১২:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
https://www.facebook.com/obaidul1991
স্টেশন আগলে রাখা মানুষটির জীবন কেন আগলে রাখা গেল না? বুবি বেগমের অমোচনীয় প্রশ্ন…
রোমান পথিক
- Update Time : ০২:১৮:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
- / ২৭ Time View

রায়পুরা প্রতিনিধি: একটি ঝাড়ু, একটি ছোট্ট কক্ষ, আর একটি রেলস্টেশনই ছিল তাঁর পুরো পৃথিবী। ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই মেথিকান্দা রেলস্টেশনে শুরু হতো একটি পরিচিত শব্দ—ঝাঁটার শব্দ। শব্দটি শুনেই স্থানীয়রা বুঝে যেতেন ‘বুবি বেগম’ এসে গেছেন।
কেউ তার নাম জানতেন, কেউ জানতেন না। তবে সবাই চিনতেন। বাকপ্রতিবন্ধী সেই বৃদ্ধা প্রতিদিন নিঃশব্দে পরিষ্কার করে যেতেন স্টেশন। বিনিময়ে চাইতেন না বেতন, চাইতেন না সম্মাননা। কোনো যাত্রী ১০ টাকা দিলে হাসতেন, কেউ একবেলা খাবার দিলে তৃপ্তি নিয়ে খেতেন, সেটাই ছিলো তার প্রাপ্তি।
এই স্টেশনটাই ছিল তার ঘর। প্ল্যাটফর্মই ছিল তার সংসার। আর যাত্রীরাই ছিল তার আপনজন। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এভাবেই একটি স্টেশনকে নিরবে নিজের ঘর বানিয়েছিলেন ৭০ উর্ধ বয়সী বুবি বেগম। কিন্তু যে স্টেশনকে তিনি নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, সেই স্টেশনই কি তাকে আগলে রাখতে পেরেছিল?
গত শনিবার গভীর রাতে তাঁর ছোট্ট কক্ষে ঢুকে একদল দুর্বৃত্ত তার উপর নির্মম হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষিতে রক্তাক্ত করা হয় তাঁকে। লুট করে নেওয়া হয় জীবনের শেষ সম্বল—কষ্ট করে জমানো প্রায় ৪০ হাজার টাকা। কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন সবার প্রিয় বুবি বেগম।
হামলার কয়েকদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় বুবি বেগমের। তার মৃত্যুর পর প্রশাসন গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু হত্যাকারীদের শনাক্ত করলেই হবে না; এই ঘটনার পেছনে নিরাপত্তার ঘাটতি বা কোনো অবহেলা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
গতকাল বুধবার রাত ৯টাই সেই মেথিকান্দা রেলস্টেশনেই অনুষ্ঠিত হলো তার জানাজা। এতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুদ রানা, রায়পুরা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মুজিবর রহমান, নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, স্টেশনের কর্মচারী সহ শতশত মানুষ বুবির জানাযায় অংশ নেন। কিন্তু যে প্ল্যাটফর্ম বছরের পর বছর তার পদচারণায় মুখর ছিল, সেখানেই এবার নেমে এলো শোকের নীরবতা। অনেকের চোখে জল, অনেকের মুখে একটাই প্রশ্ন—এমন মৃত্যু কি প্রাপ্য ছিল বুবি বেগমের?
বুবি বেগম শুধু একজন বৃদ্ধা ছিলেন না। তিনি ছিলেন অবহেলিত মানুষের প্রতিচ্ছবি। যিনি রাষ্ট্রের কোনো তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না, কিন্তু প্রতিদিন শত শত মানুষের চলার পথ নিঃস্বার্থভাবে পরিচ্ছন্ন রেখেছিলেন।
আজও ট্রেন থামে মেথিকান্দা স্টেশনে। যাত্রীরা আসে, যাত্রীরা চলে যায়। শুধু ভোরের সেই ঝাঁটার শব্দ আর শোনা যায় না।
এখন প্রশ্ন শুধু—কারা হত্যা করল বুবি বেগমকে—তা নয়।
প্রশ্ন হলো, একজন স্বজনহীন, বাকপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধা বছরের পর বছর একটি সরকারি স্থাপনায় এতটা অসহায় অরক্ষিত জীবন কাটালেন কীভাবে?
কেন তার জীবনের জন্য ছিল না ন্যূনতম নিরাপত্তা?
কেন তার বেঁচে থাকার লড়াই সবার চোখে পড়লেও, তার নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকারটি কারও দায়িত্ব হয়ে ওঠেনি?
হয়তো এই স্টেশন বহু মানুষকে মনে করিয়ে দেবে—কিছু মানুষের মৃত্যু শুধু একটি সংবাদ নয়, আমাদের মানবিকতার আয়নায় ভেসে ওঠা এক নিঃশব্দ প্রশ্ন।
Tag :

























