০৩:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
https://www.facebook.com/obaidul1991
প্রতিবছর বন্যার কাছে পরাজিত বাংলাদেশ: ত্রাণ নয়, এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় মহাপরিকল্পনা
মতামত
- Update Time : ০১:২৬:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
- / ১১ Time View
বাংলাদেশের মানুষের কাছে বর্ষাকাল একদিকে যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি দুর্ভোগেরও নাম। প্রতিবছর বর্ষা এলেই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়, নদীভাঙনে হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়, শহরগুলো জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়ে এবং কৃষক, শিক্ষার্থী, খামারি, শ্রমজীবী মানুষসহ সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ ক্ষতির শিকার হন। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও যদি একই ধরনের দুর্ভোগ বারবার ফিরে আসে, তাহলে আমাদের স্বীকার করতেই হবে—সমস্যা শুধু প্রকৃতির নয়, পরিকল্পনারও।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে যে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে, তা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলা ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই বন্যায় অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। হাজার হাজার বাড়িঘর, সড়ক, সেতু এবং কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে বহু এলাকায় স্বাভাবিক জীবন সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে গেছে।

চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে উদ্বেগজনক। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে শহরের বহু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্লাবিত হয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বহু পরিবার ঘরবন্দী হয়ে পড়ে, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়।
বন্যার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক প্রভাবগুলোর একটি পড়েছে শিক্ষা খাতে। চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময় বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন একাধিক দিনের পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয় আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। ৮ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর পরবর্তী সময় ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়। অথচ দেশের অন্য বোর্ডগুলোর পরীক্ষা নির্ধারিত সময়েই চলতে থাকে। এতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মানসিক অনিশ্চয়তা, যাতায়াত সংকট এবং পড়াশোনার বিঘ্নের মুখে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের অনেকেই কোমরসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, আবার অনেকের প্রবেশপত্র বন্যার পানিতে নষ্ট হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থীর বাড়ি আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, কেউবা পরিবারের সঙ্গে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। শিক্ষা শুধু একটি পরীক্ষা নয়; এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে শিক্ষা খাতের সমন্বিত পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।
এদিকে রাজধানী ঢাকাও স্বস্তিতে নেই। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বহু সড়ক, আবাসিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী এবং ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। প্রশ্ন হলো, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই যদি রাজধানী অচল হয়ে পড়ে, তাহলে এটিকে কি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা যায়? বাস্তবতা হলো, ঢাকার অসংখ্য খাল হারিয়ে গেছে, জলাধার ভরাট হয়েছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা জনসংখ্যা ও নগর বিস্তারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পানি নিষ্কাশনকে আরও বাধাগ্রস্ত করেছে। গবেষণাও দেখিয়েছে যে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও খাল-জলাধার ধ্বংস ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ।
বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ অঞ্চলগুলো প্রায় প্রতি বছর একই ধরনের দুর্ভোগের শিকার হয়। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য অঞ্চলের বহু এলাকা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রা প্রতিবছর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।
সবচেয়ে বড় আঘাত আসে কৃষিতে। বন্যার পানিতে ধান, সবজি, ভুট্টা, পাটসহ নানা ফসল নষ্ট হয়ে যায়। চট্টগ্রাম জেলায় প্রাথমিক সরকারি হিসাবে প্রায় ১৫ হাজার ৯০০ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মৎস্য খাতে প্রায় ৯১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব উঠে এসেছে।
একইভাবে প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে এক লাখের বেশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং খামারিদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক দশক কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
একজন কৃষকের জন্য একটি মৌসুমের ফসল হারানো মানে শুধু কয়েক মাসের আয় হারানো নয়; অনেক সময় তার পুরো পরিবারের বছরের খাদ্য নিরাপত্তা, সন্তানের লেখাপড়া এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ঋণ নিয়ে চাষ করা কৃষক যখন ফসল হারান, তখন তিনি আবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত হন। একইভাবে খামারিরা গবাদিপশু হারিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন।
বাংলাদেশে বন্যা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, কারণ এটি একটি বৃহৎ বদ্বীপ রাষ্ট্র এবং শত শত নদ-নদীর দেশ। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। প্রথমত, নদী খনন ও নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবৈধভাবে দখল হওয়া খাল, বিল ও জলাধার উদ্ধার করতে হবে। তৃতীয়ত, ঢাকার জন্য আধুনিক সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। চতুর্থত, বন্যাপ্রবণ জেলাগুলোতে স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, উঁচু সড়ক, নিরাপদ খাদ্যগুদাম এবং দ্রুত ত্রাণ সরবরাহের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ফসল বীমা, খামারিদের জন্য প্রাণিসম্পদ বীমা, এবং আগাম বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
বন্যা মোকাবিলা কেবল একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এটি পানি, কৃষি, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নগর উন্নয়ন—সব খাতের সমন্বিত দায়িত্ব। রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও যেন জাতীয় বন্যা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অব্যাহত থাকে, সে জন্য জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশ বহু দুর্যোগ জয় করে এগিয়েছে। তাই হতাশ হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু একই ভুল বারবার করলে একই ক্ষতি বারবার হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ত্রাণনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম প্রতি বর্ষায় নিরাপত্তা পাবে, নাকি একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি দেখবে। এখন সময় এসেছে বন্যাকে ভাগ্যের লিখন হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করার।
(চলবে…)
লেখক: সাকিব মুহাম্মদ
Tag :




























