয়ার পর নবীজী (সা:) যেরূপ মিষ্টি খেতেন, পাগড়ি পড়তেন, মেছওয়াক করতেন ও দাড়ি রাখতেন -সেগুলি। এসবই হলো নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নত থেকে দেশের মোল্লা মৌলভী, পীর দরবেশ ও আলেম আল্লামাদের দূরে সরার নমুনা। তাদের কারণেই বাংলাদেশের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নবীজী (সা:)’য়ের অনুসৃত পূর্ণাঙ্গ ইসলাম বেঁচে নাই। নবীজী (সা:) যেমন তাঁর ১০ বছরের শাসনামলে মুসলিমদের বিশ্বশক্তি হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিলেন -সে সাফল্যের মূলে তাঁর দাড়ি, টুপি, মেছওয়াক ও মিষ্টি খাওয়ার সূন্নত ছিল না; সেটি ছিল নবীজী (সা:) ও তাঁর অনুসারীদের জিহাদ এবং সে জিহাদে তাদের শ্রম, অর্থ ।
ইসলামের লেবাসধারী অনেকে ইদানিং বলা শুরু করেছে, আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির প্রকল্প নিয়ে সমাজিক প্রতিষ্ঠান বা কম্যুনিটি গড়ে তোলাই ইসলামের মূল লক্ষ্য। তারা বলে, এটিই মুসলিমদের প্রধান কাজ; ইসলামী রাষ্ট নির্মাণ নয়। আধ্যাত্মিকতাকেই তারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম রূপে চিত্রিত করেন। ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ, শরিয়ার প্রতিষ্ঠা, দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ –এসবকে তারা নিজেদের ধর্মীয় কাজকর্মের তালিকা থেকেই বিদায় দিয়েছেন। অনেকে বলছেন, সেক্যুলারিজমের সাথে ইসলামের কোন সংঘাত নেই। এভাবে জায়েজ বলছেন সেক্যুলারিজমকেও। এভাবে তারা বিভ্রান্তি আনছে যেমন ইসলাম বুঝায়, তেমনি ধর্মপালনে।
বাংলায় মুসলিম বিজয়ের পর বাঙালি মুসলিমদের মাঝে ইসলামের জোয়ার শুরু হয়। শ্রী চৈতন্য দেব ভক্তিমূলক গান গেয়েই ইসলামের সে জোয়ার রুখে দিয়েছিলেন। শ্রী চৈতন্য দেবের সাফল্যের মূল কারণ, তিনি হিন্দু জনগণকে দেখিয়েছিলেন ধর্ম–পালন ও ধার্মিক সাজার সহজ পথ। হিন্দুরা তখন গানের মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজেছে। একই ভাবে গানের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা ও মনের তৃপ্তি খোঁজে সুফি তরিকার অনুসারী বহু মুসলিমও। ফলে তাদের কাছে কদর বেড়েছে লালন ফকির ও হাসন রাজার মত গায়কদের। ভক্তি ভরে গান গাইলে এবং ভক্তির অতিশায্যে পাগল হলে, এবং পাগলের বেশে এমনকি উলঙ্গ হলেও মহান আল্লাহ তায়ালা অধিক খুশি হবেন – এমন আজগুবি ধারণাও অনেকের। এরূপ পাগল মারা গেলে তার কবর ঘিরে বসে গান এবং মদ, গাঁজা ও হিরোইন সেবনের আসর।। ভাবটা এমন, মনে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি থাকলে গান গেয়ে মদ, গাঁজা ও হিরোইন সেবনে দোষ নেই, এবং প্রয়োজন নেই নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত ন্যায় ইবাদত পালনের!
ধর্ম নিয়ে এমন বিভ্রান্তিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে খৃষ্টান ধর্মের অনুসারীগণ। যীশু খৃষ্টের প্রতি ভালবাসার গান গাওয়াই হলো খৃষ্টান ধর্মের প্রধান ধর্মকর্ম বা ইবাদত। ধর্মযাযকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, যীশু খৃষ্টকে হৃদয়ে স্থান দিলেই জান্নাত সুনিশ্চিত। তাই রবিবারে গীর্জায় দল বেঁধে যীশু খৃষ্টের প্রতি ভক্তি ভরে গান গাওয়া হয়। এ ধর্মে হারাম হালালের কোন বালাই নেই। ধর্ম যাজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, পাপ যত বিশাল ও জঘন্যই হোক –তাতে শাস্তির ভয় নেই। অভয় দেয়া হয়, তাদের সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত হযরত ঈসা (আ:) বহু আগেই করে গেছেন। তাদের দায় শুধু গীর্জায় গিয়ে তাঁর প্রতি ভক্তিতে গান গাওয়া। চিকিৎসার নামে ঝাড় ফুঁকের মধ্যেও যেমন অজ্ঞ মানুষের পরম তৃপ্তিবোধ ও মনতুষ্টি থাকে, খৃষ্টানদের মাঝে তেমনি তৃপ্তিবোধ ও মনতুষ্টি রয়েছে এরূপ ধর্মপালনেও। অন্যের ধর্ম পালনে বা ত্যাগ স্বীকারে যে নিজের ধর্ম পালন হয় না –তা নিয়ে তাদের সামান্যতম চিন্তাভাবনা নাই।
ইসলামী রাষ্ট্রনির্মাণের বদলে প্রতিটি মুসলিম দেশে গুরুত্ব পাচ্ছে সুরম্য মসজিদ নির্মাণ। এদিক দিয়ে রেকর্ড গড়ছে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে নৃশংস স্বৈর শাসকগণ। ইসলামী রাষ্ট্রনির্মাণের লক্ষ্যে ভোট দিতে বা রাস্তায় মিছিল করতেও তারা রাজী নয়, কিন্তু মসজিদ নির্মাণে তারা লাখ লাখ টাকা দান করতে রাজী। ফলে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে দ্রুত বেড়েছে মসজিদের সংখ্যা। মসজিদ নির্মাণ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ। কিন্তু সেসব মসজিদগুলিতে কতটা বেঁচে আছে মদিনার মসজিদে নববীর সূন্নত? পরিতাপের বিষয় হলো, এসব মসজিদগুলি ব্যবহৃত হয় স্রেফ নামাজ আদায়ের স্থান রূপে। নামাজ শেষ হলে মসজিদের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। অথচ মসজিদে নববীর মেঝে ব্যবহৃত হতো জ্ঞানদানে মাদ্রাসা রূপে। ব্যবহৃত হতো মুসলিম কম্যুনিটির মিলন স্থান ও জিহাদ সংগঠিত করার কাজে। খোলাফায়ে রাশেদার আমলে মসজিদে নববীই ছিল রাষ্ট্রের একমাত্র সচিবালয় তথা সেক্রেটারিয়েট।
মহান নবীজী (সা:)’য়ের গভীরতম প্রজ্ঞার পরিচয় মেলে তাঁর স্ট্র্যাটেজি দেখে। তবে মনে রাখতে হবে, নবীজী (সা:) যা কিছু করেছেন -সেগুলি করেছেন সর্বজ্ঞানী রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ অনুযায়ী। তাঁর পবিত্র কর্মজীবন ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার শো-কেস। মহান রব মানুষকে কিরূপ চরিত্র, কিরূপ আচরণ, কিরূপ কর্ম ও কিরূপ ইবাদতের মাঝে দেখতে চাইতেন, নবীজী (সা:) সেটিই জীবনে করে দেখিয়ে গেছেন। তাই একমাত্র নবীজী (সা:)’য়ের পথই হলো মহান আল্লাহকে খুশি করার পথ। সে জন্য কোন পীর দরবেশের দিকে ঝুঁকার প্রয়োজন নেই। এজন্যই পবিত্র কুর’আন পাঠের সাথে জরুরি হলো নবীজী (সা:)’য়ের জীবনী পাঠ। নবীজী (সা:) ছিলেন সিরাতাল মুস্তাকীমের শো-কেস -যে সাক্ষ্যটি খোদ মহান আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন সুরা ইয়াসিনের ৪ নম্বর আয়াতে। সে সাক্ষ্যটি তিনি দিয়েছেন পবিত্র কুর’আনের কসম খেয়ে। তাই যারা নবীজী (সা:)’য়ের ন্যায় ইসলামী রাষ্ট্রনির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জিহাদে নাই, বুঝতে হবে তারা নাই সিরাতাল মুস্তাকীমের উপর। এবং তারা নবীজী (সা:)’য়ের অনুসারীও নয়। এরাই হলো নিশ্চিত পথভ্রষ্ট তথা দোয়াল্লীন। নবীজী (সা:)’য়ের নবুয়তের মেয়াদ ছিল মাত্র ২৩ বছর। সে ২৩ বছরের মাঝে ১৩টি বছর কেটেছে মক্কায়। লক্ষণীয় হলো, নবীজী (সা:) তাঁর ১৩ বছরের মক্কী জীবনে একটি মসজিদও সেখানে নির্মাণ করেননি। অথচ নবীজী (সা:)’য়ের মক্কায় অবস্থান কালেই ৫ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছিল। লক্ষ্যণীয় হলো, নবীজী (সা:) শুরুর কাজটি শুরুতে করেছিলেন। সেটি ছিল পরিশুদ্ধ মানব নির্মাণ। আর সে কাজে হাতিয়ার ছিল পবিত্র কুর’আন। শুরু থেকেই নবীজী (সা:)’য়ের পূর্ণ মনযোগ ছিল ইসলামী রাষ্ট্র গড়ায়। ফলে ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে যা কিছু অতি প্রয়োজনীয় -সেগুলি প্রস্তুত করতে তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। ফলে সে আমলেই সে রাষ্ট্রের যোগ্য সৈনিক, সেনাপতি, প্রশাসক, শিক্ষক ও বিচারক নিজ হাতে গড়ছিলেন। কারণ, মহান আল্লাহ তায়ালাও সেটিই চাইতেন। ফলে মদিনায় হিজরত মাত্রই সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র খাড়া করতে কোন বেগ পেত হয়নি। বরং মক্কী জীবনে যাদেরকে তিনি গড়েছিলেন তারাই প্রমাণিত হয়েছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক, প্রশাসক, বিচারক ও জেনারেল রূপে।
ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার কাজটি স্রেফ দোয়া দরুদে হয় না, সে কাজে অনিবার্য হলো শত্রুশক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ। নবীজী (সা:) সে বিষয়টি পুরোপুরি জানতেন। তাই তাঁর পূর্ণ মনযোগ ছিল, আসন্ন জিহাদের জন্য সর্বোচ্চ মানের মুজাহিদ গড়ায়। আর সাচ্চা মুজাহিদ তো সেই হতে পারে যার রয়েছে পরিপক্ক ঈমান; আর সেরূপ ঈমান গড়তে যা অপরিহার্য তার হলো পবিত্র কুর’আন লব্ধ জ্ঞান। চাই, আখেরাতের ভয়। সে সাথে চাই, মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে জবাবদেহীতার ভয়। এবং সকল যোগ্যতার মূলে হলো, গভীর তাকওয়া। সে কাঙ্খিত তাকওয়া সৃষ্টি হয় একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা-প্রদত্ত ওহীর জ্ঞানে। সে জ্ঞানের টেক্সটবুক হলো পবিত্র কুর’আন। কুর’আন বুঝার কাজকে বাদ দিয়ে শুধু মসজিদ গড়ায় মনযোগ দিলে তাকওয়ার গড়ার কাজটি যে হয় না তারা প্রমাণ হলো, দুর্নীতির জোয়ারে ভাসা আজকের বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে বিশ্বমাঝে দুর্বৃত্তির সর্ববৃহৎ শো-কেসে। এদেশটি দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হয়েছে। অথচ এদেশে প্রতি বর্গ মাইলে মসজিদ ও মাদ্রাসার সংখ্যা বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় অধিক। তাবলিগ জামায়াতের সবচেয়ে বড় ইজতেমাটি হয় এদেশে।
মসজিদও যেখানে নাশকতার হাতিয়ার
মুসলিম ইতিহাসে মসজিদ দুই রকমের। এক). মসজিদে নববীর মসজিদ; দুই). মসজিদে জিরার মসজিদ। এ দু’টি মসজিদ দু’টি বিপরীত আদর্শ এবং দু’টি বিপরীত এজেন্ডার প্রতিনিধিত্ব করে। মসজিদে নববী শুধু ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য ব্যবহৃত হয়নি, বরং ব্যবহৃত হয়েছে কুর’আন শিক্ষা, মুসলিমদের জামায়াতবদ্ধ করা, জিহাদ সংগঠিত করা এবং মুজাহিদ গড়ার কেন্দ্র রূপে। খেজুর গাছের কাণ্ড ছিল খুঁটি, মসজিদটির ছাদ ছিল খেজুর পাতার এবং মেঝে ও দেয়াল ছিল মাটির। নবীজী (সা:) যখন বাংলাদেশের চেয়ে ২০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রের শাসক তখন তাঁর জন্য কোন প্রাসাদ ছিল না। কোন সেক্রেটারিয়েটও ছিল না। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন, যুদ্ধ পরিচালনা করতেন, গর্ভনর ও প্রশাসকের নিয়োগ দিতেন এবং বিদেশী দূতদের সাথে দেখা করতেন মদিনার এই মসজিদটির মেঝেতে বসে। তখন মুসলিমদের কোন সংসদ ছিল না; মসজিদের মেঝেতে বসতো সাহাবীদের নিয়ে পরামর্শ সভা। মসজিদের মেম্বরে দাঁড়িয়ে তিনি জনগণকে কুর’আনের তা’লীম দিতেন, দায়িত্বসচেতন করতেন এবং উম্মাহকে একতাবদ্ধ রাখতেন। খলিফা প্রতি জুম্মাতে খুতবা দিতেন; এখানে বসেই তিনি জনগণের কথা শুনতেন এবং তাদের প্রশ্নের জবাব দিতেন। মসিজদে নববী সে ভূমিকা পালন করেছে খলিফা রাশেদার আমলেও।
অপর দিকে মসিজদে জিরা নির্মিত হয়েছিল ভিন্ন উদ্দেশ্যে। মসজিদও যে কিরূপে শয়তানী শক্তির হাতে হাইজ্যাক হতে পারে তার নমুনা হলো মসজিদে জিরা। নামাজীদের মাঝে কুর’আনের জ্ঞান ও তাকওয়া বৃদ্ধি নয়, বরং লক্ষ্য ছিল ধর্মের লেবাস ধারণ করে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি ও ফিতনা সৃষ্টি করা। লক্ষ্য ছিল, নবীজী (সা:)’য়ের প্রচারিত ইসলাম থেকে মুসলিমদের দূরে সরানো। ফলে এটি ছিল মসজিদের লেবাসে শয়তানের প্রতিষ্ঠান। মসজিদে জিরার ক্ষতিকর কার্যকলাপ মহান রব’য়ের দৃষ্টি এড়ায়নি। মহান রব’য়ের নির্দেশেই নবীজী (সা:) মসজিদে জিরাকে ধ্বংস করেন। পরিতাপের বিষয় হলো, মসজিদে নববীর আদর্শে কাজ করছে এমন মসজিদ বাংলাদেশসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তেমন বেঁচে নাই। নবীজী (সা:)’য়ের অনুসৃত ইসলামের ন্যায় তাঁর স্থাপিত মসজিদে নববীর আদর্শও প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। অধিকাংশ মসজিদ পরিণত হয়েছে স্রেফ নামাজ আদায়ের ঘরে। বরং বহু মসজিদ অনুসরণ করে মসিজদে জিরার আদর্শ; সেগুলি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে স্রেফ বিশেষ কোন ফেরকা, ত্বরিকা বা মজহাবের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে। সেগুলির কাজ হয়েছে মুসলিমদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং জিহাদ থেকে জনগণকে দূরে রাখা। অথচ মসজিদই হলো ইসলামের দুর্গ; কোন ভূমিতে মসজিদ নির্মিত হলে সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদ শুরু হয়। কিন্তু এ জামানার মসজিদগুলি সে ভূমিকা পালন করছে না। ফলে মসজিদের সংখ্যা বিপুল ভাবে বাড়লেও ইসলামের বিজয় অর্জিত হচ্ছেনা। এবং কোথাও নির্মিত হচ্ছে না ইসলামী রাষ্ট্র।
যারা ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জিহাদকে বাদ দিয়ে স্রেফ মসজিদ নির্মাণ ও মসজিদের খেদমতকে গুরুত্ব দেয় -তাদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ তায়ালার হুশিয়ারীটি এসেছে নিচের আয়াতে:
أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ ٱلْحَآجِّ وَعِمَارَةَ ٱلْمَسْجِدِ ٱلْحَرَامِ كَمَنْ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْـَٔاخِرِ وَجَـٰهَدَ فِى سَبِيلِ
ٱللَّهِ ۚ لَا يَسْتَوُۥنَ عِندَ ٱللَّهِ ۗ وَٱللَّهُ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلظَّـٰلِمِينَ
অর্থ: “হাজীদের পানি পান করানো এবং মসজিদে হারামের রক্ষণাবেক্ষণকে কি তোমরা তাদের সমান পূণ্যের মনে করো -যারা ঈমান আনলো আল্লাহর উপর, আখেরাতে উপর এবং জিহাদ করলো আল্লাহর রাস্তায়? আল্লাহর কাছে উভয়ের কর্ম সম-পূণ্যের নয়। আল্লাহ জালেম কওমদের হেদায়েত দেন না।” –(সুরা তাওবা, আয়াত ১৯)।
পরিতাপের বিষয় হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার এই কঠোর হুশিয়ারী থেকে শিক্ষা নেয়ার কাজটি মুসলিমদের মাঝে হয়নি। ফলে ধর্মকর্মের নামে বেড়েছে চরম ভ্রষ্টতা। ঈমানদারকে শুধু ইবাদত ও পূণ্য কর্ম নিয়ে বাঁচলে চলে না, সে ইবাদত ও পূণ্য কর্মের মধ্যে প্রায়োরিটির ধারণাটিও থাকতে হয়। নেক কর্ম হাজারো প্রকারের। পথের উপর থেকে কাঁটা সরানোও নেক কর্ম। তবে রাষ্ট্রের বুক থেকে স্বৈরাচারী জালেম শাসক সরানোর সাথে কাঁটা সরানোর তূলনা চলেনা। পথের কাঁটা সরাতে জান ও মালের কুর’বানী দিতে হয় না, কিন্তু সে কুর’বানী দিতে হয় জালেম শাসককে সরাতে। তাই এটি জিহাদ। পথ থেকে কাঁটা সরানো নেক কর্ম হলেও সেটি আল্লাহর পথে জিহাদ নয়। জিহাদে থাকতে হয় মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরিয়া আইনকে বিজয়ী করার তাড়না। কিন্তু সেরূপ একটি বিশাল এজেন্ডা পথের কাঁটা সরানোতে থাকে না। তাই যে ব্যক্তি নেক আমলের নামে সারাটি জীবন পথের কাঁটা সরাতে কাটিয়ে দেয় -সে তার সামর্থ্যের সঠিক ব্যবহার করে না। সেটি নিজের উপর জুলুম। অথচ জালেম শাসকের স্থলে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলে পথ থেকে কাঁটা সরানোর ন্যায় নানা রূপ কল্যাণকর কর্মের দায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি নিজ কাঁধে তুলে নেয়।
উপরিউক্ত আয়াতে জুলুম বলতে যা বুঝানো হয়েছে তা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেক কর্মকে পরিহার করা এবং কম গুরুত্বের নেক কর্ম নিয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়া। ব্যর্থতা এখানে প্রায়োরিটি নির্ধারণে; অর্থাৎ অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বাদ দিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আঁকড়ে ধরা। শত্রুর হামলার মুখে মসজিদ মাদ্রাসার খেদমতে নামাটি বেকুবি; তখন হাতের কাছে যা আছে তা নিয়ে যুদ্ধে নামতে হয়। জুলুম এখানে নিজ বিবেকের উপর। মহান আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি সুস্থ মানুষকে বিস্ময়কর বুদ্ধিবৃত্তিক, দৈহিক ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য দিয়েছেন, সেগুলি মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে দেয়া বিশেষ নিয়ামত। সে নিয়ামতগুলিকে সঠিক ভাবে ব্যবহার না করাটি বড় রকমের খেয়ানত। পরিতাপের বিষয় হলো, কোটি কোটি মুসলিম এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে নিজ কল্যাণে এবং উম্মাহর কল্যাণে সে বিশাল নিয়ামতের ব্যবহার না করেই। এভাবে চরম অব্যবহার ও জুলুম হচ্ছে মহান রব’য়ের দেয়া নিয়ামতের। উদাহরণটি এমন এক বেকুব ব্যক্তির ন্যায়, যে ঘরে বহু কোটি টাকার সঞ্চয় থাকা সত্ত্বেও অনাহারে থেকেছে এবং অর্থ ব্যয় না করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। বুদ্ধিমান হলে নানা নেক আমলে সে সম্পদের বিনিয়োগ করতো; তাতে মহান রব’য়ের মাগফিরাত লাভে সাহায্য মিলতো।
ব্যর্থতা নিজের আবিষ্কারে
মানব জীবনে সবচেয়ে বড় খেয়ানতটি অর্থের অপচয় নয়, বরং সেটি হলো নিজের অফুরন্ত সামর্থ্যকে আবিষ্কার না করা এবং সেটিকে কাজে না লাগানো। এটি কোন মামুলি বিষয় নয়, বরং এটি এক বিশাল আত্মঘাতী নাশকতার অপরাধ। নাশকতা এখানে মহান রব’য়ের অসীম ও অমূল্য নিয়ামতকে কাজে না লাগিয়ে বিনষ্ট করা বা অব্যবহৃত রাখা। এ অপরাধের জন্য পরকালে শাস্তি পেতে হবে। রাষ্ট্রের মূল কাজ মহান রব’য়ের দেয়া নিয়ামতের আবিষ্কারে ও সদ্ব্যবহারে ব্যক্তির জীবনে সুযোগ করে দেয়া। শিক্ষা ব্যবস্থার তো এটিই কাজ। তখন মানব সামর্থ্যের বিস্ফোরণ ঘটে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র তখন দ্রুত সামনে এগুয়। পৃথিবী পৃষ্ঠে যখন কোন রাষ্ট্র ছিল না, তখন সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কোন প্রতিষ্ঠানই ছিল না। পানাহারে বাঁচা ও সন্তান প্রজননের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ ছিল না। ফলে মানব জাতির জীবনে হাজারো বছর কেটে গেছে কোন উন্নয়ন ছাড়াই। মহান নবীজী (সা:) শুধু ইসলামের প্রচারক ছিলেন না; বরং তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো, তিনি ছিলেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রটির নির্মাতা। এবং সে রাষ্ট্রটিই ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কল্যাণকর রাষ্ট্র। তিনি মানব কল্যাণের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে যান। সে রাষ্ট্রের সুফল হলো, কোটি কোটি মানব সন্তানকে দেয়া মহান রব’য়ের বিশাল নিয়ামত বেঁচেছে নাশকতার হাত থেকে। সে রাষ্ট্রের কল্যাণে গোত্রে গোত্রে বিভক্ত বর্বর আরবগণ পরিণত হয়েছে বিশ্বশক্তিতে। নবীজী (সা:) যদি তাঁর কর্মকে স্রেফ ধর্মপ্রচার ও মসজিদ নির্মাণে সীমিত রাখতেন তবে কি বিশ্বশক্তি রূপে মুসলিমদের উত্থান ঘটতো? মুসলিমগণ কি পেত জানমালের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা?
নবীজী (সা:)’য়ের অনুসরণের অর্থ, তাঁর পূর্ণ অনুসরণ। আংশিক অনুসরণের অর্থ, তার জীবনের বাকি অনুসরণীয় বিষয়গুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এখানেই মুসলিমদের গুরুতর অপরাধ। মুসলিমগণ ইবাদতে নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নতগুলি মেনে চলেও তাঁর রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার সূন্নত মানে না। এক্ষেত্রে তারা সেক্যুলারিস্ট, ফ্যাসিস্ট, জাতীয়তাবাদী, রাজতন্ত্রী ও বাম ধারার অনুসারী। রাষ্ট্র ও রাজনীতি জাতির জীবনে ইঞ্জিনের কাজ করে। একটি জাতি কোন দিকে পরিচালিত হবে সেটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও পীরের দরবার থেকে ঠিক হয়না। সেটি ঠিক করে রাষ্ট্রের চালকের আসনে বসা ব্যক্তিটি। তাই নবীজী (সা:) শুধু নামাজের ইমামতি করেননি, রাষ্ট্রের ইমামতিও করেছেন। রাষ্ট্রের চালকের আসনে তিনি ১০টি বছর বসেছেন। পরিতাপের বিষয়, নবীজী (সা:) নিজ জীবনের ১০ বছর যাবত রাজনীতির যে সূন্নত পালন করলেন, আলেমদের জীবনে সে সূন্নত এক দিনের জন্যও স্থান পায়নি। ফলে তারা ব্যর্থ হয়েছে নবীজী (সা:) নির্মিত রাষ্ট্রের ন্যায় রাষ্ট্র নির্মাণে। বিদ্রোহ এখানে শুধু নবীজী (সা:)য়ের আদর্শের বিরুদ্ধে নয়, বরং সে বিদ্রোহ মহান আল্লাহ তায়ালার বিরুদ্ধেও। অথচ এ বিদ্রোহীরা আবার নিজেদের আশেকে রাসূল ও আল্লাহর ওলী রুপে প্রচার করে। তারা ভুলে যায়, নবীজী (সা:)’র অনুসরণের অর্থ আল্লাহ তায়ালার অনুসরণ। এবং তাঁর নীতি ও আদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অর্থ মহান আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তাই রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মুসলিমদের বিদ্রোহটি খোদ মহান রব’য়ের বিরুদ্ধে।
জাপানের জনসংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে কম। দেশটির ভূমি বাংলাদেশের চেয়েও সম্পদহীন, বেশীর ভাগ পাহাড় পর্বতে ভরা। কিন্তু জাপানের অর্থনীতি বিশ্বে তৃতীয় -মার্কিন যুক্তরাষ্ট ও চীনের পরই। দেশটির সম্পদের উৎস জনসম্পদ। প্রতিটি ব্যক্তির জীবনে মহান রব নিয়ামতের যে বিশাল খনি রেখেছেন -তন্ন তন্ন করে আবিষ্কার করা হয় সে খনি। সোনার খনির চেয়েও সমৃদ্ধ হলো সে খনি। সোনার খনির দেশ হলো দক্ষিণ আফ্রিকা; কিন্তু জাপান দক্ষিণ আফ্রিকার বহু গুণ সমৃদ্ধ। কারণ জাপান সফল হয়েছে বহু কোটি মানব খনি আবিষ্কারে। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি হয়না; মৃত দেহের সাথে সে ব্যক্তির অনাবিষ্কৃত নিয়ামতগুলিকেও কবরে পাঠানো হয়। অথচ রাষ্ট্রের দায় হলো, মানুষের সামর্থ্যের আবিষ্কার ও তার উৎকর্ষ। সে সথে কাজে লাগাতে হয় সে সে সামর্থ্যগুলি। নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের আমলে সে কাজটি সুচারু ভাবে হয়েছিল; ফলে আরবের ভেড়ার রাখাল, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পরিণত হয়েছে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ জেনারেল, শ্রেষ্ঠ সৈনিক, শ্রেষ্ঠ গভর্ণর, শ্রেষ্ঠ বিচারক, শ্রেষ্ঠ প্রশাসক ও দ্বীনের শ্রেষ্ঠ প্রচারকে। প্রতিটি মালিকই চায়, তার বাগানের প্রতিটি গাছই পর্যাপ্ত ফল দিক। তেমনি মহান আল্লাহ তায়ালাও চান, তার প্রতিটি বান্দা তার সামর্থ্যের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করুক। তাই অপচয় করাই শুধু গুনাহ নয়, বরং গুরুতর অপরাধ হলো আলস্য ও অবহেলার মধ্য দিয়ে মহান রব’য়ের দেয়া অমূল্য সামর্থ্যকে অব্যবহৃত রাখা। ব্যক্তিকে শুধু অর্থ সম্পদের সাদকা দিলে চলে না; জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্যেরও সাদকা দিতে হয়। সে কাজটি করতে হয় তার কথা ও কলমের মাধ্যমে। মহান আল্লাহ তায়ালা যে ব্যক্তিকে সেরা ডিগ্রিধারী প্রফেসর হওয়ার সামর্থ্য দিয়েছেন, সে যদি একখানি কিতাব না লিখে এবং কোন সেমিনারে বক্তব্য না রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় -তবে তার চেয়ে ব্যর্থ মানুষ আর কে হতে পারে? সে ব্যক্তি এমন এক বিশাল বৃক্ষের ন্যায় যে কোন ফল না দিয়েই মারা গেল। ঈমানদারদের রাষ্ট্রে জ্ঞানের জোয়ার আসবে -সেটিই তাই কাঙ্খিত। পবিত্র কুর’আনে আগে আরবী ভাষায় কোন গ্রন্থ ছিল না। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের ফলে আরবী ভাষা অতি অল্প সময়ের মাঝে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষায় পরিণত হয়। আজ সে ইসলামী রাষ্ট্র নাই, ফলে জ্ঞানের সে জোয়ারও নাই। ফলে লন্ডনের ন্যায় একটি মাত্র শহরে যে পরিমাণ বই ছাপা হয়, তা ২২ টি আরব রাষ্ট্রেও ছাপা হয়না।
অথচ অধিকাংশ মানুষের ব্যর্থতা তার নিজের আবিষ্কারে। সে যে মহান রব’য়ের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি -সেটিও তার কাছে অজানা থেকে যায়। ফলে সে নিজেকে আরেক প্রজাতির পশু ভাবতে শুরু করে। ডারউইন তো সেটিই শিখিয়েছে। মানব জাতির সকল ব্যর্থতার শুরু নিজেকে আবিষ্কারের ব্যর্থতা থেকে। তাই প্রতিটি ঈমানদারের দায়, তার নিজ সামর্থ্যের আবিষ্কার, তাতে সমৃদ্ধি আনা এবং মানব কল্যাণে তার পূর্ণাঙ্গ বিনিয়োগ। গ্রহ নক্ষত্র ও সাগর মহাসাগরের খোঁজ নেয়ার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো তার নিজেকে জানা এবং তার মহান রবকে জানা। প্রতিক্ষণ এমন তাড়না নিয়ে বাঁচাই হলো শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি। ইসলাম এটি ইবাদত। তখন ইনসানে কামেল তৈরী হয়। যে সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা অধিক, সে সমাজ সভ্য রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মাণে ইতিহাস গড়ে। নবীজী (সা:) ও সাহাবাদের আমলে তো সেটিই দেখা গেছে।
ইসলাম পালনে অপূর্ণতা
ব্যক্তির অফুরন্ত সামর্থ্য শুধু হাজীদের পানি পান করানো, মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ ও সেগুলির খেদমতের মধ্যে নিঃশেষ হতে পারেনা। ইসলাম পালনের ক্ষেত্রে এটি এক দারুন অপূর্ণতা। যারা এরূপ অপূর্ণতা নিয়ে বাঁচে, তাদেরকে সুরা তাওবার উপরিউক্ত আয়াতে জালেম বলা হয়েছে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা এমন ভ্রষ্ট চেতনাধারীদের হিদায়েত দেন না। তাদের জন্য এটি এক বিশাল শাস্তি। এ নিয়ে বিতর্ক নাই যে, হাজীদের পানি পান করানো এবং মসজিদ নির্মাণ ও মসজিদের খেদমত করা নেক কর্ম। কিন্তু সেটি মহান আল্লাহ তায়ালার পথে জিহাদের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। লক্ষ লক্ষ হাজীকে পানি পান করালে এবং হাজার হাজার মসজিদ নির্মাণ করলেও মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডা বিজয়ী হয়না; প্রতিষ্ঠা পায়না তাঁর সার্বভৌমত্ব ও শরিয়া আইন। তাতে বিলুপ্ত হয় না ভাষা বর্ণ ও অঞ্চল ভিত্তিক বিভক্তি, নির্মূল হয়না দুর্বৃত্তি এবং প্রতিষ্ঠা পায়না সুবিচার। তখন অক্ষত থেকে যায় আল্লাহ তায়ালার জমিনে শয়তান ও তার অনুসারীদের দখলদারি। অপর দিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলে মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ, সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজীদের সেবাদানের কাজটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে এসে যায়।
ধর্মপালনের নামে বাংলাদেশের মুসলিমদের পথভ্রষ্ট করার অতি সনাতন কৌশলটি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশের সেক্যুলারিস্টগণ। কৌশলের অংশ রূপে তারা লালন শাহ ও হাসন রাজার গানের খোঁজ করছে। ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের আন্দোলন যতই তীব্রতা পাচ্ছে, সেক্যুলারিস্টদের পক্ষ থেকে ততই বাড়ছে এসব গানের গুরুত্ব। নিছক মুসলিম সেক্যুলারিস্টই নয়, এদের পিছনে দেশী বিদেশী অমুসলিমদের পক্ষ থেকেও বিপুল অর্থ, শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ হচ্ছে। ব্রিটেন, ফ্রাণ্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় পশ্চিমা দেশগুলির বিনিয়োগের সাথে বিনিয়োগ করছে ভারতও। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা প্রতিহত করার মধ্যেই রয়েছে তাদের সামরিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। তারা জানে, সভ্যতা কখনোই খানকায় গড়ে উঠে না। লক্ষ লক্ষ মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণের কারণে কোন দেশ বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়না। সেটি সম্ভব হলে বাংলাদেশেও উচ্চতর সভ্যতা গড় উঠতো, দেশটি বিশ্বশক্তিতে পরিণত হতো। অথচ সে লক্ষ্য অর্জনে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের বিকল্প নাই। কোথাও ইসলামী রাষ্ট্র নির্মিত হলে সেখানে ভূ-রাজনৈতিক শক্তির বিস্ফোরণ ঘটে। এজন্যই ইসলাম বিরোধী শক্তির টার্গেট মসজিদ মাদ্রাসা বা খানকা’র নির্মূল নয়। বরং মসজিদ নির্মাণে তারা অর্থ দেয়। এমন কি নিজ দেশের রাজধানীতে মসজিদ নির্মাণে জমিও দেয়। এমন কি জালেম শাসকেরা বড় বড় মসজিদ নিজ তদারকিতে নির্মাণ করে দেয়। সেটি জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য। সেটি ইসলামের বিরুদ্ধে পরিচালিত তাদের নিজেদের যুদ্ধকে আড়াল করার লক্ষ্যে।
————ফিরোজ মাহবুব কামাল
























