০৭:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজশাহীতে তানোর উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানির সংকট মোকাবিলায় নতুন জাতীয় পানিনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ
Reporter Name
- Update Time : ০২:১০:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৩১ Time View

মোঃ নাসিরউদ্দিন ,ক্রাইম রিপোর্টার :
প্রচন্ড খরাপ্রবণ বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূগর্ভস্থ পানি সংকট মোকাবিলায় প্রস্তাবিত জাতীয় পানিনীতি-২০২৫ প্রণয়নকে সময়োপযোগী ও জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন পানি বিশেষজ্ঞরা। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় পানিস্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষি, পানীয় জল ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যে মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকালে পবা উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে প্রস্তাবিত জাতীয় পানিনীতি-২০২৫ প্রণয়ন বিষয়ক গণশুনানি ও তারুণ্যের মতামত গ্রহণ সংক্রান্ত কর্মশালায় এসব তথ্য জানানো হয়। কর্মশালাটি আয়োজন করে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো)।
কর্মশালায় জানানো হয়, রাজশাহী অঞ্চলের অতি উচ্চ পানি সংকট ঘোষিত ২৫টি উপজেলার মধ্যে পবা উপজেলা অন্যতম। এ উপজেলার চারটি ইউনিয়নকে ইতোমধ্যে ‘অতি উচ্চ পানি সংকট এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু পবা নয়, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজা ও সাড়ে পাঁচ হাজার গ্রাম বর্তমানে পানি সংকটের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫০৩টি মৌজাকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে প্রায় ৮৭ লাখেরও বেশি মানুষ সরাসরি পানির সংকটে ভুগছেন।
ওয়ারপোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত কয়েক বছর ধরে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিস্তর নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গভীর নলকূপ স্থাপন, অপরিকল্পিত সেচব্যবস্থা, জলাশয় ভরাট ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির স্বাভাবিক পুনঃভরাট ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে প্রতিবছর পানিস্তর গড়ে কয়েক ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ১১টি নির্দেশনা অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়। নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষা, সেচে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিকল্প পানির উৎস সৃষ্টি।
পানি আইন অনুযায়ী এসব এলাকায় পানি উত্তোলন ও ব্যবহারকারী সব সংস্থাকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ আইন লঙ্ঘন করে নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, পানি বিক্রি বা বিতরণ করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় প্রশাসনকে।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, উপদ্রুত এলাকাগুলোতে হাজারো গভীর নলকূপ স্থাপন করে কৃষকদের কাছে সেচের পানি বিক্রি ও বিতরণকারী বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)-কে নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে গভীর নলকূপ ও সেমি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন কোনো অনুমতি না দিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা সেচ কমিটিকে বলা হয়েছে।
কর্মশালার উদ্বোধন করেন পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার মহাপরিচালক মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান, যিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, “ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো না গেলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। জাতীয় পানিনীতি-২০২৫ বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব।”
বিশেষ অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার পরিচালক (পরিকল্পনা) নুর আলম ও পরিচালক (কারিগরি) শাহ্ মোজাহিদ উদ্দিন। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আরাফাত আমান আজিজ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পানি সম্পদ) ড. মো. আমিনুল হক। তিনি বলেন,“পানি ব্যবস্থাপনায় এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে আগামী এক দশকের মধ্যে উত্তরাঞ্চলে পানির সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।”
কর্মশালায় আরও উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (প্রকৌশল) মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, সহকারী প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান খান ও হামীম আল হুসাইন, উপজেলা প্রকৌশলী ও উপজেলা সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব মকবুল হোসেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান, রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক সরকার রাহনুমা আফরোজ, নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিক, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এমএ মান্নান, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল লতিফসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরা। বক্তারা বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় পানিনীতি-২০২৫ বাস্তবায়িত হলে ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ, কৃষি উৎপাদন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে উঠবে। স্থানীয় জনগণ ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই এই নীতি কার্যকর করা প্রয়োজন
Tag :


















