০২:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬

দেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই । ——— মোশারফ হোসন

Reporter Name
  • Update Time : ০৮:১৭:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ৩৩৮ Time View


বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। দেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ
নেই। আইনের নিজের কোনো শক্তি নেই। আইন নিজে থেকে কোনো কাজই করতে পারে
না। একটি কলম যেমন নিজ শক্তিতে কাগজে লিখতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত পেছনের
কোনো মানুষ কলমটি পরিচালনা না করে। অর্থাৎ পেছনের কোনো মানুষটি ওই
কলমটির মূল চালিকাশক্তি। সত্যিকারের আইনের শাসনের জন্য দক্ষ চালিকাশক্তি
প্রয়োজন। এমনি এমনি আইনের শাসন বাস্তবায়িত হতে পারে না। সরকার তার ক্ষমতা
আইনের বিধান মেনে প্রয়োগ এবং ব্যবহার করবে। আর যদি সরকার আইন মেনে
রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং ক্ষমতার অপব্যহার না করে তবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের
স্বেচ্ছাচারিতার বলি হতে হবে না।

 

যেখানে দেশের নাগরিকরা স্বেচ্ছায় আইন মেনে চলে
না, যেখানে ব্যক্তির নিরাপত্তা নেই, সন্ত্রাস, ভয়প্রদর্শন, গুম, হত্যা নৈমিত্তিক
বিষয় এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নাজুক সেখানে আইনের শাসনের আবহাওয়া
বাস্তবায়ন বড় কঠিন । আইনের শাসনের লক্ষ্য হচ্ছে মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বের
সবাই সম-অধিকার পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাসীন আর
তাদের প্রতিপক্ষরা সম-অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত। যেসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান
নিরপেক্ষ থাকার কথা ছিল, কিন্তু এখন লক্ষ করা যাচ্ছে, এই বিধানে ব্যত্যয় ঘটিয়ে
কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রতি আজ্ঞাবহ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে আইনের
কোনো কমতি নেই । কিন্তু সেসব বিধিবিধান অনুযায়ী সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে
একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারাবদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অভাব
প্রকট । জাতীয় নেতৃবৃন্দ একটি কল্যাণমূলক আদর্শের অনুসারী হয়ে এগিয়ে যাবেন, এ
আশা সব জনগণের। কিন্তু রাজনীতিবিদদের বক্তব্য-বিবৃতিতে ক্ষমতা কব্জা করার
কলাকৌশলই কেবল থাকে। এ ছাড়া জনগণের জীবনমান, জীবনযাপনের উন্নতির বিষয়টি
তাদের ভাবনায় নেই। দেশে আইনের সংখ্যা অনুসারে সমাজে শৃঙ্খলা বিধানের নজির নেই।
সংবাদপত্রে প্রতিদিন যে অসংখ্য খবর প্রকাশিত হয় তার বেশির ভাগই অনিয়ম আর
অব্যবস্থাপনার। ওপর থেকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং কাজ করা যেখানে
কর্তব্য, সেখানে বাস্তবে এর অনুশীলন নেই। ওপর থেকে সমাজের নেতৃত্বের আদর্শ
অনুসরণের চর্চা নিচের দিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নেমে আসবে। সমাজ তাতে আলোকিত
হবে। সমাজ-রাষ্ট্র তাতে পূর্ণাঙ্গতা লাভ করবে। যে সমাজে নৈতিকতার অভাব রয়েছে,
সে সমাজে অপরাধের বিস্তার ঘটবেই । অশ্রদ্ধা, অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি সবকিছুকে
বিষিয়ে তুলবে। রাষ্ট্রযন্ত্র খুঁড়িয়ে চলবে। গত ১২ তারিখের সকালে নরসিংদী থেকে
ভৈরব যাব, রেলস্টেশনের কাউন্টারে এগার সিন্দুরের টিকেট কাটতে গেলে মাষ্টারসাহেব
বলেন ভৈরবের টিকেট কাউন্টারে বিক্রী হয় না। ট্রেনের টিটির কাছ থেকে টিকেট

নিবেন। ট্রেনে উঠার পর টিটিকে বললাম ভৈরববাজারের একটি টিকেট দিন। সে বললো
টিকেট দিতে পারবো না। আমাদের টিকেট বিক্রীর অনুমতি নাই। ভাড়ার ৩০/= ত্রিশ
টাকা দিন। টাকা দিয়ে বললাম যদি আমাকে গেইটে টিকেটের জন্য অপমান করে তখন
আমার পড়ন্তবেলায় কি উপায় ? সে বলল আমি গেইট পার করে দিব। গেইটে গিয়ে দেখি
কোন টিকেট চেকার নাই। তাহলে আমার দেওয়া ত্রিশ টাকা সরকারী রাজস্বখানায় জমা
হল না। বিশ্বের কোন দেশেই টিকেট ছাড়া ট্রেন ভ্রমন করা যায় না। আমাদের দেশের
ট্রেনভ্রমনের আইন সমন্ধে আমার জানা নাই। আমাদের একটা জনগোষ্ঠী ঘুষ দূর্নীতি
র্সহিংস হয়ে ওঠার প্রবণতা কম-বেশি হওয়ার পিছনে নিশ্চয়ই বিভিন্ন
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থাকতে পারে। তবে এটি ঠেকানোর সবচেয়ে বড় যে হাতিয়ার
সেটি আইনের শাসন। কোন রাষ্ট্রে যদি আইনের শাসন থাকে, ন্যায়বিচার-অধিকারের
ধারণা প্রোথিত থাকে, সেখানে মানুষের মাঝে সহিংস হয়ে ওঠার প্রবণতাও হ্রাস
পাওয়ার কথা। আমাদের দেশে কেন মানুষ দিনদিন অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে সে প্রশ্নের
জবাবও নিশ্চয়ই এই রাষ্ট্রের আইনের শাসনের বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যেই রয়েছে।
পত্রপত্রিকায় সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের ঘুষ দূর্নীতির সংবাদ প্রকাশ হলেও
যথাযথ কতৃপক্ষ তদন্ত করতে অনিহা বোধ করেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে
বাংলাদেশ সরকার গত ১০ বছরে দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে বিনা বিচারে খুন করেছে
এবং পাঁচশরও বেশি মানুষকে গুম করেছে। এটি পত্রপত্রিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে
পাওয়া। প্রকৃত চিত্র হয়তো আরো ভয়াবহ, বহুগুণ। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা
থেকে আমরা জেনেছি শীতলক্ষা-বুড়িগঙ্গায় কাদের লাশ পাওয়া যায়। বহু লাশের খোঁজই
স্বজনরা পায় না। এই যে রাষ্ট্র, সরকার ও তার বাহিনীগুলো নিজেই খুনী, নিজেই
আইনের শাসনে বিশ্বাস করে না এবং দিনেরাতে বিনাবিচারে মানুষ খুন করে আবার
প্রতিনিয়ত মিথ্যা কথা বলে যায় (ক্রসফায়ারের গল্প), সেখানে আইনের শাসনের প্রতি
মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কোথায় সেটি সহজেই অনুমেয়। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা
রক্ষার জন্য এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এদেশে অনেক ধরনের আইন
বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এসব আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ সম্ভব হয় না।
এক্ষেত্রে সরকারের অদক্ষতা ও অযোগ্যতা এবং স্বৈরাচারী মনোভাব অনেকাংশে
দায়ী। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এখানে
দলের নেতা বা নেত্রী যা বলেন অধস্তন কর্মীরা তাই মেনে নিতে বাধ্য হন। এভাবে
সর্বময় ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে ক্ষমতায় যাওয়ার পরে
দলের নেতা বা নেত্রী আইনকে নিজের মতো ব্যবহার করেন। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন
না থাকার কারণে অযোগ্য, অদক্ষ, অশিক্ষিত ও দুর্নীতিবাজ লোকেরা নির্বাচিত হন।
তাছাড়া বিচার বিভাগ শাসন বিভাগের দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়। আইন
প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। দুর্নীতি
আমাদের দেশের নিত্যদিনের সঙ্গী। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং দলীয় প্রভাবের

কারণে প্রশাসনে অদক্ষ, অযোগ্য দুর্নীতিবাজ লোকেরা নিয়োগ লাভ করছে। তাছাড়া
নীতি প্রণয়নে এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকার বরাবরই ব্যর্থতার
পরিচয় দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে আইন থাকা সত্ত্বেও তার সফল প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে
না। সুশাসনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো আইনের শাসন। আইনের শাসন বলতে মূলত
বোঝানো হয় রাষ্ট্রীয় জীবনে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মানবাধিকারের
সংরক্ষণকে। সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এর
শর্ত। স্বাধীন নিরপেক্ষ এবং দুর্নীতিমুক্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগ
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। এটি জনগণের অধিকার রক্ষার
রক্ষাকবচ। সামনে নির্বাচন আসছে, সব দল নির্বাচনের আগে জনগণকে তুষ্ট করার
জন্য তারা বিজয়ী হলে কী করবে তা ইশতেহার আকারে এক লম্বা ফিরিস্তি প্রকাশ
করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতায় যাওয়ার পর এসব অঙ্গীকারের আর কোনো
হদিস থাকে না। এসব ইশতেহারকে সামনে রেখে কাজ করার নজির অতীতে দেখা যায়নি।
তখন যারা ক্ষমতাসীন হন তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে থাকে নিজেদের ভাগ্য আরো
কতটা ভালো করা যায়। প্রায়ই হিসাব প্রকাশিত হয়ে থাকে, বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে
বেনামে বাংলাদেশীরা হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। রাজনৈতিক
আনুকূল্যভিন্ন এমন টাকা পাচার করা সম্ভব হয় না। কিন্তু প্রশাসন এই অর্থ
পাচারকারীদের অনুসন্ধান করে বের করার কোনো প্রয়াসই নেয় না। এ দিকে দেশের
অর্থ পাচার হচ্ছে, কিন্তু দেশে কোনো দেশী বিনিয়োগ নেই।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thedailysarkar@gmail.com

About Author Information

দেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই । ——— মোশারফ হোসন

Update Time : ০৮:১৭:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫


বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। দেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ
নেই। আইনের নিজের কোনো শক্তি নেই। আইন নিজে থেকে কোনো কাজই করতে পারে
না। একটি কলম যেমন নিজ শক্তিতে কাগজে লিখতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত পেছনের
কোনো মানুষ কলমটি পরিচালনা না করে। অর্থাৎ পেছনের কোনো মানুষটি ওই
কলমটির মূল চালিকাশক্তি। সত্যিকারের আইনের শাসনের জন্য দক্ষ চালিকাশক্তি
প্রয়োজন। এমনি এমনি আইনের শাসন বাস্তবায়িত হতে পারে না। সরকার তার ক্ষমতা
আইনের বিধান মেনে প্রয়োগ এবং ব্যবহার করবে। আর যদি সরকার আইন মেনে
রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং ক্ষমতার অপব্যহার না করে তবে রাষ্ট্রের নাগরিকদের
স্বেচ্ছাচারিতার বলি হতে হবে না।

 

যেখানে দেশের নাগরিকরা স্বেচ্ছায় আইন মেনে চলে
না, যেখানে ব্যক্তির নিরাপত্তা নেই, সন্ত্রাস, ভয়প্রদর্শন, গুম, হত্যা নৈমিত্তিক
বিষয় এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নাজুক সেখানে আইনের শাসনের আবহাওয়া
বাস্তবায়ন বড় কঠিন । আইনের শাসনের লক্ষ্য হচ্ছে মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বের
সবাই সম-অধিকার পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতাসীন আর
তাদের প্রতিপক্ষরা সম-অধিকার পাওয়া থেকে বঞ্চিত। যেসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান
নিরপেক্ষ থাকার কথা ছিল, কিন্তু এখন লক্ষ করা যাচ্ছে, এই বিধানে ব্যত্যয় ঘটিয়ে
কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রতি আজ্ঞাবহ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে আইনের
কোনো কমতি নেই । কিন্তু সেসব বিধিবিধান অনুযায়ী সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে
একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারাবদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অভাব
প্রকট । জাতীয় নেতৃবৃন্দ একটি কল্যাণমূলক আদর্শের অনুসারী হয়ে এগিয়ে যাবেন, এ
আশা সব জনগণের। কিন্তু রাজনীতিবিদদের বক্তব্য-বিবৃতিতে ক্ষমতা কব্জা করার
কলাকৌশলই কেবল থাকে। এ ছাড়া জনগণের জীবনমান, জীবনযাপনের উন্নতির বিষয়টি
তাদের ভাবনায় নেই। দেশে আইনের সংখ্যা অনুসারে সমাজে শৃঙ্খলা বিধানের নজির নেই।
সংবাদপত্রে প্রতিদিন যে অসংখ্য খবর প্রকাশিত হয় তার বেশির ভাগই অনিয়ম আর
অব্যবস্থাপনার। ওপর থেকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং কাজ করা যেখানে
কর্তব্য, সেখানে বাস্তবে এর অনুশীলন নেই। ওপর থেকে সমাজের নেতৃত্বের আদর্শ
অনুসরণের চর্চা নিচের দিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নেমে আসবে। সমাজ তাতে আলোকিত
হবে। সমাজ-রাষ্ট্র তাতে পূর্ণাঙ্গতা লাভ করবে। যে সমাজে নৈতিকতার অভাব রয়েছে,
সে সমাজে অপরাধের বিস্তার ঘটবেই । অশ্রদ্ধা, অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি সবকিছুকে
বিষিয়ে তুলবে। রাষ্ট্রযন্ত্র খুঁড়িয়ে চলবে। গত ১২ তারিখের সকালে নরসিংদী থেকে
ভৈরব যাব, রেলস্টেশনের কাউন্টারে এগার সিন্দুরের টিকেট কাটতে গেলে মাষ্টারসাহেব
বলেন ভৈরবের টিকেট কাউন্টারে বিক্রী হয় না। ট্রেনের টিটির কাছ থেকে টিকেট

নিবেন। ট্রেনে উঠার পর টিটিকে বললাম ভৈরববাজারের একটি টিকেট দিন। সে বললো
টিকেট দিতে পারবো না। আমাদের টিকেট বিক্রীর অনুমতি নাই। ভাড়ার ৩০/= ত্রিশ
টাকা দিন। টাকা দিয়ে বললাম যদি আমাকে গেইটে টিকেটের জন্য অপমান করে তখন
আমার পড়ন্তবেলায় কি উপায় ? সে বলল আমি গেইট পার করে দিব। গেইটে গিয়ে দেখি
কোন টিকেট চেকার নাই। তাহলে আমার দেওয়া ত্রিশ টাকা সরকারী রাজস্বখানায় জমা
হল না। বিশ্বের কোন দেশেই টিকেট ছাড়া ট্রেন ভ্রমন করা যায় না। আমাদের দেশের
ট্রেনভ্রমনের আইন সমন্ধে আমার জানা নাই। আমাদের একটা জনগোষ্ঠী ঘুষ দূর্নীতি
র্সহিংস হয়ে ওঠার প্রবণতা কম-বেশি হওয়ার পিছনে নিশ্চয়ই বিভিন্ন
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ থাকতে পারে। তবে এটি ঠেকানোর সবচেয়ে বড় যে হাতিয়ার
সেটি আইনের শাসন। কোন রাষ্ট্রে যদি আইনের শাসন থাকে, ন্যায়বিচার-অধিকারের
ধারণা প্রোথিত থাকে, সেখানে মানুষের মাঝে সহিংস হয়ে ওঠার প্রবণতাও হ্রাস
পাওয়ার কথা। আমাদের দেশে কেন মানুষ দিনদিন অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে সে প্রশ্নের
জবাবও নিশ্চয়ই এই রাষ্ট্রের আইনের শাসনের বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যেই রয়েছে।
পত্রপত্রিকায় সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের ঘুষ দূর্নীতির সংবাদ প্রকাশ হলেও
যথাযথ কতৃপক্ষ তদন্ত করতে অনিহা বোধ করেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে
বাংলাদেশ সরকার গত ১০ বছরে দুই হাজারেরও বেশি মানুষকে বিনা বিচারে খুন করেছে
এবং পাঁচশরও বেশি মানুষকে গুম করেছে। এটি পত্রপত্রিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে
পাওয়া। প্রকৃত চিত্র হয়তো আরো ভয়াবহ, বহুগুণ। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা
থেকে আমরা জেনেছি শীতলক্ষা-বুড়িগঙ্গায় কাদের লাশ পাওয়া যায়। বহু লাশের খোঁজই
স্বজনরা পায় না। এই যে রাষ্ট্র, সরকার ও তার বাহিনীগুলো নিজেই খুনী, নিজেই
আইনের শাসনে বিশ্বাস করে না এবং দিনেরাতে বিনাবিচারে মানুষ খুন করে আবার
প্রতিনিয়ত মিথ্যা কথা বলে যায় (ক্রসফায়ারের গল্প), সেখানে আইনের শাসনের প্রতি
মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কোথায় সেটি সহজেই অনুমেয়। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা
রক্ষার জন্য এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এদেশে অনেক ধরনের আইন
বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এসব আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ সম্ভব হয় না।
এক্ষেত্রে সরকারের অদক্ষতা ও অযোগ্যতা এবং স্বৈরাচারী মনোভাব অনেকাংশে
দায়ী। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এখানে
দলের নেতা বা নেত্রী যা বলেন অধস্তন কর্মীরা তাই মেনে নিতে বাধ্য হন। এভাবে
সর্বময় ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে ক্ষমতায় যাওয়ার পরে
দলের নেতা বা নেত্রী আইনকে নিজের মতো ব্যবহার করেন। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন
না থাকার কারণে অযোগ্য, অদক্ষ, অশিক্ষিত ও দুর্নীতিবাজ লোকেরা নির্বাচিত হন।
তাছাড়া বিচার বিভাগ শাসন বিভাগের দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়। আইন
প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। দুর্নীতি
আমাদের দেশের নিত্যদিনের সঙ্গী। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং দলীয় প্রভাবের

কারণে প্রশাসনে অদক্ষ, অযোগ্য দুর্নীতিবাজ লোকেরা নিয়োগ লাভ করছে। তাছাড়া
নীতি প্রণয়নে এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকার বরাবরই ব্যর্থতার
পরিচয় দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে আইন থাকা সত্ত্বেও তার সফল প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে
না। সুশাসনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো আইনের শাসন। আইনের শাসন বলতে মূলত
বোঝানো হয় রাষ্ট্রীয় জীবনে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মানবাধিকারের
সংরক্ষণকে। সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এর
শর্ত। স্বাধীন নিরপেক্ষ এবং দুর্নীতিমুক্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগ
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। এটি জনগণের অধিকার রক্ষার
রক্ষাকবচ। সামনে নির্বাচন আসছে, সব দল নির্বাচনের আগে জনগণকে তুষ্ট করার
জন্য তারা বিজয়ী হলে কী করবে তা ইশতেহার আকারে এক লম্বা ফিরিস্তি প্রকাশ
করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতায় যাওয়ার পর এসব অঙ্গীকারের আর কোনো
হদিস থাকে না। এসব ইশতেহারকে সামনে রেখে কাজ করার নজির অতীতে দেখা যায়নি।
তখন যারা ক্ষমতাসীন হন তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে থাকে নিজেদের ভাগ্য আরো
কতটা ভালো করা যায়। প্রায়ই হিসাব প্রকাশিত হয়ে থাকে, বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে
বেনামে বাংলাদেশীরা হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। রাজনৈতিক
আনুকূল্যভিন্ন এমন টাকা পাচার করা সম্ভব হয় না। কিন্তু প্রশাসন এই অর্থ
পাচারকারীদের অনুসন্ধান করে বের করার কোনো প্রয়াসই নেয় না। এ দিকে দেশের
অর্থ পাচার হচ্ছে, কিন্তু দেশে কোনো দেশী বিনিয়োগ নেই।