০৪:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
https://www.facebook.com/obaidul1991
এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে শতবর্ষ নয়, গুণগত শিক্ষা ও ফলাফলই হোক প্রধান মানদণ্ড–শামীম আহমেদ, সিনিয়র শিক্ষক ও মাস্টার টে্রেইনার
আমিনুল ইসলাম , দৈনিক সরকার,ঝালকাঠি প্রতিনিধি
- Update Time : ০৪:৪৪:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৩ Time View

শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সভ্যতার প্রধান ভিত্তি। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো সেই ভিত্তি নির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান প্রদান করে না; বরং তাদের নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। তাই এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বয়সের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান, পরীক্ষার ফলাফল ও সামগ্রিক অবদানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।
শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের ইতিহাস, বেশি যোগ্য—এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ, প্রতিষ্ঠানের বয়স তার ঐতিহাসিক পরিচয় নির্দেশ করে; কিন্তু বর্তমান শিক্ষার মান ও কার্যকারিতা নির্ধারণ করে না।
অন্যদিকে, অনেক অপেক্ষাকৃত নবীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সীমিত সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক সংকট ও নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও শিক্ষার মান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করছে, উচ্চশিক্ষায় সাফল্য পাচ্ছে এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। তাহলে শুধু প্রতিষ্ঠার সময়কাল কম হওয়ার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিবেচনায় পিছিয়ে থাকবে কেন? রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
জাতীয়করণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ এবং বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বয়সকে একমাত্র বা প্রধান বিবেচ্য বিষয় না করে বহুমাত্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক পরীক্ষার ফলাফল ও শিক্ষাগত অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু পাসের হার নয়, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন-অর্জন, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং উচ্চশিক্ষায় অগ্রগতিও মূল্যায়নের আওতায় আনা উচিত। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, পাঠদানের দক্ষতা ও পেশাগত নিষ্ঠা বিবেচনায় নিতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, ঝরে পড়ার হার, সহশিক্ষা কার্যক্রম, শৃঙ্খলা এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশ মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি অবকাঠামো, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিক্ষার চাহিদা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষাসেবা প্রদান এবং নারী ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শিক্ষার ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু পরীক্ষার নম্বরকে একমাত্র মানদণ্ড করা উচিত নয়। কারণ, শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা এক নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো প্রতিষ্ঠান সীমিত সম্পদ নিয়েও যদি শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে, তবে সেই অগ্রগতিও মূল্যায়নে যথাযথ স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। অর্থাৎ, ফলাফল, গুণগত মান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তাঁরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান, পরীক্ষার প্রস্তুতি, নৈতিক শিক্ষা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অবদান রাখছেন। তাঁদের শ্রম ও অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জাতীয়করণ যদি জনস্বার্থে গ্রহণ করা হয়, তবে সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ন্যায্যতা ও বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সুতরাং, এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের জন্য এমন একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত, যেখানে প্রতিষ্ঠানের বয়সের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান, ধারাবাহিক ফলাফল, শিক্ষকদের দক্ষতা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, অবকাঠামো, এলাকার শিক্ষাগত চাহিদা এবং সামাজিক অবদানকে নির্ধারিত গুরুত্ব দেওয়া হবে। মূল্যায়নের মানদণ্ড ও নম্বরবণ্টন প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে এবং পক্ষপাতের আশঙ্কা কমবে।
পরিশেষে বলা যায়, শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান আমাদের ঐতিহ্য, আর মানসম্মত প্রতিষ্ঠান আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি। ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়েই আধুনিক শিক্ষার চাহিদা ও বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। জাতীয়করণের লক্ষ্য যদি হয় শিক্ষার উন্নয়ন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের বয়সের চেয়ে শিক্ষার গুণগত মান, অর্জন ও জনকল্যাণে অবদানকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা—এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে কোনো প্রতিষ্ঠান যেন শুধু প্রতিষ্ঠাকালীন বয়সের কারণে অগ্রাধিকার বা বঞ্চনার শিকার না হয়। যোগ্যতা, গুণগত শিক্ষা, ধারাবাহিক ফলাফল ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে ন্যায়সংগত মূল্যায়নই হোক জাতীয়করণের মূল দর্শন। কারণ, জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানের বয়স নয়, শিক্ষার মানই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
আমিনুল ইসলাম , দৈনিক সরকার,ঝালকাঠি প্রতিনিধিঃ
Tag :


















