০৫:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
পিপলস টিভি ৬
বাংলাদেশে দলিল রেজিস্ট্রেশনের ইতিহাস

দলিল লেখা হলো জনকল্যাণমূলক কাজ ——– মোশারফ হোসেন

মোশারফ হোসেন
  • Update Time : ০৪:১১:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬
  • / ৪৫ Time View


বাংলাদেশে দলিল রেজিস্ট্রেশনের ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬৪ সালে চালু হয় The
Registration Act, 1864, যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জমি-জমা, স্থাবর সম্পত্তি
ইত্যাদি হস্তান্তরের লিখিত দলিল নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে, সময়ের
প্রয়োজনে এ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রণয়ন করা হয় The Registration Act,
1908 যা আজও বাংলাদেশে দলিল নিবন্ধনের মূল আইন হিসেবে বহাল রয়েছে। এই আইনের
অধীনে জমি, বাড়ি বা যেকোনো স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল রেজিস্ট্রি অফিসে
বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করতে হয়। নিবন্ধন ছাড়া কোনো দলিলের আইনগত বৈধতা থাকে
না। যখন আমরা দলিল রেজিস্ট্রি করি, তখন কেবল একটি আইনি কাজই করি না বরং আমরা
শতবর্ষের একটি আইনি ইতিহাসকে সামনের দিকে নিয়ে চলছি, একটি সুশৃঙ্খল আইনি ধারা ও
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অংশ হিসেবে। আজ পর্যন্ত চলমান – এই হলো বাংলাদেশের দলিল
রেজিস্ট্রেশনের গর্বিত ইতিহাস। এই আইনি ইতিহাসকে বুকে ধারন করে বাংলাদেশের দলিল
লেখকগন দলিল রেজিষ্টির মাধ্যমে সরকারে কোষাগারে মোটা অংকের রাজস্ব আদায়ে
সহযোগিতা করে আসছে। বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতি ১৯৯১ সাল থেকে তৎকালীন
সরকারের নিকট একজন দলিল লেখককে বাধ্যতা সূলক সচেতন ও বিশেষ প্রশিক্ষনের
ব্যবস্থার জন্য দাবী জানিয়ে আসছে। কিন্তু অতীতের সরকারের মাথাভারী প্রশাসন এ
ব্যাপারে একটু মাথা ঘামাত, তাহলে দলিলের ত্রুটি ও মামলা মোকদ্দমা অনেকাংশ নিরশন
সম্ভব হত । অপর দিকে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কোন কর্মজীবির পারিশ্রমিক
নির্ধারন করতে গেলে ব্যয়ের সাথে আয়ের সামঞ্জস্য রাখতে হয়। দলিল লেখকগণ প্রতি
দলিলে মুসাবিদার পারিশ্রমিক ফি কম হওয়ায় জীবনমান খুবই কষ্টকর। উপজেলা পর্যায়ে
প্রত্যেক সাব- রেজিষ্ট্রি অফিসে মাসিক গড়ে ৪০০ থেকে ৮০০ দলিল রেজিষ্ট্রি হয়ে থাকে।
এসব অফিসে উক্ত দলিল মুসাবিদা করার জন্য মাত্র ২০ থেকে ৪০ জন দলিল লেখকের
প্রয়োজন হয়। কিন্তু দলিল লেখক ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ থেকে ১০০ জন দলিল লেখক
দলিল মুসাবিদা করে থাকে। দলিল লেখক বৃদ্ধি পাওয়ায় দলিল লেখক গনের গড়ে মুসাবিদাকৃত
দলিলের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত প্রতি দলিলে মুসাবিদার পারিশ্রমিক
ফি ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা খুবই কম। দ্রব্য মূল্যের বৃদ্ধি হওয়ায় দলিল লেখকদের
অতি অল্প পারিশ্রমিক ফি দিয়ে দলিল লেখকদের দিনাতিপাত করা খুবই কষ্টকর। দলিল
লেখকগণ সরকারের বরাবর বিভিন্ন সময় দাবী দাওয়া তুলে ধরে। কিন্তু কোন প্রতিকার
পায়নি । তবে এক কথায় দলিল লেখকরা অবহেলিত এবং মানবেতর জিবন যাপন করছে।
ইসলামী আইনজ্ঞদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো, দলিল ও প্রমাণপত্র লেখার বিনিময়ে
পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, ‘লেখক ও সাক্ষীর যেন ক্ষতি করা
না হয়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)। ইসলামিক স্কলাররা বলেছেন, এটি এমন কাজের
অন্তর্ভুক্ত, যে কাজ বৈধ, তাতে কর্তার কষ্ট হয়। মানুষ যখনই এমন কাজের প্রয়োজন বোধ

করে, এর দ্বারা কর্তা ক্ষতির শিকার হয় এবং বিনা পারিশ্রমিকে জীবনের একটি সময় ব্যয়
হয়, আর এতে রয়েছে চরম ক্ষতি। তাই যদি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে লেখকের পারিশ্রমিক
বরাদ্দ না থাকে তাহলে (বিষয়টি হয়ে যাবে কারো স্বেচ্ছা প্রণোদিত কাজ) এ পর্যায়ে কেউ
যদি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল কর্তৃক বৈধ ক্ষেত্রে চুক্তিপত্র, প্রমাণপত্র এবং আইনের
সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় লিখতে চায়, তাহলে লেখার ব্যাপারে বিচারক তাকে বারণ করতে পারবে
না। যদি লেখক আইন বিষয় এবং চুক্তি করার শর্তাবলি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে। স্মরণীয়
যে দলিল লেখায় পারিশ্রমিক এবং কাজ নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত। যে লেখাবে এবং যে
লিখবে তারা উভয়ে যদি কোনো কিছুর ওপর চুক্তিবদ্ধ হয় এবং তাদের চুক্তি অনুযায়ী কাজ
সম্পন্ন হয়, তাহলে এটি হবে শুদ্ধ ইজারা এবং লেখক কর্তৃক চুক্তিকৃত অর্থ গ্রহণ হবে বৈধ,
তা পরিমাণে কম হোক কিংবা বেশি। এ ক্ষেত্রে লেখকের কাজ হলো পূর্ণ আমানতদারির সঙ্গে
এই কাজ সম্পন্ন করা। কেননা ওই কাজ সম্পন্ন করার জন্য সে-ই দায়িত্বপ্রাপ্ত। তবে হ্যাঁ,
উল্লিখিত বিধান দলিল বা চুক্তিপত্র লেখকের ক্ষেত্রে ওই সময় প্রযোজ্য হবে, যখন
রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তার ভাতা বরাদ্দ না থাকবে বা কোনো পারিশ্রমিক না থাকবে। অন্যথায়
তার ভাতা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে হবে। কারণ দলিল লেখা হলো জনকল্যাণমূলক কাজ।
আমরা বর্তমান গনতান্ত্রিক সরকারের নিকট আবদার করছি দলিল লেখকদেরকে অভাবের
তাড়না থেকে বাঁচিয়ে রাখুন।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thedailysarkar@gmail.com

About Author Information

বাংলাদেশে দলিল রেজিস্ট্রেশনের ইতিহাস

দলিল লেখা হলো জনকল্যাণমূলক কাজ ——– মোশারফ হোসেন

Update Time : ০৪:১১:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬


বাংলাদেশে দলিল রেজিস্ট্রেশনের ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬৪ সালে চালু হয় The
Registration Act, 1864, যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জমি-জমা, স্থাবর সম্পত্তি
ইত্যাদি হস্তান্তরের লিখিত দলিল নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে, সময়ের
প্রয়োজনে এ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে প্রণয়ন করা হয় The Registration Act,
1908 যা আজও বাংলাদেশে দলিল নিবন্ধনের মূল আইন হিসেবে বহাল রয়েছে। এই আইনের
অধীনে জমি, বাড়ি বা যেকোনো স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল রেজিস্ট্রি অফিসে
বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করতে হয়। নিবন্ধন ছাড়া কোনো দলিলের আইনগত বৈধতা থাকে
না। যখন আমরা দলিল রেজিস্ট্রি করি, তখন কেবল একটি আইনি কাজই করি না বরং আমরা
শতবর্ষের একটি আইনি ইতিহাসকে সামনের দিকে নিয়ে চলছি, একটি সুশৃঙ্খল আইনি ধারা ও
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অংশ হিসেবে। আজ পর্যন্ত চলমান – এই হলো বাংলাদেশের দলিল
রেজিস্ট্রেশনের গর্বিত ইতিহাস। এই আইনি ইতিহাসকে বুকে ধারন করে বাংলাদেশের দলিল
লেখকগন দলিল রেজিষ্টির মাধ্যমে সরকারে কোষাগারে মোটা অংকের রাজস্ব আদায়ে
সহযোগিতা করে আসছে। বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতি ১৯৯১ সাল থেকে তৎকালীন
সরকারের নিকট একজন দলিল লেখককে বাধ্যতা সূলক সচেতন ও বিশেষ প্রশিক্ষনের
ব্যবস্থার জন্য দাবী জানিয়ে আসছে। কিন্তু অতীতের সরকারের মাথাভারী প্রশাসন এ
ব্যাপারে একটু মাথা ঘামাত, তাহলে দলিলের ত্রুটি ও মামলা মোকদ্দমা অনেকাংশ নিরশন
সম্ভব হত । অপর দিকে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত যে কোন কর্মজীবির পারিশ্রমিক
নির্ধারন করতে গেলে ব্যয়ের সাথে আয়ের সামঞ্জস্য রাখতে হয়। দলিল লেখকগণ প্রতি
দলিলে মুসাবিদার পারিশ্রমিক ফি কম হওয়ায় জীবনমান খুবই কষ্টকর। উপজেলা পর্যায়ে
প্রত্যেক সাব- রেজিষ্ট্রি অফিসে মাসিক গড়ে ৪০০ থেকে ৮০০ দলিল রেজিষ্ট্রি হয়ে থাকে।
এসব অফিসে উক্ত দলিল মুসাবিদা করার জন্য মাত্র ২০ থেকে ৪০ জন দলিল লেখকের
প্রয়োজন হয়। কিন্তু দলিল লেখক ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ থেকে ১০০ জন দলিল লেখক
দলিল মুসাবিদা করে থাকে। দলিল লেখক বৃদ্ধি পাওয়ায় দলিল লেখক গনের গড়ে মুসাবিদাকৃত
দলিলের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত প্রতি দলিলে মুসাবিদার পারিশ্রমিক
ফি ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা খুবই কম। দ্রব্য মূল্যের বৃদ্ধি হওয়ায় দলিল লেখকদের
অতি অল্প পারিশ্রমিক ফি দিয়ে দলিল লেখকদের দিনাতিপাত করা খুবই কষ্টকর। দলিল
লেখকগণ সরকারের বরাবর বিভিন্ন সময় দাবী দাওয়া তুলে ধরে। কিন্তু কোন প্রতিকার
পায়নি । তবে এক কথায় দলিল লেখকরা অবহেলিত এবং মানবেতর জিবন যাপন করছে।
ইসলামী আইনজ্ঞদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো, দলিল ও প্রমাণপত্র লেখার বিনিময়ে
পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, ‘লেখক ও সাক্ষীর যেন ক্ষতি করা
না হয়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)। ইসলামিক স্কলাররা বলেছেন, এটি এমন কাজের
অন্তর্ভুক্ত, যে কাজ বৈধ, তাতে কর্তার কষ্ট হয়। মানুষ যখনই এমন কাজের প্রয়োজন বোধ

করে, এর দ্বারা কর্তা ক্ষতির শিকার হয় এবং বিনা পারিশ্রমিকে জীবনের একটি সময় ব্যয়
হয়, আর এতে রয়েছে চরম ক্ষতি। তাই যদি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে লেখকের পারিশ্রমিক
বরাদ্দ না থাকে তাহলে (বিষয়টি হয়ে যাবে কারো স্বেচ্ছা প্রণোদিত কাজ) এ পর্যায়ে কেউ
যদি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল কর্তৃক বৈধ ক্ষেত্রে চুক্তিপত্র, প্রমাণপত্র এবং আইনের
সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় লিখতে চায়, তাহলে লেখার ব্যাপারে বিচারক তাকে বারণ করতে পারবে
না। যদি লেখক আইন বিষয় এবং চুক্তি করার শর্তাবলি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে। স্মরণীয়
যে দলিল লেখায় পারিশ্রমিক এবং কাজ নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত। যে লেখাবে এবং যে
লিখবে তারা উভয়ে যদি কোনো কিছুর ওপর চুক্তিবদ্ধ হয় এবং তাদের চুক্তি অনুযায়ী কাজ
সম্পন্ন হয়, তাহলে এটি হবে শুদ্ধ ইজারা এবং লেখক কর্তৃক চুক্তিকৃত অর্থ গ্রহণ হবে বৈধ,
তা পরিমাণে কম হোক কিংবা বেশি। এ ক্ষেত্রে লেখকের কাজ হলো পূর্ণ আমানতদারির সঙ্গে
এই কাজ সম্পন্ন করা। কেননা ওই কাজ সম্পন্ন করার জন্য সে-ই দায়িত্বপ্রাপ্ত। তবে হ্যাঁ,
উল্লিখিত বিধান দলিল বা চুক্তিপত্র লেখকের ক্ষেত্রে ওই সময় প্রযোজ্য হবে, যখন
রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তার ভাতা বরাদ্দ না থাকবে বা কোনো পারিশ্রমিক না থাকবে। অন্যথায়
তার ভাতা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে হবে। কারণ দলিল লেখা হলো জনকল্যাণমূলক কাজ।
আমরা বর্তমান গনতান্ত্রিক সরকারের নিকট আবদার করছি দলিল লেখকদেরকে অভাবের
তাড়না থেকে বাঁচিয়ে রাখুন।