০২:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬

যেভাবে চাপানো হলো একাত্তরের যুদ্ধ এবং হাতছাড়া হলো অভূতপূর্ব সুযোগ —– ফিরোজ মাহবুব কামাল

Reporter Name
  • Update Time : ০৪:৩৪:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ২৪১ Time View

 

যেভাবে চাপানো হলো যুদ্ধ :

একাত্তরের যুদ্ধ পাকিস্তান সরকার ডেকে আনেনি। কারণ সে মুহুর্তে পাকিস্তানের জন্য সেরূপ একটি যুদ্ধের প্রয়োজন ছিলনা; আয়োজনও ছিল না। একটি দেশের সরকার একমাত্র তখনই যুদ্ধ শুরু করে যখন শত্রু দেশ দ্বারা আক্রান্ত হয় অথবা নতুন দেশ জয়ের স্বপ্ন দেখে। ১৯৭১’একাত্তরে কোন নতুন দেশ দখলের স্বপ্ন পাকিস্তান সরকারের ছিল না। যুদ্ধের প্রস্তুতি থাকলে কি পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে একাত্তরের মার্চ মাসে মাত্র এক ডিভিশন সৈন্য অর্থাৎ ১৩ বা ১৪ হাজার সৈন্য রাখতো? সে সময় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সরকার ব্যস্ত ছিল নির্বাচন শেষে ক্ষমতা হস্তান্তরের। অথচ মুজিবের এজেন্ডা ছিল পাকিস্তান ভাঙা ও বিচ্ছিন্ন এক বাংলাদেশের নির্মাণ -সেটি ষাটের দশ থেকেই। তাই শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ পরিকল্পিত ভাবেই ১৯৭১’য়ের যুদ্ধ ডেকে আনে। কারণ যুদ্ধ ছাড়া মুজিবের পক্ষে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ বানানো অসম্ভব ছিল। ফলে তার পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না ক্ষমতায় যাওয়া। অথচ নির্বাচনী বিজয়ের পর ক্ষমতাপাগল মুজিবের পক্ষে ক্ষমতার বাইরে থাকা অসম্ভব ছিল। তাই ভারতকে যুদ্ধে ডেকে আনে। আর ভারত এমন একটি যুদ্ধের জন্য ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ছিল দু’পায়ে খাড়া। মুজিব সেটি জানতো; তাই সে পাকিস্তান ধ্বংসে ভারতের পার্টনারে পরিণত হয় এবং ১৯৭১’য়ে যুদ্ধ ডেকে আনে। আর যে যুদ্ধ ডেকে আনে, সেই তো যুদ্ধাপরাধী। কারণ, যুদ্ধ ডেকে আনার অর্থ ধ্বংস ও রক্তপাতকে ডেকে আনা।

 

তাছাড়া মুজিবকে ক্ষমতায় বসানোর মধ্যে ভারতেরও বিশাল স্বার্থ ছিল। মুজিবকে ক্ষমতায় বসানোর অর্থই ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রতিরক্ষা নীতি, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর ভারতের পূর্ণ দখলদারি ও লুটপাটের অবাধ সুযোগ -যা মুজিব আমলে দেখা গেছে। বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে মুজিব যা কিছু নির্বাচনী প্রচার কালে বলেছে তা ছিল ভোটারদের ধোকা দেয়ার কৌশল মাত্র। গণতন্ত্রের প্রতি এতো দরদ থাকলে মুজিব কেন গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা দিবে? কেন রক্ষীবাহিনী দিয়ে হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যা করবে? কেন সকল বেসরকারি পত্র-পত্রিকা নিষিদ্ধ করবে? আর অর্থনৈতিক মুক্তি? মুজিব তো দিয়েছে চুরি-ডাকাতি, লুণ্ঠন, কালোবাজারী ও ভারতে সম্পদ পাচারের অর্থনীতি। ধ্বংস করেছে পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত শিল্প কলকারখানা ও ব্যাংকগুলিকে। ৮ আনা সের চাল খাওয়ানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডেকে এনেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ -যাতে অনাহারে মারা যায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষ।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা যেভাবে ব্যর্থ করা হলো

১৯৭১’য়ের মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ইয়াহিয়ার সাথে চলা মুজিবের আলোচনা পরিকল্পিত ভাবেই ব্যর্থ করে দেয়া হয়। সে আলোচনা সফল করায় মুজিবের যেমন সামান্যতম আগ্রহ ছিলনা, তেমনি আগ্রহ ছিল না তার অনুসারী উগ্র আ‌ওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগ নেতাদের। ছাত্র লীগের সিরাজুল আলম খান, আসম রব, আব্দুর রাজ্জাকের মত নেতারা মুজিবের উপর চাপ দিচ্ছিল ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে আলোচনা বর্জন করতে এবং অবিলম্বে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করতে। এসব নেতারা এমন কি মুজিবের স্ত্রীকে দিয়েও মুজিবের উপর চাপ দিয়েছিল ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা পরিহার করতে। এসব নেতারা সেসব কথা পরে নিজেরাই পত্রিকায় প্রকাশ করেছে। আলোচনা শুরু হওয়ার ২ সপ্তাহ আগেই ছাত্র লীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)’র পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ভারতও চাচ্ছিল না, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে মুজিবের আলোচনা সফল হোক। তারা সবাই চাচ্ছিল, আলোচনা বর্জন করে মুজিব সত্বর স্বাধীনতার ঘোষণা দিক এবং যুদ্ধ শুরু করুক।

মুজিবের লক্ষ্য যদি গণতন্ত্র বাঁচানো ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া হতো, তবে সে লক্ষ্য হাছিলে একাত্তরের যুদ্ধের প্রয়োজন পড়তো না। কারণ, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভূট্টো এবং অন্যান্য দলের নেতারা মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে রাজী ছিল। উল্লেখ্য যে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মুজিবকে পাকিস্তানের আগামী প্রধানমন্ত্রী রূপে ঘোষণাও দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে রাজী ছিল না খোদ শেখ মুজিব। কারণ, মুজিব জানতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে আগরতলা ষড়যন্ত্রে পরিকল্পিত বাংলাদেশ নির্মাণের কাজটি হতো না। এবং তাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ পাকিস্তান ভাঙার কাজটি হতো না। মুজিব তাই পরিকল্পিত ভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে এবং সে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নির্মাণের দিকে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সাথে আলোচনা সফল হলে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বেঁচে যেত। অথচ মুজিব সেটিই চাচ্ছিল ।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thedailysarkar@gmail.com

About Author Information

যেভাবে চাপানো হলো একাত্তরের যুদ্ধ এবং হাতছাড়া হলো অভূতপূর্ব সুযোগ —– ফিরোজ মাহবুব কামাল

Update Time : ০৪:৩৪:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫

 

যেভাবে চাপানো হলো যুদ্ধ :

একাত্তরের যুদ্ধ পাকিস্তান সরকার ডেকে আনেনি। কারণ সে মুহুর্তে পাকিস্তানের জন্য সেরূপ একটি যুদ্ধের প্রয়োজন ছিলনা; আয়োজনও ছিল না। একটি দেশের সরকার একমাত্র তখনই যুদ্ধ শুরু করে যখন শত্রু দেশ দ্বারা আক্রান্ত হয় অথবা নতুন দেশ জয়ের স্বপ্ন দেখে। ১৯৭১’একাত্তরে কোন নতুন দেশ দখলের স্বপ্ন পাকিস্তান সরকারের ছিল না। যুদ্ধের প্রস্তুতি থাকলে কি পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে একাত্তরের মার্চ মাসে মাত্র এক ডিভিশন সৈন্য অর্থাৎ ১৩ বা ১৪ হাজার সৈন্য রাখতো? সে সময় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সরকার ব্যস্ত ছিল নির্বাচন শেষে ক্ষমতা হস্তান্তরের। অথচ মুজিবের এজেন্ডা ছিল পাকিস্তান ভাঙা ও বিচ্ছিন্ন এক বাংলাদেশের নির্মাণ -সেটি ষাটের দশ থেকেই। তাই শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ পরিকল্পিত ভাবেই ১৯৭১’য়ের যুদ্ধ ডেকে আনে। কারণ যুদ্ধ ছাড়া মুজিবের পক্ষে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ বানানো অসম্ভব ছিল। ফলে তার পক্ষে আদৌ সম্ভব ছিল না ক্ষমতায় যাওয়া। অথচ নির্বাচনী বিজয়ের পর ক্ষমতাপাগল মুজিবের পক্ষে ক্ষমতার বাইরে থাকা অসম্ভব ছিল। তাই ভারতকে যুদ্ধে ডেকে আনে। আর ভারত এমন একটি যুদ্ধের জন্য ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ছিল দু’পায়ে খাড়া। মুজিব সেটি জানতো; তাই সে পাকিস্তান ধ্বংসে ভারতের পার্টনারে পরিণত হয় এবং ১৯৭১’য়ে যুদ্ধ ডেকে আনে। আর যে যুদ্ধ ডেকে আনে, সেই তো যুদ্ধাপরাধী। কারণ, যুদ্ধ ডেকে আনার অর্থ ধ্বংস ও রক্তপাতকে ডেকে আনা।

 

তাছাড়া মুজিবকে ক্ষমতায় বসানোর মধ্যে ভারতেরও বিশাল স্বার্থ ছিল। মুজিবকে ক্ষমতায় বসানোর অর্থই ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রতিরক্ষা নীতি, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর ভারতের পূর্ণ দখলদারি ও লুটপাটের অবাধ সুযোগ -যা মুজিব আমলে দেখা গেছে। বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে মুজিব যা কিছু নির্বাচনী প্রচার কালে বলেছে তা ছিল ভোটারদের ধোকা দেয়ার কৌশল মাত্র। গণতন্ত্রের প্রতি এতো দরদ থাকলে মুজিব কেন গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা দিবে? কেন রক্ষীবাহিনী দিয়ে হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যা করবে? কেন সকল বেসরকারি পত্র-পত্রিকা নিষিদ্ধ করবে? আর অর্থনৈতিক মুক্তি? মুজিব তো দিয়েছে চুরি-ডাকাতি, লুণ্ঠন, কালোবাজারী ও ভারতে সম্পদ পাচারের অর্থনীতি। ধ্বংস করেছে পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত শিল্প কলকারখানা ও ব্যাংকগুলিকে। ৮ আনা সের চাল খাওয়ানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডেকে এনেছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ -যাতে অনাহারে মারা যায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষ।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা যেভাবে ব্যর্থ করা হলো

১৯৭১’য়ের মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ইয়াহিয়ার সাথে চলা মুজিবের আলোচনা পরিকল্পিত ভাবেই ব্যর্থ করে দেয়া হয়। সে আলোচনা সফল করায় মুজিবের যেমন সামান্যতম আগ্রহ ছিলনা, তেমনি আগ্রহ ছিল না তার অনুসারী উগ্র আ‌ওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগ নেতাদের। ছাত্র লীগের সিরাজুল আলম খান, আসম রব, আব্দুর রাজ্জাকের মত নেতারা মুজিবের উপর চাপ দিচ্ছিল ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে আলোচনা বর্জন করতে এবং অবিলম্বে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করতে। এসব নেতারা এমন কি মুজিবের স্ত্রীকে দিয়েও মুজিবের উপর চাপ দিয়েছিল ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা পরিহার করতে। এসব নেতারা সেসব কথা পরে নিজেরাই পত্রিকায় প্রকাশ করেছে। আলোচনা শুরু হওয়ার ২ সপ্তাহ আগেই ছাত্র লীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)’র পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ভারতও চাচ্ছিল না, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে মুজিবের আলোচনা সফল হোক। তারা সবাই চাচ্ছিল, আলোচনা বর্জন করে মুজিব সত্বর স্বাধীনতার ঘোষণা দিক এবং যুদ্ধ শুরু করুক।

মুজিবের লক্ষ্য যদি গণতন্ত্র বাঁচানো ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া হতো, তবে সে লক্ষ্য হাছিলে একাত্তরের যুদ্ধের প্রয়োজন পড়তো না। কারণ, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভূট্টো এবং অন্যান্য দলের নেতারা মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে রাজী ছিল। উল্লেখ্য যে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মুজিবকে পাকিস্তানের আগামী প্রধানমন্ত্রী রূপে ঘোষণাও দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে রাজী ছিল না খোদ শেখ মুজিব। কারণ, মুজিব জানতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে আগরতলা ষড়যন্ত্রে পরিকল্পিত বাংলাদেশ নির্মাণের কাজটি হতো না। এবং তাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ পাকিস্তান ভাঙার কাজটি হতো না। মুজিব তাই পরিকল্পিত ভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল একটি রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে এবং সে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নির্মাণের দিকে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সাথে আলোচনা সফল হলে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বেঁচে যেত। অথচ মুজিব সেটিই চাচ্ছিল ।