০৫:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬
মুসলিমদেশ হিসেবে বাংলাদেশে ইসলামকে সাবজনীন করতে হবে

মুসলিমদেশ হিসেবে বাংলাদেশে ইসলামকে সাবজনীন করতে হবে

মতামত
  • Update Time : ০৩:১০:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
  • / ৩৭ Time View

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

কিরূপে বিলুপ্ত হলো আসল ইসলাম?

ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নানারূপ নাশকতা শুধু বিধর্মী কাফির এবং স্বধর্মী জাতীয়তাবাদী, উপজাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী, সেক্যুলারিস্ট ও রাজা-বাদশাহদের দ্বারা হয়না, বরং প্রকট ভাবে হয় আলেমের লেবাসধারী ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারাও। মেঘ যেমন সূর্যকে আড়াল করে রাখে, তারাও তেমনি আড়াল করে রেখেছে নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত ইসলামকে। তাদের কারণে সাধারণ জনগণ দেখতে পায়না ইসলামের আসল রূপ -যা নবীজী (সা:) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দৃশ্যমান করেছিলেন। এসব আলেমদের কারণে সাধারণ মানুষ যে ইসলাম দেখতে পায় সেটি নানা ফিরকা, নানা ত্বরিকা, নাআ পীর-মুরিদী ও নানা মাজহাবে বিভক্ত এক ইসলাম। ফলে মুসলিমদের পরিচয়টি আজ সুন্নি মুসলিম, শিয়া মুসলিম, হানাফি মুসলিম,  সালাফি মুসলিম, তাবলিগী মুসলিম ইত্যাদি নানা নামে।

কিন্তু নবীজী (সা:) সুন্নি, শিয়া, হানাফি, শাফেয়ী, মালিকি বা সালাফি ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্রেফ মুসলিম। নবীজী (সা:)’য়ের সাহাবীগণও সুন্নি, শিয়া, হানাফি, শাফেয়ী, মালিকি বা সালাফি ছিলেন না। ফিরকা, ত্বরিকা, ও নানা মাজহাবের নামে বিভক্তি এসেছে নবীজী (সা:)’য়ের ইন্তেকালের প্রায় তিনশত বছর পর। মুসলিম জীবনে এই বিভক্তি হলো সবচেয়ে বড় বিদ’য়াত; এবং মুসলিমগণ বাঁচতে শুরু করে সে বিদ’য়াত নিয়ে। মুসলিমদের পতনের শুরু তখন থেকেই। তখন মুসলিমদের মাঝে নানারূপ বিদ’য়াতের জোয়ার এলেও মুসলিম মানসে বেঁচে নাই নবীজী (সা:)’য়ের আসল ইসলাম -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, শরিয়া আইনের বিচার, প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব এবং দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। ফলে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে মসজিদ-মাদ্রাসা, মোল্লা-মৌলভী ও আলেম-আল্লামাদের সংখ্যা বিপুল সংখ্যায় বাড়লেও কোথাও নবীজী (সা:) প্রচারিত বিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠা পায়নি। ইসলামের প্রথম তিন শত বছরে মিশর, সিরিয়া, ইরাক, সুদান, লিবিয়া, আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মৌরতানিয়ার মত বহুদেশের মুসলিমগণ কুর’আন বুঝার প্রয়োজনে নিজেদের মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে কুর’আনের ভাষা আরবীকে গ্রহণ করে।

ষড়যন্ত্র কুর’আনের বিরুদ্ধে

নানারূপ ধর্মীয় ফিরকা ও মজহাবের জোয়ার আসাতে সাধারণ মানুষ আগ্রহ হারায় কুর’আন বুঝায়। ফলে গুরুত্ব হারায় আরবী ভাষা শিক্ষা। মজহাবের প্রবক্তাগণ বলতে শুরু করে, কুর’আন বুঝার সামর্থ্য সাধারণ মানুষের নাই, তাদের জন্য কুর’আন তেলাওয়াতই যথেষ্ট। এবং বলতে থাকে, কুর’আন বুঝার দায়িত্ব আলেমদের। কুর’আন ও ইসলাম বুঝার চেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয় মাজহাব বুঝায়। এভাবেই শুরু হয় কুর’আন থেকে দূরে সরানোর ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্র দারুন ভাবে সফল হয়েছে। ফল দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের ন্যায় দেশে এক লাখ মুসলিমের মাঝে একজনও এমন পাওয়া যাবে না যে কুর’আন পড়লে তা বুঝতে পারে? পবিত্র কুর’আনের সাথে এর চেয়ে বড় অবমাননা আর কি হতে পারে? অথচ আল্লাহতায়ালা নামাজ-রোজা যেমন প্রতিটি নর-নারীর উপর ফরজ করেছেন, তেমনি ফরজ করেছেন কুর’আন বুঝাকে। না বুঝে তেলাওয়াতে সে ফরজ আদায় হয়না।

একমাত্র কুর’আনই প্রতি পদে জান্নাতের পথ তথা সিরাতাল মুস্তাকীম দেখায়। সে পথ খুঁজে পাওয়ার দায়টি সবার। মানব জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নিজ কর্ম ও পেশায় ব্যর্থ হলে এতো ক্ষতি হয়না, সে ব্যর্থতা জাহান্নামে নেয় না। কুর’আনের পথ পেতে ব্যর্থ হলে জাহান্নামে যেতে হয়। তাছাড়া কোন আলেমের বা অন্য কারো কুর’আন পাঠে নিজের জন্য সঠিক পথ খুঁজে পাওয়ার কাজটি হয়না। এজন্যই গৌরব যুগের মুসলিমদের কাছে কুর’আন বুঝা এতো গুরুত্ব পেয়েছিল। তারা কোন আলেমের বয়ান থেকে নয়, বরং খোদ মহান আল্লাহতায়ালার বয়ান থেকে ইসলাম বুঝার চেষ্টা করেছেন। আরবী ভাষা শেখার কারণে তাদের জন্য সে কাজটি সহজ হয়ে যায়। আলেমগণ কুর’আন বুঝাকে কঠিন বললেও মহান রব তাঁর ঈমানদার বান্দাদের আস্বস্থ করেছেন এ বলে, কুর’আন বুঝার কাজটি সহজ। মহান রব’য়ের সে ঘোষণাটি বার বার এসেছে পবিত্র কুর’আনে। যেমন বলা হয়েছে:

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ

অর্থ: “আমি কুর’আনকে সহজ করে দিয়েছি বুঝার জন্যে। অতএব, কুর’আন বুঝার জন্য আগ্রহী এমন কোন চিন্তাশীল আছে কি?।” –(সুরা ক্বামার, আয়াত ১৭, ২২, ৩২, ৪০)।

মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার নেয়ামতের সংখ্যা অসংখ্য; শুধু ভূপৃষ্ঠই নয়, ভূগর্ভও ভরপুর সেসব নিয়ামতে। তবে সর্বশ্রেষ্ঠ দানটি হলো পবিত্র কুর’আন। কারণ, অন্য কোন নিয়ামতই মানুষকে জান্নাতে নিবে না, জান্নাতে নিবে একমাত্র পবিত্র কুর’আন। তাই যারা কুর’আন পেল তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামতটি পেল। তবে সে কুর’আন তো তখনই কাজ দেয় যখন সাধারণ মানুষ সেটি সহজে বুঝতে পারে। সর্বপ্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সে বিষয়টি যে যথার্থ গুরুত্ব পেয়েছিল সেটি বুঝা যায় উপরিউক্ত আয়াতটি পাঠ করলে। মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে এ বলে, “আমি কুর’আনকে সহজ করে দিয়েছি বুঝার জন্যে।” বিষয়টি মহান রব’য়ের কাছেই এতোই গুরুত্ব পেয়েছে যে, এ আয়াতটি একবার নয় ৪ বার নাযিল হয়েছে সুরা ক্বামারে। যারা বলে কুর’আন বুঝা কঠিন, তাদের সে বক্তব্যের বিরুদ্ধে উপরিউক্ত আয়াতটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মোক্ষম জবাব।

মুসলিম ভূমিতে শয়তানের বিজয়

শয়তানের এজেন্ডাটি মুসলিমদের নামাজ-রোজা থেকে দূরে সরানো নয়। বরং সেটি কুর’আন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। একমাত্র তখনই মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার আসল এজেন্ডাটি সফল হয়। শয়তান জানে, নামাজ-রোজা জান্নাতের পথ দেখায় না। নামাজ-রোজ পালন করেও অধিকাংশ মানুষ তাই পূর্ণ মুসলিম হতে ব্যর্থ হয়। তারা মিথ্যা বলে, ঘুষ খায়, প্রতারণা করে এবং অপরের সম্পদ লুণ্ঠন করে। তারা ব্যর্থ হয়, আল্লাহর পথের মুজাহিদ হতে। তারা তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েও ফ্যাসিবাদী সেক্যুলার ধারার রাজনীতি করে এবং শরিয়ার বিরোধীতা করে। এবং এভাবে নিজেদের গড়ে তোলে পুরোপুরি জাহান্নামের যোগ্য করে। অথচ যারা কুর’আন বুঝে ও সে অনুযায়ী পথ চলে তাদের আচরণ ও কর্ম সম্পূর্ণ ভিন্নতর হয়। কুর‌’আন তাদেরকে জান্নাতের পথ তথা সিরাতাল মুস্তাকীম দেখায়। তখন তাদের আজীবনের লড়াইটি হয় পূর্ণ মুসলিম হওয়ায়। শুধু নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ পালনের মাঝে তাদের জীবন থেমে থাকেনা, তারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদে যোগ দেয় এবং শহীদ হয়।

শয়তান ও তার অনুসারীদের বড় সাফল্য হলো, মুসলিমদের তারা কুর’আন থেকে দূরে সরাতে পেরেছে। একাজে শয়তানের সেপাই রূপে কাজ করেছে সেসব আলেম ও মোল্লা-মৌলভীগণ যারা বলে কুর’আন বুঝা বড়ই কঠিন। এবং সেটিকে দলিল বানিয়ে জনগণকে নসিহত করে, স্রেফ কুর’আন তেলাওয়াত করতে। অথচ তেলাওয়াতের মূল লক্ষ্য হতে হয়, পবিত্র কুর’আন থেকে পথ পাওয়া। অথচ মুসলিম বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি ঘন্টা না বুঝে তেলাওয়াতে ব্যয় হলেও তা থেকে পথ পাওয়ার কাজটি হচ্ছে না। বলা হয়, প্রতি হরফ পাঠে ১০ নেকী। নেকিতো তখন জুটে যখন কুর’আন বুঝে পাঠ করা হয়। যেমন মসজিদের দিকে চলায় প্রতি কদমে সওয়াব; তবে সে জন্য লক্ষ্য হতে হয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া। অনেকের কাছে গুরুত্ব পায় স্রেফ নেকি অর্জন, হিদায়েত পাওয়া তথা সিরাতাল মুস্তাকীম পাওয়া নয়। এর চেয়ে বড় বিভ্রান্তি আর কি হতে পারে? তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়, নেকি কখনো জান্নাতে নিবে না, জান্নাতে নিবে হিদায়েতপ্রাপ্তি তথা সিরাতাল মুস্তাকীমপ্রাপ্তি। নেকি তো তাদের ফায়দা দিবে যারা সফল হবে জান্নাতে পৌঁছতে। তখন নেকি অনুযায়ী জান্নাতে মর্যাদা পাবে। তবে জান্নাতে পৌঁছার কাজটিই হলো সবচেয়ে কঠিন। এ কাজ আল্লাহর পথে কুরবানি চায়। এবং চায়, সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার সামর্থ্য।

কোন আমল তো তখনই নেক আমল হয়, যখন তার পিছনে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করা ও তাঁকে খুশি করার তাড়না। না বুঝে কুর’আন তেলাওয়াতে সেরূপ আগ্রহ থাকেনা। বরং যার থাকে তাঁর মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার তাড়না, একমাত্র তাঁরই থাকে তাঁর রব’য়ের নসিহত ও নির্দেশনা বুঝার তাড়না। কুর’আন তখন মহান রব’য়ের সাথে সংযোগের সেতু রূপে কাজ করে। এজন্যই সে কুর’আন বুঝতে চায়। কিন্তু যে ব্যক্তি ব্যস্ত শুধু নিজের এজেন্ডা নিয়ে, পবিত্র কুর’আনে মহান রব কি বললেন সেটি জানা তার কাছে গুরুত্ব পায়না। এরাই না বুঝে কুর’আন তেলাওয়াত করে।

ধর্মের নামে ব্যবসা বেড়েছে

ব্যবসায় থাকে অর্থ উপার্জনের তাড়না; অথচ সেরূপ তাড়না থাকে না ইবাদতে। ব্যবসা থেকে ইবাদতের এখানেই মূল পার্থক্য। নবীজী (সা:)’য়ের আমলে ওয়াজ বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ গণ্য হতো। সে জিহাদে অস্ত্র ছিল কুর’আন। কুর’আন নিজেই মহান রব’য়ের ওয়াজ। কুর’আনের সে পরিচিতিটি এসেছে মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে। বলা হয়েছে।

هَـٰذَا بَيَانٌ لِّلنَّاسِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةٌ لِّلْمُتَّقِينَ

অর্থ: “এই কুর’আন হলো মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার বয়ান তথা স্পষ্ট ঘোষণা। এবং পথনির্দেশনা এবং ওয়াজ হলো তাদের জন্য যারা মুত্তাকী।” -(সুরা আল কুর’আন আয়াত ১৩৮)।

ওয়াজের অর্থ বক্তৃতার মাধ্যমে অন্যদের সাবধান করা, উপদেশ দেয়া বা উজ্জীবিত করা। ওয়াজে ঈমানদারকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নিতে হয় এবং মিথ্যা, জুলুম ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। ফলে ওয়াজে প্রতিপক্ষও থাকে। তারা ওয়াজে বাধা সৃষ্টি করে। ওয়াজ তখন পবিত্র জিহাদের পরিণত হয়। ওয়াজের জিহাদে মহান নবীজী (সা:) পাথর খেয়ে রক্তাক্ত হয়েছেন; অথচ ধর্মব্যবসায়ীগণ ওয়াজে অর্থ কামাই করে। কেউ পাথর খেয়ে রক্তাক্ত হয়না। এটিই হলো ধর্মব্যবসায়ীদের সেক্যুলারিজম তথা ইহজাগতিকতা।

অপর দিকে ইবাদতে থাকে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার তাড়না। তখন সৃষ্টি হয় আল্লাহতায়ালার পথে অর্থদান, শ্রমদান, সময়দান -এমন কি প্রাণদানের তাড়না। এমন ইবাদতে ঈমান বাড়ে এবং মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য নামিয়ে আনে। তখন দ্বীনের বিজয় আসে। যেমনটি নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের আমলে দেখা গেছে। ধর্মের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা পেলে তাতে যেমন ঈমান বাড়ে না, তেমনি তাতে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য ও বিজয়ও আসে না। এরই উদাহরণ আজকের বাংলাদেশ। এদেশটিতে প্রতিবছর যত ওয়াজ মাহফিল এবং যেরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষ তাতে যোগ দেয় -নবীজী (সা:)’য়ের ২৩ বছরের নবুয়তী আমলে তার শতভাগের এক ভাগও হয়নি। কিন্তু নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের অল্প সংখ্যক ওয়াজে ইসলামের বিজয় এসেছিল। অথচ বাংলাদেশে হাজার হাজার ওয়াজ মহফিল হলেও তাতে দ্বীনের বিজয় না এসে পরাজয় আসছে।

নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের ওয়াজে তীব্রতর হতো শ্রোতাদের ঈমান ও তাকওয়া; তা থেকে পয়দা হতো লড়াকু মুজাহিদ ও শহীদ। তাদের সৃষ্ট জিহাদে নির্মূল হয়েছে দুর্বৃত্ত শাসক এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, সুশাসন ও সুবিচার। অথচ আজ হচ্ছে উল্টোটি। বাংলাদেশে প্রচুর ওয়াজ হচ্ছে বটে, তবে আলোকিত করার কাজটি হচ্ছে না। কারণ, ধর্মব্যবসায় সেটি হয়না। যাদের ওয়াজে মানুষের আলোকিত হওয়ার কথা, তারা নিজেরাই আলোকিত নয়। ফলে যতই বাড়ছে ধর্মব্যবসায়ীদের সংখ্যা ও ওয়াজ মাহফিল -ততই বাড়ছে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি ও সন্ত্রাসের প্লাবন। এতো ওয়াজের পরও পাপের জোয়ারে সামান্যতম কমতি আসছে না।

অর্থের প্রয়োজন কার না আছে? কিন্তু অর্থের সে প্রয়োজন মেটাতে অতি দরিদ্র সাহাবাগণ অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। কিন্তু কখনোই তাঁরা ওয়াজ করে, জানাজা পড়িয়ে, দোয়া করে, ইমামতি করে বা আযান দিয়ে অর্থ নেননি। এগুলি তো ইবাদত; ইবাদতে কি অর্থ নেয়া যায়? কিন্তু যারা ধর্মব্যবসায়ী, তাদের তাড়নাটি অর্থ লাভে। ধর্মব্যবসায়ী বনি ইসরাইলী আলেমদের কদর্য চিত্রটি মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে তুলে ধরেছেন। তারা তাওরাতের আয়াত শুনিয়ে অর্থ আয় করতো। সুরা জুম্মাতে তাদেরকে ভারবাহী গাধা বলেছেন। গাধাগণ ভার বহন করতে মাত্র; পিঠের উপর জ্ঞানগর্ভ কিতাব থাকলেও গাধা তা নিয়ে ভাবতে পারে না। বনি ইসরাইলীরা ইসলামের ব্যর্থ ছাত্র। বনি ইসরাইলী আলেমদের কদর্য চরিত্রটি পবিত্র কুর’আনে তুলে ধরার অর্থ, মুসলিমগণ যেন সে পথ না ধরে। কিন্তু বনি ইসরাইলী আলেমদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়ার কাজটি হয়নি; ফলে সে রোগের বিস্তার ঘটেছে মুসলিম আলেমদের মাঝেও।

ওয়াজের চেয়ে বক্তার আমল শক্তিশালী

শ্রোতাদের দর্শন পাল্টাতে এবং তাদের  চরিত্র নির্মাণে ওয়াজের চেয়ে বক্তার আমল অধিক শক্তিশালী। নবীজী (সা:)কে তাই ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়াজ করতে হয়নি। সে কাজে তাঁর আমল কথা বলতো এবং জনগণকে পথ দেখাতো। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের দ্বীনের দাওয়াত ছিল আমল নির্ভর, ওয়াজ নির্ভর নয়। নবীজী (সা:)’য়ের কাছে ওয়াজ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। এ জিহাদে তাঁর মূল অস্ত্রটি হলো পবিত্র কুর’আন। তাই নবীজী (সা:) তাঁর ওয়াজ করতেন পবিত্র কুর’আনের আয়াত দিয়ে। কিন্তু যারা ধর্মব্যবসায়ী তারা ওয়াজে পবিত্র কুর’আনের আয়াতের চেয়ে নিজেদের মগজে উৎপাদিত বক্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাদের ওয়াজে থাকে মঞ্চে অভিনয়ের নেশা। অভিনেতাদের মত তাদের থাকে পোষাকের সাজসজ্জা। গুরুত্ব দেন কিচ্ছা-কাহিনীকে। তারা স্বাভাবিক ভাবে কথা না বলে সুর করে কথা বলেন। অথচ কোন শিক্ষিত মানুষ কি কখনো সুর করে কথা বলে? কোন প্রফেসর কি ক্লাসে ছাত্রদের সামনে সুর করে বক্তব্য পেশ করে? অভিনয়ের ন্যায় থাকে নাটকীয় ঢং। লক্ষ্য, শ্রোতাদের প্রণোদনা দেয়া। অথচ ইবাদতে কোন প্রণোদনা থাকেনা।

নাটকের মঞ্চে যারা অভিনেতা, অন্যদের থেকে ভিন্নতর হয় তাদের সাজগোজ ও পোষাক-পরিচ্ছদ। অথচ নবীজী (সা:)কে যারা কোন দিন দেখেনি তাঁরা মদিনায় মসজিদে নববীতে গিয়ে সেখানে সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে বসে থাকা নবীজী (সা:)কে চিনতে সমস্যায় পড়তেন। তাঁকে চিনতে অন্যদের জিজ্ঞাসা করতে হতো। কারণ, নবীজী (সা:)’য়ের পোষাক-পরিচ্ছদ ছিল অন্যদের মতই অতি সাধারণ। এমনকি বাংলাদেশের চেয়ে ৬০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রের খলিফাকে চিনতেও বিদেশীরা সমস্যায় পড়তো। খলিফা উমর (রা:) যখন মদিনা থেকে জেরুজালেমে পৌঁছান তখন স্থানীয় খৃষ্টানগণ উঠের পিঠে আসীন খলিফার সঙ্গি কর্মচারিকে খলিফা মনে করে। কিন্তু সেরূপ ভূল বাংলাদেশের ওয়াজের মহফিলে হয়না। কারণ, যারা ওয়াজের জগতে অভিনেতা -তাকে হাজার হাজার মানুষের মাঝেও সহজে চেনা যায়। সেটি তার পোষাকের অসাধারণ সাজগোজ ও চাকচিক্য দেখে। তার বিশেষ ঢংয়ের টুপি, পাগড়ি, জুব্বা দেখে। তিনি জলসায় নিজেকে হাজির করেন এক অনন্য ব্যক্তি রূপে।

অভিনয়ের মাধ্যমেই এসব ধর্মব্যবসায়ীগণ শ্রোতাদের ঘন্টার পর ঘন্টা মাতিয়ে রাখে। কোন আলেম শ্রোতাদের কতটা মাতিয়ে রাখতে পারলো -তা দিয়ে তার ওয়াজের মুজুরি ধার্য হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর যত ওয়াজ মাহফিল হয় -তা বিশ্বের আর কোন দেশে হয়না। সেসব জলসায় হাজির হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ । বাংলাদেশে এক মাসে যত ওয়াজ মাহফিল হয় এবং যত মানুষ ওয়াজ শুনে -নবীজী (সা:) তাঁর ২৩ বছরের নবুয়তী জীবনে এতো ওয়াজ করেননি এবং এতো শ্রোতাও তিনি পাননি। প্রতিটি ওয়াজ হয় বহু ঘন্টা ধরে। কোন কোন ওয়াজ চলে প্রায় সারা রাত ধরে। বাংলাদেশে তাবলিগ জামায়াতের ওয়াজে হাজির হয় ২০ লাখের বেশি মুসল্লি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা সে ওয়াজ শুনে -সে দীর্ঘ ওয়াজ থেকে কতটা বাড়ে তাদের ঈমান? সে ওয়াজ শুনে লক্ষ লক্ষ শ্রোতাদের মাঝে ঈমানদারী বাড়লে তো দেশে নেক আমলের জোয়ার দেখা যেত। কিন্তু বাংলাদেশে প্রবল জোয়ার এসেছে পাপাচারের।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thedailysarkar@gmail.com

About Author Information

মুসলিমদেশ হিসেবে বাংলাদেশে ইসলামকে সাবজনীন করতে হবে

মুসলিমদেশ হিসেবে বাংলাদেশে ইসলামকে সাবজনীন করতে হবে

Update Time : ০৩:১০:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬

ফিরোজ মাহবুব কামাল

 

কিরূপে বিলুপ্ত হলো আসল ইসলাম?

ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে নানারূপ নাশকতা শুধু বিধর্মী কাফির এবং স্বধর্মী জাতীয়তাবাদী, উপজাতীয়তাবাদী, ফ্যাসিবাদী, সেক্যুলারিস্ট ও রাজা-বাদশাহদের দ্বারা হয়না, বরং প্রকট ভাবে হয় আলেমের লেবাসধারী ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারাও। মেঘ যেমন সূর্যকে আড়াল করে রাখে, তারাও তেমনি আড়াল করে রেখেছে নবীজী (সা:)’য়ের প্রতিষ্ঠিত ইসলামকে। তাদের কারণে সাধারণ জনগণ দেখতে পায়না ইসলামের আসল রূপ -যা নবীজী (সা:) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দৃশ্যমান করেছিলেন। এসব আলেমদের কারণে সাধারণ মানুষ যে ইসলাম দেখতে পায় সেটি নানা ফিরকা, নানা ত্বরিকা, নাআ পীর-মুরিদী ও নানা মাজহাবে বিভক্ত এক ইসলাম। ফলে মুসলিমদের পরিচয়টি আজ সুন্নি মুসলিম, শিয়া মুসলিম, হানাফি মুসলিম,  সালাফি মুসলিম, তাবলিগী মুসলিম ইত্যাদি নানা নামে।

কিন্তু নবীজী (সা:) সুন্নি, শিয়া, হানাফি, শাফেয়ী, মালিকি বা সালাফি ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্রেফ মুসলিম। নবীজী (সা:)’য়ের সাহাবীগণও সুন্নি, শিয়া, হানাফি, শাফেয়ী, মালিকি বা সালাফি ছিলেন না। ফিরকা, ত্বরিকা, ও নানা মাজহাবের নামে বিভক্তি এসেছে নবীজী (সা:)’য়ের ইন্তেকালের প্রায় তিনশত বছর পর। মুসলিম জীবনে এই বিভক্তি হলো সবচেয়ে বড় বিদ’য়াত; এবং মুসলিমগণ বাঁচতে শুরু করে সে বিদ’য়াত নিয়ে। মুসলিমদের পতনের শুরু তখন থেকেই। তখন মুসলিমদের মাঝে নানারূপ বিদ’য়াতের জোয়ার এলেও মুসলিম মানসে বেঁচে নাই নবীজী (সা:)’য়ের আসল ইসলাম -যাতে ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, শরিয়া আইনের বিচার, প্যান-ইসলামী মুসলিম ভাতৃত্ব এবং দুর্বৃত্তির নির্মূল এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ। ফলে মুসলিম বিশ্ব জুড়ে মসজিদ-মাদ্রাসা, মোল্লা-মৌলভী ও আলেম-আল্লামাদের সংখ্যা বিপুল সংখ্যায় বাড়লেও কোথাও নবীজী (সা:) প্রচারিত বিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠা পায়নি। ইসলামের প্রথম তিন শত বছরে মিশর, সিরিয়া, ইরাক, সুদান, লিবিয়া, আলজিরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, মৌরতানিয়ার মত বহুদেশের মুসলিমগণ কুর’আন বুঝার প্রয়োজনে নিজেদের মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে কুর’আনের ভাষা আরবীকে গ্রহণ করে।

ষড়যন্ত্র কুর’আনের বিরুদ্ধে

নানারূপ ধর্মীয় ফিরকা ও মজহাবের জোয়ার আসাতে সাধারণ মানুষ আগ্রহ হারায় কুর’আন বুঝায়। ফলে গুরুত্ব হারায় আরবী ভাষা শিক্ষা। মজহাবের প্রবক্তাগণ বলতে শুরু করে, কুর’আন বুঝার সামর্থ্য সাধারণ মানুষের নাই, তাদের জন্য কুর’আন তেলাওয়াতই যথেষ্ট। এবং বলতে থাকে, কুর’আন বুঝার দায়িত্ব আলেমদের। কুর’আন ও ইসলাম বুঝার চেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয় মাজহাব বুঝায়। এভাবেই শুরু হয় কুর’আন থেকে দূরে সরানোর ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্র দারুন ভাবে সফল হয়েছে। ফল দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের ন্যায় দেশে এক লাখ মুসলিমের মাঝে একজনও এমন পাওয়া যাবে না যে কুর’আন পড়লে তা বুঝতে পারে? পবিত্র কুর’আনের সাথে এর চেয়ে বড় অবমাননা আর কি হতে পারে? অথচ আল্লাহতায়ালা নামাজ-রোজা যেমন প্রতিটি নর-নারীর উপর ফরজ করেছেন, তেমনি ফরজ করেছেন কুর’আন বুঝাকে। না বুঝে তেলাওয়াতে সে ফরজ আদায় হয়না।

একমাত্র কুর’আনই প্রতি পদে জান্নাতের পথ তথা সিরাতাল মুস্তাকীম দেখায়। সে পথ খুঁজে পাওয়ার দায়টি সবার। মানব জীবনে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নিজ কর্ম ও পেশায় ব্যর্থ হলে এতো ক্ষতি হয়না, সে ব্যর্থতা জাহান্নামে নেয় না। কুর’আনের পথ পেতে ব্যর্থ হলে জাহান্নামে যেতে হয়। তাছাড়া কোন আলেমের বা অন্য কারো কুর’আন পাঠে নিজের জন্য সঠিক পথ খুঁজে পাওয়ার কাজটি হয়না। এজন্যই গৌরব যুগের মুসলিমদের কাছে কুর’আন বুঝা এতো গুরুত্ব পেয়েছিল। তারা কোন আলেমের বয়ান থেকে নয়, বরং খোদ মহান আল্লাহতায়ালার বয়ান থেকে ইসলাম বুঝার চেষ্টা করেছেন। আরবী ভাষা শেখার কারণে তাদের জন্য সে কাজটি সহজ হয়ে যায়। আলেমগণ কুর’আন বুঝাকে কঠিন বললেও মহান রব তাঁর ঈমানদার বান্দাদের আস্বস্থ করেছেন এ বলে, কুর’আন বুঝার কাজটি সহজ। মহান রব’য়ের সে ঘোষণাটি বার বার এসেছে পবিত্র কুর’আনে। যেমন বলা হয়েছে:

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ

অর্থ: “আমি কুর’আনকে সহজ করে দিয়েছি বুঝার জন্যে। অতএব, কুর’আন বুঝার জন্য আগ্রহী এমন কোন চিন্তাশীল আছে কি?।” –(সুরা ক্বামার, আয়াত ১৭, ২২, ৩২, ৪০)।

মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার নেয়ামতের সংখ্যা অসংখ্য; শুধু ভূপৃষ্ঠই নয়, ভূগর্ভও ভরপুর সেসব নিয়ামতে। তবে সর্বশ্রেষ্ঠ দানটি হলো পবিত্র কুর’আন। কারণ, অন্য কোন নিয়ামতই মানুষকে জান্নাতে নিবে না, জান্নাতে নিবে একমাত্র পবিত্র কুর’আন। তাই যারা কুর’আন পেল তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামতটি পেল। তবে সে কুর’আন তো তখনই কাজ দেয় যখন সাধারণ মানুষ সেটি সহজে বুঝতে পারে। সর্বপ্রজ্ঞাময় মহান আল্লাহতায়ালার কাছে সে বিষয়টি যে যথার্থ গুরুত্ব পেয়েছিল সেটি বুঝা যায় উপরিউক্ত আয়াতটি পাঠ করলে। মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে এ বলে, “আমি কুর’আনকে সহজ করে দিয়েছি বুঝার জন্যে।” বিষয়টি মহান রব’য়ের কাছেই এতোই গুরুত্ব পেয়েছে যে, এ আয়াতটি একবার নয় ৪ বার নাযিল হয়েছে সুরা ক্বামারে। যারা বলে কুর’আন বুঝা কঠিন, তাদের সে বক্তব্যের বিরুদ্ধে উপরিউক্ত আয়াতটি হলো মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মোক্ষম জবাব।

মুসলিম ভূমিতে শয়তানের বিজয়

শয়তানের এজেন্ডাটি মুসলিমদের নামাজ-রোজা থেকে দূরে সরানো নয়। বরং সেটি কুর’আন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। একমাত্র তখনই মানুষকে জাহান্নামে নেয়ার আসল এজেন্ডাটি সফল হয়। শয়তান জানে, নামাজ-রোজা জান্নাতের পথ দেখায় না। নামাজ-রোজ পালন করেও অধিকাংশ মানুষ তাই পূর্ণ মুসলিম হতে ব্যর্থ হয়। তারা মিথ্যা বলে, ঘুষ খায়, প্রতারণা করে এবং অপরের সম্পদ লুণ্ঠন করে। তারা ব্যর্থ হয়, আল্লাহর পথের মুজাহিদ হতে। তারা তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েও ফ্যাসিবাদী সেক্যুলার ধারার রাজনীতি করে এবং শরিয়ার বিরোধীতা করে। এবং এভাবে নিজেদের গড়ে তোলে পুরোপুরি জাহান্নামের যোগ্য করে। অথচ যারা কুর’আন বুঝে ও সে অনুযায়ী পথ চলে তাদের আচরণ ও কর্ম সম্পূর্ণ ভিন্নতর হয়। কুর‌’আন তাদেরকে জান্নাতের পথ তথা সিরাতাল মুস্তাকীম দেখায়। তখন তাদের আজীবনের লড়াইটি হয় পূর্ণ মুসলিম হওয়ায়। শুধু নামাজ-রোজা, হজ্জ-যাকাত ও দোয়া-দরুদ পালনের মাঝে তাদের জীবন থেমে থাকেনা, তারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদে যোগ দেয় এবং শহীদ হয়।

শয়তান ও তার অনুসারীদের বড় সাফল্য হলো, মুসলিমদের তারা কুর’আন থেকে দূরে সরাতে পেরেছে। একাজে শয়তানের সেপাই রূপে কাজ করেছে সেসব আলেম ও মোল্লা-মৌলভীগণ যারা বলে কুর’আন বুঝা বড়ই কঠিন। এবং সেটিকে দলিল বানিয়ে জনগণকে নসিহত করে, স্রেফ কুর’আন তেলাওয়াত করতে। অথচ তেলাওয়াতের মূল লক্ষ্য হতে হয়, পবিত্র কুর’আন থেকে পথ পাওয়া। অথচ মুসলিম বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি ঘন্টা না বুঝে তেলাওয়াতে ব্যয় হলেও তা থেকে পথ পাওয়ার কাজটি হচ্ছে না। বলা হয়, প্রতি হরফ পাঠে ১০ নেকী। নেকিতো তখন জুটে যখন কুর’আন বুঝে পাঠ করা হয়। যেমন মসজিদের দিকে চলায় প্রতি কদমে সওয়াব; তবে সে জন্য লক্ষ্য হতে হয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া। অনেকের কাছে গুরুত্ব পায় স্রেফ নেকি অর্জন, হিদায়েত পাওয়া তথা সিরাতাল মুস্তাকীম পাওয়া নয়। এর চেয়ে বড় বিভ্রান্তি আর কি হতে পারে? তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়, নেকি কখনো জান্নাতে নিবে না, জান্নাতে নিবে হিদায়েতপ্রাপ্তি তথা সিরাতাল মুস্তাকীমপ্রাপ্তি। নেকি তো তাদের ফায়দা দিবে যারা সফল হবে জান্নাতে পৌঁছতে। তখন নেকি অনুযায়ী জান্নাতে মর্যাদা পাবে। তবে জান্নাতে পৌঁছার কাজটিই হলো সবচেয়ে কঠিন। এ কাজ আল্লাহর পথে কুরবানি চায়। এবং চায়, সিরাতাল মুস্তাকীমে চলার সামর্থ্য।

কোন আমল তো তখনই নেক আমল হয়, যখন তার পিছনে থাকে মহান আল্লাহতায়ালার এজেন্ডাকে বিজয়ী করা ও তাঁকে খুশি করার তাড়না। না বুঝে কুর’আন তেলাওয়াতে সেরূপ আগ্রহ থাকেনা। বরং যার থাকে তাঁর মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার তাড়না, একমাত্র তাঁরই থাকে তাঁর রব’য়ের নসিহত ও নির্দেশনা বুঝার তাড়না। কুর’আন তখন মহান রব’য়ের সাথে সংযোগের সেতু রূপে কাজ করে। এজন্যই সে কুর’আন বুঝতে চায়। কিন্তু যে ব্যক্তি ব্যস্ত শুধু নিজের এজেন্ডা নিয়ে, পবিত্র কুর’আনে মহান রব কি বললেন সেটি জানা তার কাছে গুরুত্ব পায়না। এরাই না বুঝে কুর’আন তেলাওয়াত করে।

ধর্মের নামে ব্যবসা বেড়েছে

ব্যবসায় থাকে অর্থ উপার্জনের তাড়না; অথচ সেরূপ তাড়না থাকে না ইবাদতে। ব্যবসা থেকে ইবাদতের এখানেই মূল পার্থক্য। নবীজী (সা:)’য়ের আমলে ওয়াজ বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ গণ্য হতো। সে জিহাদে অস্ত্র ছিল কুর’আন। কুর’আন নিজেই মহান রব’য়ের ওয়াজ। কুর’আনের সে পরিচিতিটি এসেছে মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে। বলা হয়েছে।

هَـٰذَا بَيَانٌ لِّلنَّاسِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةٌ لِّلْمُتَّقِينَ

অর্থ: “এই কুর’আন হলো মানব জাতির জন্য মহান আল্লাহতায়ালার বয়ান তথা স্পষ্ট ঘোষণা। এবং পথনির্দেশনা এবং ওয়াজ হলো তাদের জন্য যারা মুত্তাকী।” -(সুরা আল কুর’আন আয়াত ১৩৮)।

ওয়াজের অর্থ বক্তৃতার মাধ্যমে অন্যদের সাবধান করা, উপদেশ দেয়া বা উজ্জীবিত করা। ওয়াজে ঈমানদারকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষ নিতে হয় এবং মিথ্যা, জুলুম ও দুর্বৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। ফলে ওয়াজে প্রতিপক্ষও থাকে। তারা ওয়াজে বাধা সৃষ্টি করে। ওয়াজ তখন পবিত্র জিহাদের পরিণত হয়। ওয়াজের জিহাদে মহান নবীজী (সা:) পাথর খেয়ে রক্তাক্ত হয়েছেন; অথচ ধর্মব্যবসায়ীগণ ওয়াজে অর্থ কামাই করে। কেউ পাথর খেয়ে রক্তাক্ত হয়না। এটিই হলো ধর্মব্যবসায়ীদের সেক্যুলারিজম তথা ইহজাগতিকতা।

অপর দিকে ইবাদতে থাকে মহান আল্লাহতায়ালাকে খুশি করার তাড়না। তখন সৃষ্টি হয় আল্লাহতায়ালার পথে অর্থদান, শ্রমদান, সময়দান -এমন কি প্রাণদানের তাড়না। এমন ইবাদতে ঈমান বাড়ে এবং মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য নামিয়ে আনে। তখন দ্বীনের বিজয় আসে। যেমনটি নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের আমলে দেখা গেছে। ধর্মের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা পেলে তাতে যেমন ঈমান বাড়ে না, তেমনি তাতে মহান আল্লাহতায়ালার সাহায্য ও বিজয়ও আসে না। এরই উদাহরণ আজকের বাংলাদেশ। এদেশটিতে প্রতিবছর যত ওয়াজ মাহফিল এবং যেরূপ লক্ষ লক্ষ মানুষ তাতে যোগ দেয় -নবীজী (সা:)’য়ের ২৩ বছরের নবুয়তী আমলে তার শতভাগের এক ভাগও হয়নি। কিন্তু নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের অল্প সংখ্যক ওয়াজে ইসলামের বিজয় এসেছিল। অথচ বাংলাদেশে হাজার হাজার ওয়াজ মহফিল হলেও তাতে দ্বীনের বিজয় না এসে পরাজয় আসছে।

নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের ওয়াজে তীব্রতর হতো শ্রোতাদের ঈমান ও তাকওয়া; তা থেকে পয়দা হতো লড়াকু মুজাহিদ ও শহীদ। তাদের সৃষ্ট জিহাদে নির্মূল হয়েছে দুর্বৃত্ত শাসক এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মহান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব, সুশাসন ও সুবিচার। অথচ আজ হচ্ছে উল্টোটি। বাংলাদেশে প্রচুর ওয়াজ হচ্ছে বটে, তবে আলোকিত করার কাজটি হচ্ছে না। কারণ, ধর্মব্যবসায় সেটি হয়না। যাদের ওয়াজে মানুষের আলোকিত হওয়ার কথা, তারা নিজেরাই আলোকিত নয়। ফলে যতই বাড়ছে ধর্মব্যবসায়ীদের সংখ্যা ও ওয়াজ মাহফিল -ততই বাড়ছে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি ও সন্ত্রাসের প্লাবন। এতো ওয়াজের পরও পাপের জোয়ারে সামান্যতম কমতি আসছে না।

অর্থের প্রয়োজন কার না আছে? কিন্তু অর্থের সে প্রয়োজন মেটাতে অতি দরিদ্র সাহাবাগণ অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। কিন্তু কখনোই তাঁরা ওয়াজ করে, জানাজা পড়িয়ে, দোয়া করে, ইমামতি করে বা আযান দিয়ে অর্থ নেননি। এগুলি তো ইবাদত; ইবাদতে কি অর্থ নেয়া যায়? কিন্তু যারা ধর্মব্যবসায়ী, তাদের তাড়নাটি অর্থ লাভে। ধর্মব্যবসায়ী বনি ইসরাইলী আলেমদের কদর্য চিত্রটি মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুর’আনে তুলে ধরেছেন। তারা তাওরাতের আয়াত শুনিয়ে অর্থ আয় করতো। সুরা জুম্মাতে তাদেরকে ভারবাহী গাধা বলেছেন। গাধাগণ ভার বহন করতে মাত্র; পিঠের উপর জ্ঞানগর্ভ কিতাব থাকলেও গাধা তা নিয়ে ভাবতে পারে না। বনি ইসরাইলীরা ইসলামের ব্যর্থ ছাত্র। বনি ইসরাইলী আলেমদের কদর্য চরিত্রটি পবিত্র কুর’আনে তুলে ধরার অর্থ, মুসলিমগণ যেন সে পথ না ধরে। কিন্তু বনি ইসরাইলী আলেমদের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়ার কাজটি হয়নি; ফলে সে রোগের বিস্তার ঘটেছে মুসলিম আলেমদের মাঝেও।

ওয়াজের চেয়ে বক্তার আমল শক্তিশালী

শ্রোতাদের দর্শন পাল্টাতে এবং তাদের  চরিত্র নির্মাণে ওয়াজের চেয়ে বক্তার আমল অধিক শক্তিশালী। নবীজী (সা:)কে তাই ঘন্টার পর ঘন্টা ওয়াজ করতে হয়নি। সে কাজে তাঁর আমল কথা বলতো এবং জনগণকে পথ দেখাতো। নবীজী (সা:) ও তাঁর সাহাবাদের দ্বীনের দাওয়াত ছিল আমল নির্ভর, ওয়াজ নির্ভর নয়। নবীজী (সা:)’য়ের কাছে ওয়াজ ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ। এ জিহাদে তাঁর মূল অস্ত্রটি হলো পবিত্র কুর’আন। তাই নবীজী (সা:) তাঁর ওয়াজ করতেন পবিত্র কুর’আনের আয়াত দিয়ে। কিন্তু যারা ধর্মব্যবসায়ী তারা ওয়াজে পবিত্র কুর’আনের আয়াতের চেয়ে নিজেদের মগজে উৎপাদিত বক্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাদের ওয়াজে থাকে মঞ্চে অভিনয়ের নেশা। অভিনেতাদের মত তাদের থাকে পোষাকের সাজসজ্জা। গুরুত্ব দেন কিচ্ছা-কাহিনীকে। তারা স্বাভাবিক ভাবে কথা না বলে সুর করে কথা বলেন। অথচ কোন শিক্ষিত মানুষ কি কখনো সুর করে কথা বলে? কোন প্রফেসর কি ক্লাসে ছাত্রদের সামনে সুর করে বক্তব্য পেশ করে? অভিনয়ের ন্যায় থাকে নাটকীয় ঢং। লক্ষ্য, শ্রোতাদের প্রণোদনা দেয়া। অথচ ইবাদতে কোন প্রণোদনা থাকেনা।

নাটকের মঞ্চে যারা অভিনেতা, অন্যদের থেকে ভিন্নতর হয় তাদের সাজগোজ ও পোষাক-পরিচ্ছদ। অথচ নবীজী (সা:)কে যারা কোন দিন দেখেনি তাঁরা মদিনায় মসজিদে নববীতে গিয়ে সেখানে সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে বসে থাকা নবীজী (সা:)কে চিনতে সমস্যায় পড়তেন। তাঁকে চিনতে অন্যদের জিজ্ঞাসা করতে হতো। কারণ, নবীজী (সা:)’য়ের পোষাক-পরিচ্ছদ ছিল অন্যদের মতই অতি সাধারণ। এমনকি বাংলাদেশের চেয়ে ৬০ গুণ বৃহৎ রাষ্ট্রের খলিফাকে চিনতেও বিদেশীরা সমস্যায় পড়তো। খলিফা উমর (রা:) যখন মদিনা থেকে জেরুজালেমে পৌঁছান তখন স্থানীয় খৃষ্টানগণ উঠের পিঠে আসীন খলিফার সঙ্গি কর্মচারিকে খলিফা মনে করে। কিন্তু সেরূপ ভূল বাংলাদেশের ওয়াজের মহফিলে হয়না। কারণ, যারা ওয়াজের জগতে অভিনেতা -তাকে হাজার হাজার মানুষের মাঝেও সহজে চেনা যায়। সেটি তার পোষাকের অসাধারণ সাজগোজ ও চাকচিক্য দেখে। তার বিশেষ ঢংয়ের টুপি, পাগড়ি, জুব্বা দেখে। তিনি জলসায় নিজেকে হাজির করেন এক অনন্য ব্যক্তি রূপে।

অভিনয়ের মাধ্যমেই এসব ধর্মব্যবসায়ীগণ শ্রোতাদের ঘন্টার পর ঘন্টা মাতিয়ে রাখে। কোন আলেম শ্রোতাদের কতটা মাতিয়ে রাখতে পারলো -তা দিয়ে তার ওয়াজের মুজুরি ধার্য হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর যত ওয়াজ মাহফিল হয় -তা বিশ্বের আর কোন দেশে হয়না। সেসব জলসায় হাজির হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ । বাংলাদেশে এক মাসে যত ওয়াজ মাহফিল হয় এবং যত মানুষ ওয়াজ শুনে -নবীজী (সা:) তাঁর ২৩ বছরের নবুয়তী জীবনে এতো ওয়াজ করেননি এবং এতো শ্রোতাও তিনি পাননি। প্রতিটি ওয়াজ হয় বহু ঘন্টা ধরে। কোন কোন ওয়াজ চলে প্রায় সারা রাত ধরে। বাংলাদেশে তাবলিগ জামায়াতের ওয়াজে হাজির হয় ২০ লাখের বেশি মুসল্লি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা সে ওয়াজ শুনে -সে দীর্ঘ ওয়াজ থেকে কতটা বাড়ে তাদের ঈমান? সে ওয়াজ শুনে লক্ষ লক্ষ শ্রোতাদের মাঝে ঈমানদারী বাড়লে তো দেশে নেক আমলের জোয়ার দেখা যেত। কিন্তু বাংলাদেশে প্রবল জোয়ার এসেছে পাপাচারের।